ভাষার রাজনীতি বনাম রাজনীতির ভাষা: দার্শনিক বিচার
কোন ভাষা কতখানি সমৃদ্ধ সেটা অনেকাংশে নির্ভর করে ভাষার শব্দ সম্ভারের ওপর। বাংলা ভাষা তার শব্দ সম্ভারের জন্যে নানা ভাষার কাছে ঋণী। বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের ব্যবহার সব সময়ই চলেছে। আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, ইংরেজি ভাষার প্রচুর শব্দ বাংলায় ব্যবহার হয়। আছে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, চীনা, জাপানি, তুর্কি, বর্মি, হিন্দি, গুজরাটি ইত্যাদি ভাষার শব্দও।
অন্য ভাষার কোনো শব্দ আমরা নেব কি নেব না, ব্যবহার করব কি করব না—এমন বিতর্ক মাঝে মাঝেই ওঠে। বিশেষত ঠিক একইরকম বা একই অর্থবোধক শব্দ যখন বাংলায় থাকে, তখন অন্য ভাষার শব্দ কেন নেব—এমন প্রশ্ন ওঠা মোটেই অযৌক্তিক নয়।
সম্প্রতি এমনই একটা বিতর্ক আমরা দেখছি কিছু আরবি, উর্দু শব্দ নিয়ে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, ‘ইনসাফ’, ‘জুলুম’-এর মতো আরবি ও উর্দু শব্দের ব্যবহার বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—এই শব্দগুলো কি কেবল ভাষাগত ব্যাপার নাকি রাজনৈতিক ও আদর্শিক মেরুকরণের ইঙ্গিত? এটা কি নতুন রাজনীতির ভাষা নির্মাণের প্রয়াস নাকি ভাষা নিয়ে রাজনীতি?
বাংলাদেশে এমন একটা ধারা বহুদিন ধরেই চলছে। তবে সেটা সরাসরি রাজনীতিতে এভাবে ব্যবহার হতে দেখা যায়নি। ‘খোদা’ বলব না ‘আল্লাহ’, ‘নামাজ’ বলব না ‘সালাত’, ‘রোজা’ না ‘সিয়াম’, ‘সেহরি’ না ‘সাহরি’, ‘রমজান’ না ‘রামাদান’—এমন বিতর্কের কথা সম্ভবত সবাই শুনেছেন। ধর্ম পালনের জগত ছেড়ে সেই বিতর্ক এখন রাজনীতির ময়দানে ঢুকে পড়েছে।
ভাষার রাজনীতি বলতে বোঝায় যখন কোনো ভাষাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় নীতি, আধিপত্য বা গোষ্ঠীগত পরিচয় নির্ধারিত হয়। এখানে ভাষাই হলো লক্ষ্য বা রাজনৈতিক সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
বাংলাদেশে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল ভাষার রাজনীতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। রাষ্ট্র যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে এই অঞ্চলের জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইল, তখন বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হয়ে ওঠে। রাজপথে নামে, রক্ত দেয়। এখানে রাজনীতি আবর্তিত হয়েছিল এক বিরাট জনগোষ্ঠীর ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং শেষ বিচারে ওই ভাষার টিকে থাকার অধিকার নিয়ে।
এমনকি বর্তমানেও বাংলাদেশে যখন ‘প্রমিত বাংলা’ বনাম ‘আঞ্চলিকতা’ কিংবা ‘বাংলা’ বনাম ‘ইংরেজি’ বা ‘আরবি-উর্দু’র বিতর্ক ওঠে, তখন সেটিও আসলে ভাষার রাজনীতি। কখনো অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি ও হিন্দি শব্দের আগ্রাসন বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে ও এখনো দিচ্ছে। কোন ভাষা বা কোন ধরনের শব্দ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বেশি মর্যাদা পাবে, তা নির্ধারণ করা এ রাজনীতির কাজ।
অন্যদিকে রাজনীতির ভাষা হলো ক্ষমতা বা লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভাষাকে ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা। অর্থাৎ রাজনীতি করার জন্য যখন বিশেষ কোনো ঢং, শব্দ বা পরিভাষা বেছে নেওয়া হয়। নেতারা যখন তাদের বক্তৃতায় বা স্লোগানে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘জয় বাংলা’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ‘নারায়ে তাকবির’ বা ‘গোলামি না আজাদি’র মতো শব্দ ব্যবহার করেন, তখন তারা মূলত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আবেগ বা আদর্শকে জাগিয়ে তুলতে চান।
ভাষা নিয়ে রাজনীতি যেমন বিভাজন তৈরি বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজ করে, তেমনি রাজনীতির ভাষাও কখনও কখনও বিভাজন তৈরি করতে পারে। বিশেষ বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আলাদা পরিচয় জাহির করে এবং প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে।
শব্দ যখন কেবল অর্থ প্রকাশের মাধ্যম না থেকে ‘মতাদর্শের বাহক’ হয়ে ওঠে, তখন ভাষা আর সাধারণ থাকে না। ভাষা তখন হয়ে ওঠে ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার।
মিশেল ফুকোর ডিসকোর্স এবং ‘ক্ষমতা-জ্ঞান’ সম্পর্ক
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো বলছেন, ভাষা হলো একটি ‘ডিসকোর্স’ বা বক্তব্য, যা ক্ষমতা চর্চার প্রধান মাধ্যম। জ্ঞান বা ভাষা কখনোই নিরপেক্ষ নয়। ফলে কোনো শব্দ বা বাক্য এমনি এমনি প্রতিষ্ঠিত হয় না, তার পেছনে থাকে ক্ষমতার প্রভাব।
বাংলাদেশে ‘বিপ্লব’ বা ‘মুক্তি’র বদলে ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’র মতো শব্দের হঠাৎ উত্থানকে ফুকোর ‘রেজিম অব ট্রুথ’ বা ‘সত্যের শাসন’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। যারা এই শব্দগুলো ব্যবহার করছেন, তারা একটি নতুন ‘সত্য’ বা বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। এই শব্দগুলো বা স্লোগানগুলোর ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বোঝাতে চান যে আগের ভাষা বা স্লোগানগুলো এখন অকার্যকর। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের বিপরীতে আমরা তৈরি হতে দেখেছি ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শব্দমালা।
ফুকোর মতে, যে ভাষা নিয়ন্ত্রণ করে, সে মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ, রাজনীতির মাঠে এই শব্দগুলো কেবল শব্দ নয়, এগুলো হলো ক্ষমতার নতুন বিন্যাস।
আন্তোনিও গ্রামশির ‘সাংস্কৃতিক হেজেমনি’
ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশি দেখিয়েছিলেন যে, শাসকগোষ্ঠী কেবল পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে শাসন করে না, তারা মানুষের চিন্তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে সংস্কৃতি ও ভাষার মাধ্যমে।
বর্তমানে উর্দু বা আরবি ঘরানার শব্দের ব্যাপক ব্যবহার একটি ‘কাউন্টার-হেজেমনি’ বা পাল্টা-আধিপত্য তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। গত কয়েক দশকের প্রতিষ্ঠিত ‘সেক্যুলার’ বা ‘ভাষিক জাতীয়তাবাদী’ শব্দের আধিপত্য ভেঙে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়কে মূলধারায় নিয়ে আসা এর লক্ষ্য।
যখন একদল মানুষ মিছিলে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘গোলামি না আজাদি’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে একটি নতুন সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা হেজেমনির ভিত্তি স্থাপিত হচ্ছে। এটা সফল হলে সাধারণ মানুষ অবচেতনভাবেই ওই রাজনৈতিক আদর্শকে গ্রহণ করতে শুরু করবে।
লুডভিগ ভিটগেনস্টাইনের ‘ল্যাঙ্গুয়েজ গেমস’
অস্ট্রীয়-ব্রিটিশ দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইনের মতে, শব্দের অর্থ অভিধানে নেই, আছে তার ব্যবহারিক জীবনে। তিনি একে বলেছেন ‘ল্যাঙ্গুয়েজ গেমস’ বা ভাষার খেলা।
‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, ‘ইনসাফ’-এর মতো শব্দগুলোর আভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে এগুলোর ব্যবহার একটা বিশেষ গেম বা কৌশল। একটা গোষ্ঠী এই শব্দগুলো ব্যবহার করে আসলে একটা বিশেষ সামাজিক ও রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে নিজেদের সংহতি প্রকাশ করছে এবং অন্য পক্ষকে (যারা একে বিদেশি মনে করে) বিজাতীয় হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এখানে ভাষা হলো একটি ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি’ বা সামাজিক পরিচয়পত্রের মতো।
ভিটগেনস্টাইনের ভাষায়, আপনি কোন শব্দ ব্যবহার করছেন, তা দিয়ে আপনি আপনার রাজনৈতিক জগতের সীমানা নির্ধারণ করছেন।
মার্টিন হাইডেগারের ‘সত্তার ঘর’
হাইডেগারের বিখ্যাত একটি উক্তি আছে, ‘ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ দ্য হাউস অব বিং’। অর্থাৎ, মানুষ ভাষার ভেতরেই বাস করে। ভাষাই মানুষের অস্তিত্বকে প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে বাংলা ভাষা কেবল একটি মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি তাদের অস্তিত্বেরও অংশ। যখন রাজনীতি বিদেশি ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এই ‘ঘর’ বা ভাষার ওপর হস্তক্ষেপ করে, তখন একদল মানুষ আসলে তাদের ‘সত্তার ঘর’ বা সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হয়। এটা কেবল শব্দের শুদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক নয়, ‘আমি কে?’—সেই অস্তিত্ববাদী প্রশ্নের লড়াই। অন্যদিকে যারা এগুলো ব্যবহার করছেন, তারা নতুন অস্তিত্বের ঘর নির্মাণের চেষ্টা করছেন।
‘সম্মতি উৎপাদন’ ও শেষ কথা
মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী ও দার্শনিক নোম চমস্কির মতে, শব্দ ও মিডিয়ার কৌশলী ব্যবহারের মাধ্যমে জনমত তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো যখন সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বার বার প্রচার করে, তখন তারা জনগণের মগজে একটি বিশেষ ধারণা গেঁথে দিতে চায়। এটি ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে এক ধরনের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ বা ‘সম্মতি উৎপাদন’ করার প্রক্রিয়া।
দার্শনিক বিচারে এই শব্দ-বিতর্ক কেবল ব্যাকরণগত বা আভিধানিক ভুল-শুদ্ধের বিষয় নয়। প্রচলিত বাংলা শব্দ থাকতেও যখন বিদেশি শব্দ আমদানি করে আনা হচ্ছে, তখন বুঝতে হবে সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থায় বড় ধরনের ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা বড় রকমের পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে।
ভাষা নদীর মতো প্রবাহমান একটি বিষয়। এখানে অন্য ভাষার শব্দ ঢুকে পড়া অন্যায় নয়, অসঙ্গতিপূর্ণও নয়। তবে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কখনোই সুফল বয়ে আনেনি, আনবেও না। ঠিক যে কারণে ১৯৫২ সালে উর্দুকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিপরীতে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করতে হয়েছিল আমাদের পূর্বসূরীদের। সেই একই বিভাজনের রাজনীতি বার বার কাম্য নয়।