এনসিপির এক বছর: এখনো ‘স্বকীয়তা’র খোঁজে তরুণদের দলটি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সমন্বয়কদের গড়ে তোলা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আজ এক বছর পূর্তি উদযাপন করবে। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল দলটি।
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এই দল ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ও রাজনীতিতে ‘নয়া বন্দোবস্তের’ প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। এক বছরের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে সংসদে ছয়টি আসন নিশ্চিত করেছে তারা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছেন দলটির নেতারা।
তবুও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এনসিপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, নেতৃত্বের পদত্যাগ ঠেকানো। সেই সঙ্গে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলাও এখন তাদের সামনে বড় পরীক্ষা।
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা এবং নির্বাচনে অংশ নিয়ে অবস্থান সুসংহত করা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেই সংসদে ছয়টি আসন পেয়েছে এনসিপি। এখন তাদের মূল লক্ষ্য হলো সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করা।
দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফুল ইসলাম আদীব জানান, জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক কমিটি, পেশাজীবী ফোরাম এবং রাজনৈতিক কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে সারা দেশে দলের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। দলীয় সূত্রমতে, বর্তমানে এনসিপির ছাত্র, যুব, শ্রমিক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও পেশাজীবী সংগঠনসহ ১০টি সহযোগী সংগঠন সক্রিয় রয়েছে।
দলের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও জোটের অবস্থান নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের মন্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সাংগঠনিক সম্প্রসারণের এতসব পরিকল্পনার মধ্যেও শীর্ষ পর্যায়ে আস্থার সংকটে পড়তে হয়েছে এনসিপিকে। গত এক বছরে অন্তত ৬০ জন নেতাকর্মী তিন ধাপে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ডিসেম্বরে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যোগ দেওয়ার পর সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা সহ প্রায় ২০ জন নেতা দল ছাড়েন।
সামান্তা শারমিন ও নাহিদা সারোয়ার নিভার মতো জ্যেষ্ঠ নারী নেত্রীরা দল থেকে পদত্যাগ না করলেও নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। সামান্তা শারমিন বলেন, ‘দলের জন্য আমার শুভকামনা সবসময় থাকবে। দলের অভ্যন্তরে নানা মতপার্থক্যের কারণে আমি কার্যক্রম থেকে দূরে আছি, তবে যেকোনো সংকটে আমি দলের পাশে থাকব।’
দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন জানান, যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদেরকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বারবার দল ছাড়ার কারণে এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি ও ধারাবাহিকতা দুর্বল হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এনসিপি এখনো স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে পারেনি। জোটের ভোটে সংসদে ছয়টি আসন পাওয়া সম্ভব হলেও একক শক্তি হিসেবে তারা এখনো দাঁড়াতে পারেনি।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, ‘রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা ও নৈতিক অসংগতির কারণে দলটির সম্ভাবনা ম্লান হয়েছে। তিনি বলেন, আন্দোলন থেকে হুট করে দলে রূপান্তর এবং উপদেষ্টা হওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘এখন দলটির উচিত নিজেদের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা, ভুলগুলো চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সাজানো।’