শততম জন্মবার্ষিকী

ডেভিড অ্যাটেনবোরো: যার চোখে পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখেছে মানুষ

আহমাদ ইশতিয়াক
আহমাদ ইশতিয়াক

ক্যামব্রিজ থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা ২১ বছর বয়সী এক তরুণের মনপ্রাণ জুড়ে তখন শুধুই অপার ভ্রমণের নেশা। ক্যামব্রিজে তার পড়াশোনার বিষয়টিও ছিল প্রকৃতি বিজ্ঞান। জাহাজ কিংবা উড়োজাহাজ, যে করেই হোক তাকে ঘুরে বেড়াতেই হবে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছোটার অদম্য এক ইচ্ছে চেপে বসেছিল মনন-শয়ন-স্বপনে। 

অন্যদিকে তখন ১৮-২৬ বছর বয়সীদের বাধ্যতামূলকভাবে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে অন্তত দু বছর কাজ করতে হতো। তবে কি বিশ্বভ্রমণ আর হবে না! 

হঠাৎ সেখানেই যেন আশার আলো দেখতে পেলেন সেই তরুণ। ভাবলেন সামরিক বাহিনীর মধ্যে নৌবাহিনীতে যদি যোগ দেয়া যায় তবে অন্তত সমুদ্র পথের যাত্রাতো হবেই। দেখা মিলবে দেশ বিদেশের অপার্থিব সব সৌন্দর্য আর প্রাণিজগতের।

কিন্তু বিধি বাম! দুর্ভাগ্য আর কাকে বলে। নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে সেই তরুণ দেখলেন বিশ্ব ভ্রমণ তো দূরের কথা, তাকে দিন কাটাতে হচ্ছে নর্থ ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডের ফার্থ অফ ফোর্থের মতো পরিচিত এলাকাতেই। যেখানে তিনি এর আগেও বেশ কবার এসেছেন। দুবছর যেন তার কাছে দুই শতাব্দীর মতো মনে হয়েছিলো। ফলে বিশ্বভ্রমণের ইচ্ছাটা তখন অপূর্ণই থেকে গেল।

কিন্তু কে জানত, সেই তরুণই একটা সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য তরুণের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবেন। প্রকৃতি আর প্রাণিজগতের অপার কৌতূহলের বীজ বুনে দেবেন অসংখ্য তরুণের হৃদয়ের মণিকোঠায়। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান এক নিপুণ কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে আমাদের নতুন করে, নতুনভাবে ভালোবাসতে শেখাবেন এই নীল গ্রহটিকে।

তিনি কেবল নেহাতই এক গল্পকার নন। এই নীল গ্রহটির অপার সৌন্দর্যের এক চিরউদ্যমী বর্ণনাকারী। তিনি আমাদের কখনো নিয়ে গেছেন প্রাণিজগতের অপার্থিব বিস্ময় অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে। দক্ষিণ মহাসাগরতলে ছুটে চলা অ্যান্টার্কটিক ক্রিলের ঝাঁকে, ঘন আচ্ছাদনে বেষ্টিত আমাজনের বৃষ্টিভেজা অরণ্যে, বসন্তের হিমে রকি পর্বতমালা থেকে ধেয়ে আসা ট্রাউট শিকারে ব্যস্ত সন্তর্পণে চেয়ে থাকা কৃষ্ণ ভাল্লুকদের গল্পে।

যিনি বলে যান গ্যালাপাগোসের সাঁতারু টিকটিকি ইগুয়ানার ইতিহাস, লেক নাকুরুর লাখ লাখ গোলাপি ফ্ল্যামিঙ্গোদের কীর্তিকলাপ আর ম্যারাবু সারসের ফ্লেমিংগোর ছানা শিকারের বর্ণনা।  

১৯৫৬ সালে বোর্নিওতে বেঞ্জামিন নামের একটি মালয়েশীয় সূর্য ভালুককে দুধ পান করাচ্ছেন অ্যাটেনবোরো। ছবি: সংগৃহীত

যিনি মিশে যান এক নিমেষেই সহস্র কিলোমিটার পাড়ি দেয়া অ্যালবাট্রসদের ঘরে ফেরার আনন্দে। তিনি ভিড়ে যান তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটির গ্রেট মাইগ্রেশনে। যেখানে চরে বেড়ায় লাখো ওয়াইল্ডবিস্ট, আর তাদের শিকারের অপেক্ষায় থাকা জলে কুমির আর ডাঙ্গায় চিতা-হায়েনার দল। 

সুযোগ সন্ধানী আর্কটিক শেয়ালের তুষার রাজহংসীর ডিম ছিনতাইয়ের কাব্য আর মালয় দ্বীপপুঞ্জের ওরাংওটাংদের উইপোকার শিকারের গল্প—তার মুখে শুনতে শুনতে আমরা তন্ময় হয়ে পড়ি।

জলজ মহাকাব্যের বীরত্বব্যঞ্জক আখ্যান দিতে দিতে কবে যে তার কৃষ্ণবর্ণের চুল হয়ে ওঠে শুভ্র—আমরা কেউই তা টের পাই না। অপার মুগ্ধতায় তিনি পাড়ি দেন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। পৃথিবীর হাতেগোনা কয়েকটি স্থান বাদে এই নীলগ্রহটির প্রতিটি প্রান্তেই পড়েছে তার বিচরণ।

তিনি ডেভিড অ্যাটানবোরো। আমাদের এই নীলগ্রহটির সবচেয়ে পরিচিত গল্পকার।

ডেভিড অ্যাটেনবোরো। ছবি: সংগৃহীত

অথচ এই অ্যাটানবোরোর গল্প বলার রসদ প্রথম ধাক্কাতেই প্রায় আটকে গিয়েছিল। যে বিবিসির সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে অ্যাটানবোরো পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেই বিবিসিতেই প্রথমবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন তিনি। 

বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ ও কাজ শেষে শিশুদের একটি প্রকাশনা সংস্থায় যোগ দেন অ্যাটেনবোরো। কিন্তু অল্প দিনে সেখানেও তার মোহ কেটে যায়। কারণ তিনি চাইছিলেন উন্মুক্ত এক জীবন—যে জীবন কেবল জীবিকার প্রয়োজনে নিয়মমাফিক অফিস যাত্রা নয়।

এমন সময়ই পত্রিকার পাতায় বিবিসি রেডিওর টক প্রযোজক পদে জনবল নেওয়ার খবর দেখতে পেয়ে আবেদন করেন অ্যাটানবোরো। কিন্তু প্রথমেই ধাক্কা। ওই চাকরি তার হয়নি।

কিন্তু তার জীবনবৃত্তান্ত সম্প্রচার বিভাগের প্রধান মেরি অ্যাডামসের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনিই জানালেন বিবিসি থেকে নতুন করে টেলিভিশন পরিষেবা চালু হচ্ছে। তিনি চাইলে সেখানে আবেদন করতে পারেন।

টেলিভিশনের অনুষ্ঠান সম্পর্কে তখন পর্যন্ত কোন জানা-শোনাই ছিল না অ্যাটানবোরোর। কারণ তখনও পর্যন্ত তিনি তার জীবনে একটিমাত্র টিভি অনুষ্ঠান দেখেছিলেন। তিনমাসের প্রশিক্ষণ শেষে বিবিসিতে যোগ দিলেও, অ্যাটানবোরোর অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হওয়া তখন দূর অস্ত। সে পথে ছিল অজস্র বাধা-বিপত্তিও। 

প্রামাণ্যচিত্র ওয়াইল্ড লন্ডন একটি পেরেগ্রিন বাজপাখির ছানার সাথে ডেভিড-অ্যাটেনবোরো। ছবি: সংগৃহীত

যার মধ্যে একটি, বিবিসিতে তার ঊর্ধ্বতন সহকর্মীদের ধারণা। তারা মনে করেছিলেন, অ্যাটানবোরোর দাঁত অনেক বড়। টিভি পর্দায় উপস্থাপনার জন্য কোনোভাবেই মানানসই নয়। আর এই কারণেই তাকে পর্দার আড়ালে থেকে টকস বিভাগের প্রযোজক হিসেবে কাজ শুরু করতে হয়।

কিন্তু বেশিদিন অবশ্য অপেক্ষায় থাকতে হয়নি অ্যাটানবোরোকে। ১৯৫৪ সালে বিবিসি ‘জু কোয়েস্ট’ নামে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি বিষয়ক নতুন একটি ধারাবাহিক সিরিজ চালু করে। এটি ছিল টেলিভিশন মাধ্যমে প্রথম কোনো অনুষ্ঠান, যেখানে স্টুডিওর বাইরে গিয়ে সরাসরি প্রকৃতিতে বন্যপ্রাণীদের চিত্রধারণ করা হয়েছিল। 

অনুষ্ঠানটির মূল উপস্থাপক ছিলেন লন্ডন চিড়িয়াখানার কিউরেটর জ্যাক লেস্টার। তখন লন্ডন চিড়িয়াখানার জন্য নতুন ও দুর্লভ প্রাণী সংগ্রহ করা হচ্ছিল। জ্যাক লেস্টার সিয়েরা লিওন থেকে অনেকগুলো খাঁচাভর্তি প্রাণী জাহাজে করে লন্ডনে নিয়ে আসতেন। অনুষ্ঠান চলাকালীন সময় সেই সংগৃহীত বন্য প্রাণীগুলোকে সরাসরি বিবিসির স্টুডিওতে আনা হতো। 

প্রথমে জ্যাক লেস্টার স্টুডিওর টেবিলের ওপর সেই জীবন্ত প্রাণীদের রেখে দর্শকদের দেখাতে শুরু করতেন। এই অনুষ্ঠানের ধারণাটি ছিল ডেভিড অ্যাটানবোরোরই। সেই অনুষ্ঠানে চিত্রগ্রহণের জন্য তারা সে বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সিয়েরা লিওনে যান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত দুর্লভ ‘হোয়াইট-নেকড রকফাউল’ পাখির সন্ধান করে সেটিকে ক্যামেরাবন্দি করা।

১৯৬৩ সালে বিবিসি টিভিতে একটি আর্মাডিলোর সঙ্গে ডেভিড অ্যাটেনবোরো। ছবি: বিবিসি

অ্যাটানবোরো ও ক্যামেরাম্যান চার্লস লাগাস জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে চিত্রধারণ করেছিলেন। আর জ্যাক লেস্টার প্রাণী সংগ্রহের কাজ তদারকি করতেন। সেই সফরে তারা একটি হোয়াইট-নেকড রকফাউল জীবন্ত অবস্থায় লন্ডনে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর ‘জু কোয়েস্ট’-এর প্রথম পর্ব সম্প্রচারিত হয়। 

তবে অনুষ্ঠানটি তখন আশানুরূপ জনপ্রিয়তা পায়নি। প্রথম পর্ব প্রচারিত হওয়ার ৩-৪ দিনের মধ্যেই অজানা এক রোগে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন জ্যাক লেস্টার। দুই বছর পর তিনি মারা যান।

অন্যদিকে যেহেতু সিরিজের পরবর্তী পর্বগুলোর সূচি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল, তাই বিবিসি কর্তৃপক্ষ দেখল অ্যাটেনবোরোকে উপস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।

অনুষ্ঠানটির প্রযোজক ও মূল পরিকল্পনাকারী হওয়ায় সমস্ত নাড়ি-নক্ষত্র জানা ছিল তার। এই একটি ঘটনাতেই জীবনের মোড় ঘুরে যায় ডেভিড অ্যাটানবোরোর।

তবে ডেভিড অ্যাটানবোরোর তখন কেবলই শুরু। ১৯৭৩ সালে বিবিসি থেকে প্রচারিত ১ ঘণ্টার ধারাবাহিক প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য এসসেন্ট অব ম্যান’-এ ভাষ্যকার হওয়ার মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। ১৩ পর্বের এই ধারাবাহিক প্রামাণ্যচিত্রের মধ্য দিয়ে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের ইতিহাসেও যেন নতুন এক যাত্রার সূচনা হয়।

'জু কোয়েস্ট’ সিরিজে একটি নদী হেঁটে পার হচ্ছেন ডেভিড অ্যাটেনবোরো। ছবি: সংগৃহীত

তবে অ্যাটানবোরো সবকিছু ছাড়িয়ে যান ‘লাইফ’ সিরিজ দিয়ে। ১৯৭৯ সালে প্রচারিত এই সিরিজ দিয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল সাড়া ফেলেন তিনি। ‘লাইফ’ সিরিজের প্রথম পর্ব ‘লাইফ অন আর্থ’ প্রচারিত হতেই যেন পাল্টে যায় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সংজ্ঞা। 

যিনি একমুহূর্ত আগেও ছিলেন পৃথিবীর উষ্ণতম রুক্ষ কোনো এক প্রান্তে, পর মুহূর্তেই তিনি হাজির হন হিমশীতল জনমানুষহীন কোনো এক জনপদে। কেবল লাইফ অন আর্থ অনুষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী ৫০ কোটিরও বেশি মানুষ দেখেছেন।

এই সিরিজের প্রতিটি পর্বই ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। প্রথম পর্ব ‘ইনফিনিট ভ্যারাইটি’ বা ‘অসীম বৈচিত্র্যে’ তিনি দেখিয়েছেন, পৃথিবীর প্রাণিজগত কতোটা বিস্তৃত। সেই সিরিজে তিনি তুলে ধরেন প্রাণীদের শরীরের অসীম বৈচিত্র্য। বাদ যায়নি উদ্ভিদ জগতও।

অ্যাটানবোরোর বর্ণনায় প্রাণিজগত, উদ্ভিদের সুগঠিত কৌশল উঠে এসেছিল নিপুণভাবে। একে একে তিনি হাজির হন লিভিং প্ল্যানেট, ট্রেইলস অব লাইফ, লাইফ ইন ফ্রিজারের মতো অভূতপূর্ব সিরিজ নিয়ে।

লাইফ ইন ফ্রিজার ছিল অ্যান্টার্কটিকার প্রাকৃতিক ইতিহাস ও প্রাণিজগত নিয়ে প্রথম কোনো টেলিভিশন সিরিজ। পাখিদের নিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন ‘লাইফ অব বার্ডস’, পোকামাকড়দের জীবনচক্র নিয়ে ‘লাইফ আন্ডারগ্রোথ’, সরীসৃপ প্রাণীদের নিয়ে ‘লাইফ ইন কোল্ড ব্লাড’, উদ্ভিদ জগৎ নিয়ে ‘লাইফ অব প্ল্যান্টস’সহ অসংখ্য প্রামাণ্যচিত্র।

প্রামাণ্যচিত্রের জন্য বকের ডাক রেকর্ড করছেন ডেভিড-অ্যাটেনবোরো, পাশেই ক্যামেরাম্যান চার্লস লাগাস। ছবি: সংগৃহীত

সবশেষ ২০২৫ সালে অ্যাটেনবোরো ধারাবর্ণনা করেছেন ‘ওশান’ নামক প্রামাণ্যচিত্রে। যেখানে তিনি মহাসাগরকে তুলনা করেছেন এক প্রাকৃতিক মহাবিস্ময় ও প্রাণের প্রতীক হিসেবে। তার ভরাট গলার জাদুকরী বর্ণনা আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায় প্রাণিজগতের অপার্থিব সৌন্দর্যে।

কেবল প্রাণিজগৎ বা উদ্ভিদজগতের নিখাদ বর্ণনাই নয়, পাশাপাশি ইতিহাসকে গল্পের মতো করে সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন অ্যাটানবোরো। বিশ্বময় চষে বেড়িয়ে তিনি একাধারে তুলে ধরেছেন অজানা, অচেনা প্রাণী আর উদ্ভিদজগতের জীবন রহস্যের ইতিহাসও।

এই প্রাণ ও প্রাণিজগতকে তুলে আনতে গিয়ে অ্যাটেনবোরো ছেড়েছেন শত লোভনীয় প্রস্তাব। ১৯৭২ সালে যখন বিবিসির মহাপরিচালক হিসেবে ডেভিড অ্যাটেনবোরোর নাম প্রস্তাব করা হলো, তখন ভাই প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার রিচার্ড অ্যাটেনবোরোকে ডেভিড বলেছিলেন, ‘এই ধরনের প্রশাসনিক কাজের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি আসলে প্রামাণ্যচিত্রেই ফিরতে চাই।’ 

পরের বছরেই আবার প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজে ফিরে যান অ্যাটেনবোরো। বিবিসিও তা স্বাচ্ছন্দ্যেই মেনে নেয়।

প্রামাণ্যচিত্র 'সেভেন ওয়ার্ল্ডস, ওয়ান প্ল্যানেট’ এর শুটিংয়ের জন্য আইসল্যান্ডে অ্যাটেনবোরো। ছবি: সংগৃহীত

সাত দশকের বেশি সময় ধরে চলমান এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার জগতে, তথ্যচিত্র আর প্রাণিজগতের অপার বিস্ময়ের খোঁজে ডেভিড অ্যাটেনবোরো কত প্রান্তে গেছেন, কত প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন—তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ প্রাণিবিজ্ঞানী ডেসমন্ড মরিসের একটি উক্তিতে। 

ডেসমন্ড নিজেও বিবিসির হয়ে কাজ করেছেন। অ্যাটানবোরো সম্পর্কে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমার ঘরে যে পৃথিবীর মানচিত্রে রয়েছে, সেখানে অনেক জায়গাতেই আলপিন গাঁথা আছে। সেসব জায়গায় আমি গেছি বলে আলপিন গেঁথে রেখেছি। আর ডেভিড এমন কিছু জায়গায় আলপিনে গেঁথে রেখেছে যেখানে সে যায়নি। সেই সংখ্যাটি অবশ্য খুবই নগণ্য।’

বিশ্বজুড়ে নিরলস ভ্রমণ করে এত অবিশ্বাস্য এক জীবন অতিক্রম করার পরও, ডেভিড অ্যাটেনবোরোর কাছে আজও পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় স্থান—লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সবুজ ও শান্ত উপশহর রিচমন্ড। সেখানে বহু বছর ধরে ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের একটি বাড়িতে বসবাস করছেন তিনি।

আজ ৮ মে ডেভিড অ্যাটেনবোরোর শততম জন্মদিন।

আগের মতো পৃথিবী জুড়ে চষে বেড়ানোর জন্য শত বছর বয়সী অ্যাটেনবোরোর শরীর আর প্রস্তুত নয়। কিন্তু মনপ্রাণ জুড়ে আজও তিনি আশ্চর্য রকম সজীব। চলতি বছরের শুরুতে বিবিসির প্রামাণ্যচিত্র ‘ওয়াইল্ড লন্ডন’ এ তিনি লন্ডনের বন্যপ্রাণী নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। 

আজ থেকে ঠিক আশি বছর আগে অ্যাটেনবোরো যেমন আশ্চর্যরকম কৌতূহলী ছিলেন, আজও তিনি ঠিক তেমনই। আজও অসীম আগ্রহ নিয়ে সূর্যোদয় দেখতে বসেন, গভীর মমতায় বাড়ির সামনের লনে পাতা দেখে পরম মমতায় ছুঁয়ে দেন।

সব বয়সের মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয় ডেভিড অ্যাটেনবোরো। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথের লিখেছেন ‘দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশিরবিন্দু।’  

বিন্দু থেকেই সিন্ধু, সর্বত্রেই বিচরণের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ সম্ভবত একজন— স্যার ডেভিড ফ্রেডরিক অ্যাটেনবোরো।

প্রিয় প্রাণিবন্ধু ডেভিড অ্যাটেনবোরো, আপনি আমাদের মাঝে আরও অনন্তকাল মায়া ছড়িয়ে থাকুন। জন্মশতবার্ষিকীতে আপনার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

সহায়ক গ্রন্থসূত্র: 

Life on Air: Memoirs of a Broadcaster/ David Attenborough

Adventures of a Young Naturalist: The Zoo Quest Expeditions/ David Attenborough