ঈদের কথা-গানে প্রাণের সুর
শুধু নতুন পোশাকে বা বাহারি সেমাইয়ের সুগন্ধে নয়, ঈদ আসে গানে গানে। ঈদের আগমনী বার্তা বয়ে আনে এমন কিছু গান, যা একবার কানে বাজলে আর মন থেকে মুছতে চায় না।
বাংলায় ঈদের গানের এই যাত্রা কখনো নজরুলের কলমে প্রাণ পেয়েছে, কখনো বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল হয়ে টেলিভিশনের পর্দা ছেড়ে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার কখনো সাধারণ মানুষের ঘরে ফেরার আকুলতা হয়ে বেজে উঠেছে।
তাই বাংলার ঈদসংগীতের এই যাত্রাকে এক কথায় বলা যায় বাংলাভাষী মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগ-অনুভূতি, যাপিত জীবন ও আনন্দ-বেদনার এক ইতিহাস।
আধঘণ্টার সাধনা, ছয় মাসের পরিশ্রম
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ — এই কালজয়ী গানটির কথা উঠলেই প্রথমে মাথায় আসে ঈদের চাঁদ রাতে টেলিভিশনে ভেসে ওঠা সরু বাঁকা চাঁদের ছবি। কিন্তু এই সৃষ্টির পেছনের গল্পটি ঠিক গানটির মতোই অনবদ্য।
সে সময় গানের বাজারে শ্যামাসংগীতের রমরমা। কাজী নজরুল ইসলাম নিজেও তখন শ্যামাসংগীতের জন্য খ্যাতির শিখরে। এমন সময়ে শিল্পী আব্বাসউদ্দীন এক দুঃসাহসী প্রস্তাব নিয়ে হাজির হলেন বিদ্রোহী কবির কাছে।
এক রাতে রেকর্ডিং শেষে নজরুল যখন বাড়ি ফিরছিলেন, পথে তাকে থামিয়ে আব্বাসউদ্দীন বিনীতভাবে বললেন, ‘কাজী দা, একটা কথা আপনাকে অনেক দিন ধরেই বলব ভাবছি। দেখুন, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়ালরা কী সুন্দর উর্দু কাওয়ালি গায়। শুনেছি তাদের গান প্রচুর বিক্রি হয়। বাংলায় ইসলামি গান তো তেমন নেই। বাংলায় ইসলামি গান গাইলে কেমন হয়? আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার জয়গান বাজবে।’
কিন্তু প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করা সহজ ছিল না। গান রেকর্ড করতে হলে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল-ইন-চার্জ ভগবতী বাবুর অনুমতি প্রয়োজন।
নজরুল তাই বললেন, 'আগে দেখো, ভগবতী বাবুকে রাজি করাতে পারো কি না।' আব্বাসউদ্দীন গেলেন। ভগবতী বাবু রাজি হলেন না। মার্কেট ট্রেন্ডের বাইরে গিয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি তিনি নিতে চান না।
এরপর শুরু হলো আব্বাসউদ্দীনের অদম্য অনুনয়ের পর্ব। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চলল অনুরোধ। একদিন ভগবতী বাবু ফুরফুরে মেজাজে থাকায় আব্বাসউদ্দীন বললেন, 'একবার এক্সপেরিমেন্ট করে দেখুন না।' ভগবতী বাবু হেসে রাজি হলেন। বললেন, ‘নাছোড়বান্দা আপনি জনাব। আচ্ছা যান, করা যাবে। গান নিয়ে আসুন।’
তারপর এক ঠোঙা পান আর চা নিয়ে আব্বাসউদ্দীন গেলেন নজরুলের কাছে। পান মুখে নজরুল খাতা-কলম হাতে ঘরের দরজা বন্ধ করলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে আব্বাসউদ্দীন পায়চারি করতে লাগলেন।
প্রায় আধঘণ্টা পর দরজা খুলে নজরুল একটা কাগজ তার হাতে দিলেন। সেই কাগজে লেখা—‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ / তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ।’
ছয় মাসের পরিশ্রম আর আধঘণ্টার সাধনার ফসল মিলে সৃষ্টি হলো বছরের পর বছর ধরে বাজতে থাকা বাঙালির ঈদের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি।
রেকর্ডিংয়ের দিন হারমোনিয়ামের ওপর আব্বাসউদ্দীনের চোখ বরাবর কাগজটি ধরে রাখলেন নজরুল নিজেই। কারণ গানটি তখনও আব্বাসউদ্দীনের মুখস্থ হয়নি। ঈদের সময় অ্যালবাম বের হলো।
ছুটি শেষে কলকাতায় ফেরার পথে ট্রামে বসে আব্বাসউদ্দীন শুনলেন পাশের এক যুবক গুনগুনিয়ে গাইছেন সেই গান। বিকেলে গড়ের মাঠে দেখলেন, কয়েকটি ছেলে দল বেঁধে বসে গাইছে। আনন্দ আর সইতে পারলেন না, ছুটে গেলেন নজরুলের কাছে। তখন নজরুল দাবা খেলছিলেন। আব্বাসউদ্দীনের গলার স্বর শুনেই দাবা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে জড়িয়ে ধরলেন— 'আব্বাস, তোমার গান কি হিট হয়েছে!'
নজরুলের ঈদের গানে শ্রেণিচেতনা
নজরুল এমনই এক কবি যিনি উৎসব-আনন্দেও দুঃখী-দুর্বলের কথা ভোলেন না। তাই নজরুলের ঈদের গানগুলো শুধু উৎসবের আনন্দের প্রকাশ নয়, সেখানে বারবার ফিরে আসে সমতা ও মানবিক দায়িত্বের সুর।
'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে' গানে কবি লিখলেন, 'দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ।' ঈদের খুশির মাঝেও তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন যারা জীবন ভরে রোজা রাখছে, সেই নিত্য উপবাসী গরিব, এতিম, মিসকিনের কথা।
তার আরেকটি গান 'এলো আবার ঈদ'-এ তিনি লিখেছেন,
‘শিয়া সুন্নি, লা-মজহাবী একই জামাতে
এই ঈদ্ মোবারকে মিলিবে এক সাথে,
ভাই পাবে ভাইকে বুকে, হাত মিলাবে হাতে;
আজ এক আকাশের নীচে মোদের
একই সে মসজিদ, চলো ঈদগাহে।।’
ভিন্ন ধর্ম তো বটেই, একই ধর্মের ভেতরেও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এই অকপট অবস্থান নজরুলের চরিত্রের সঙ্গে সার্বিকভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। নজরুল সারাজীবন মানুষে মানুষে ভাগ করা রেখাগুলো মুছে দিতে চেয়েছেন। 'ওরে ও নতুন ঈদের চাঁদ' গানে তিনি লিখেছেন,
‘খোদার আদেশ তুমি জান স্মরণ করাও এসে
যাকাত দিতে দৌলত সব দরিদ্রেরে হেসে
শত্রুরে আজি ধরিতে বুকে শেখাও ভালোবেসে।
তোমায় দেখে টুটে গেছে অসীম প্রেমের বাঁধ।।’
নজরুলের ঈদের গানের লিরিকে একটা বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে, এখানে আনন্দ কখনো আত্মকেন্দ্রিক নয়। বরং তিনি জীবনের বৃহৎ দিকটির দিকেই মনোনিবেশ করেছেন। নজরুল সর্বময় হয়েছেন। শত্রুকে বুকে জড়িয়ে, জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসতে চেয়েছেন।
আমাদের সবার মুখে মুখে থাকা ঈদের সেই বিখ্যাত ‘ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটির শেষে যে 'তোরে মারল ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা / সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ' এই পঙক্তিটি আছে তা কয়জনই বা জানে। হয়তো নজরুলের এই লাইনটি জসীমউদ্দীনের প্রতিদান কবিতার ‘আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা, আমি বাঁধি তার ঘর, আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।’
তাই হয়তো নজরুলকে বলা হয় বাঙালি মুসলমানের কেবল সাহিত্যের নয়, চিন্তারও আঁতুড়ঘর। নজরুলের ঈদের দর্শন প্রতিশোধের বদলে প্রেমের আহ্বান। তিনি বাঙালি মুসলমানের মুখে গান তুলে দিয়েছেন।
যেখানে বাংলার সোনালি যুগের বড় বড় বিখ্যাত সব শিল্পীদের কণ্ঠে মুসলমানের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদের সুর খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে নজরুল বাঙালি মুসলমানের কণ্ঠে গান দিয়ে তার প্রধান ধর্মীয় উৎসবকে কেবল ভোজন-উৎসবে সীমাবদ্ধ হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।
আটরশির দরবারে মারেফতের চাঁদ
বাংলার ঈদ-সংগীতের আলোচনায় দরবারি ও তরিকতপন্থী গানের কথা না বললে একটা বড় জায়গা অপূর্ণ থাকে। ফরিদপুরের আটরশি দরবার শরীফকে কেন্দ্র করে যে গানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সেটি হলো 'নতুন ঈদের চাঁদ উঠেছে আটরশির গায়, তোরা দেখবি কারা ভাইবোনেরা আয়রে ছুটে আয়'। আটরশির এই গানটি মূলত একটি ভক্তিমূলক আমন্ত্রণের গান।
গানটির বিশেষত্ব হলো এখানে ঈদের চাঁদ শুধু উৎসবের প্রতীক নয়, সে একটি আধ্যাত্মিক আলোকেরও রূপক। ‘কত মধুর রূপ যে সুরত ওই চাঁদেরই মুখ, আরে তাহার চাইতে সুন্দর আমার বিশ্বওলির রূপ’।
এখানে তরিকতের দরবারে চাঁদের সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যাচ্ছেন পীর বা ওলির সৌন্দর্য। এটি বাংলার সুফি ও মরমি গানের ধারার অন্যতম একটি চিহ্ন, এখানে প্রেম ঐশ্বরিক ও মানবিক একই সঙ্গে।
এই গানটি মূলধারার মিডিয়ায় তেমন আসেনি, কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাখো ভক্তের কাছে ঈদের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিগত কয়েক বছরে গানটি আবার নতুন করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। নেটিজেনদের অনেকে গানটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মজা করেছেন।
তবে এই গানটি মনে করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের ঈদ-সংগীতের একটি শিকড় রয়েছে গ্রামের দরগা-মাজার-দরবার ঘিরে, যেখানে ধর্ম ও সংগীত একে অপরের বিপরীতে নয়।
‘ভাইসাব হবরে খান’ নাকি ‘ভাইসাব খবর একখান?’
২০০১ সাল। টেলিভিশন তখন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। কোমল পানীয়ের একটি বিজ্ঞাপন সেই ঈদে অন্যরকম ঢেউ তুলল।
নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় বেলাল হোসেনের গাওয়া— 'ভাইসাব হবরে খান, হবরে খান, দেরি অইয়া যায়।' গানটি বিজ্ঞাপন থেকে দেশ মাতালো। মানুষ হাসল, মুগ্ধ হলো এবং মনে রাখল।
গানটির মূল শক্তি এর আঞ্চলিকতায়। বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন-সংস্কৃতিতে তখন প্রমিত বাংলা বা ইংরেজিই ছিল ভরসার জায়গা। এই জিঙ্গেল সেই ধারণাটা ভেঙে দিল।
সাবলীল নোয়াখালীর ভাষায়— 'এক বছরে দুইআন খুশি আমরা মুসলমান, একখান হইল রমজানের ঈদ আরেকখান কুরবান।' গানটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেল।
এই গানের ভেতর আছে সহজ সত্য। এখানে কোনো দার্শনিক গভীরতা নেই, কিন্তু সরল এই কথাগুলো মানুষের ঈদের অনুভূতিকে একদম ঠিকঠাক ধরে ফেলেছে।
পরে সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাতেও গানটি রেকর্ড হয়েছে। এই গান প্রমাণ করে ঈদের আনন্দ এক হলেও সেই আনন্দ প্রকাশের ভাষা বহু।
স্বপ্ন যাবে বাড়ি: নতুন প্রজন্মের থিম সং
২০০৯ সালে মোবাইল অপারেটর কোম্পানির একটি বিজ্ঞাপনের জন্য তিনটি লাইন লিখলেন আনিকা মেহজাবীন। সুর দিলেন হাবিব ওয়াহিদ এবং গাইলেন মিলন মাহমুদ।
কেউ ভাবেনি এই গান একদিন ঈদযাত্রার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হয়ে উঠবে। ২০১৬ সালে রাসেল মাহমুদের লেখায়, হাবিব ওয়াহিদের সুরে, মিঠুন চক্রের কণ্ঠে ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’ ফিরে এলো নতুন রূপে। এবার আর শুধু বিজ্ঞাপনের গান রইলো না।
এই গানটির আবেদন বুঝতে হলে বাংলাদেশের সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের কথা ভাবতে হবে, যারা কাজের জন্য শহরে থাকেন এবং ঈদে বাড়ি ফেরেন।
অগ্রিম টিকিটের লড়াই, দীর্ঘ যানজট, বাসের ঘাম ঝড়ানো ধাক্কাধাক্কি। এত কিছুর পরেও বাড়ির গন্ধ কাছে আসতে থাকলে যে তীব্র অনুভব কাজ করে, সেটাই 'স্বপ্ন যাবে বাড়ি'। গানটি কেবল এই অনুভূতিকে ভাষা দিয়েছে।
শিল্পী মিঠুন চক্র একটি সাক্ষাৎকারে জানান, স্টেজ প্রোগ্রামে যখন দর্শক তার গলায় গানটি শোনেন, তখন অনেকেই অবাক বনে যান যে এটা তার গাওয়া গান। কিন্তু গল্পটা জানার পরে মানুষ যে ভালোবাসা দেন, সেটাই তার বড় প্রাপ্তি।
প্রবাসীদের কাছে গানটির মাত্রা আরও গভীর। লন্ডনে থাকা উত্তরবঙ্গের ছেলে যখন ঈদে এই গান শোনেন, তার চোখে পানি আসে। কারণ এই গান তার সেই দূরত্বের কথা বলে, যেটা সকল চেষ্টার পরেও কমানো যায় না।
সুর থেকে সুরে
নজরুলের ঈদের গান থেকে আটরশির ভক্তিগীতি, সেখান থেকে আঞ্চলিক জিঙ্গেল। তারপর প্রজন্মের ‘হোমসিক থিম সং’। এই যাত্রাটা আসলে বাংলাভাষী মানুষের আবেগ-অনুভূতির ও সমাজ-বাস্তবতার বিবর্তনের গল্প। ঈদের আনন্দ প্রতিটি যুগে একই থেকেছে, কিন্তু সেই আনন্দের ভাষা বদলে গেছে।
নজরুল যখন লিখলেন 'তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে', তখন তিনি ঈদকে দেখলেন আত্মদানের উৎসব হিসেবে। 'ভাইসাব হবরে খান' গানে যখন আসলো 'দেরি অইয়া যায়', তখন সে তুলে ধরলো বাস্তব জীবন-বহির্ভূত কাঠখোট্টা প্রমিত বাংলার বিপরীতে বাংলার মাটি ও মানুষের জীবন্ত কণ্ঠস্বর।
'স্বপ্ন যাবে বাড়ি' যখন বলল ঘরে ফেরার কথা, তখন সে ছুঁয়ে গেল ব্যস্ততম আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতম যাপিত জীবনটাকে। ঈদের গান তাই শুধু উৎসবের সাজসজ্জা নয়। এটা এমনই এক আয়না, যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম নিজেকে দেখতে পায়। সুর বদলায়, কথা বদলায়, কিন্তু সেই দেখার আকাঙ্ক্ষাটুকু ঠিক একই থাকে।