অলিগলিতে লাইভ বেকারি: জনপ্রিয়তার পাশাপাশি চাই খাদ্য-নিরাপত্তার মান

হুমায়ুন আহমেদ বিলাস

রাজধানীতে এখন খুব কম এলাকা আছে, যেখানে ‘লাইভ বেকারি’ দেখা যায় না। সেখানে ওভেন থেকে বের হওয়া গরম পাউরুটি, কেক, প্যাটিস, পিৎজা, বিস্কুট, টোস্টসহ নানা ধরনের বেকারি পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। টাটকা খাবারের ঘ্রাণ, চোখের সামনে প্রস্তুত হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং তুলনামূলক কম দাম—সবমিলিয়ে অল্প সময়েই লাইভ বেকারি একটি জনপ্রিয় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এ ধরনের প্রতিষ্ঠান দ্রুত বাড়ছে।

এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে এবং ভোক্তারা তাজা খাবার পাচ্ছেন। তবে এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে—এসব বেকারিতে খাদ্য-নিরাপত্তা ও মান কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে?

বর্তমানে অনেক লাইভ বেকারি এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও উৎপাদন মান বজায় রাখার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোট পরিসরের দোকান বা সীমিত জায়গায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে কাঁচামাল সংরক্ষণ, উৎপাদন এলাকা পরিষ্কার রাখা, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করা এবং প্রস্তুতকৃত খাবার নিরাপদে সংরক্ষণের মতো মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা সম্ভব হয় না।

খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ময়দা, ডিম, মাখন, দুধ, ক্রিমসহ বিভিন্ন কাঁচামাল ব্যবহারের আগে ও পরে পাত্র, ট্রে, মোল্ড, মিক্সারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখা প্রয়োজন। একইভাবে উৎপাদনস্থলের মেঝে ও পরিবেশও পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ছোট বেকারিতে এসবের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বা পৃথক ওয়াশিং স্টেশন থাকে না। ফলে খাদ্যের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

খাদ্য কেবল একটি পণ্য নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই প্রতিটি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা মান অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে লাইভ বেকারিগুলোর একটি বড় অংশই সেই মানদণ্ডের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। স্বাস্থ্যবিধি ও মানদণ্ড অনুসরণ না করার কারণে বিভিন্ন সময়ে অনেক লাইভ বেকারিকে জরিমানাও করা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, গত ৯ ফেব্রুয়ারি দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যশোর শহরের রেল রোড এলাকার লাইভ বেকারি অ্যান্ড ফাস্টফুড প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের অভিযোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

অনেকেই মনে করেন, লাইভ বেকারিতে চোখের সামনেই তৈরি হচ্ছে বলে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু দৃশ্যমান এই স্বচ্ছতা সবসময় খাদ্য-নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক প্রতিষ্ঠান খুব ছোট জায়গায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে, যেখানে কাঁচামাল সংরক্ষণ, উৎপাদন এলাকা, প্রস্তুত পণ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

খাদ্য প্রস্তুতকারীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক খাদ্য-নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী, খাদ্য উৎপাদনের সময় গ্লাভস, হেয়ার নেট, অ্যাপ্রন এবং প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে বেকারিতে অনেক কর্মী খালি হাতে খাদ্য স্পর্শ করেন। আবার বেশির ভাগ লাইভ বেকারিতে খাদ্য উৎপাদনের সময় গ্লাভস, হেয়ার নেট, অ্যাপ্রন ও মাস্ক ব্যবহার করা হয় না।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, লাইভ বেকারিতে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ পণ্যে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ব্যবহৃত উপাদান উল্লেখ থাকে না। ফলে ভোক্তা জানতে পারেন না পণ্যটি কখন তৈরি হয়েছে, কতদিন নিরাপদ থাকবে কিংবা এতে এমন কোনো উপাদান রয়েছে কি না, যা তার জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অথচ, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি মোড়কজাত বা প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যের গায়ে বেশকিছু তথ্য স্পষ্টভাবে বাংলায় অথবা বাংলার পাশাপাশি অন্য ভাষায় লেখা বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে অন্যতম হলো খাদ্য উপাদান বা উপকরণের ধরন ও নাম; উৎপাদনের তারিখ; মোড়কীকরণের তারিখ; মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ; পুষ্টিগত তথ্যাবলি; খাদ্য-সংযোজন দ্রব্য ইত্যাদি।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে লাইভ বেকারি পরিচালনার ক্ষেত্রে খাদ্য-নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, উৎপাদন পরিবেশ ও মান নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে তদারকি করা হয়। ফলে ভোক্তারা আস্থার সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের খাদ্য গ্রহণ করতে পারেন।

বাংলাদেশেও খাদ্য উৎপাদনের জন্য আইন ও বিধিমালা রয়েছে। একটি বেকারি পরিচালনার জন্য শুধু ট্রেড লাইসেন্সই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ এবং নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় থাকা। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা শুরু করে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও থাকে না।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক প্রতিষ্ঠান মানসনদ, প্রশিক্ষিত জনবল ও স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন পরিবেশ ছাড়াই এই ব্যবসা পরিচালনা করছে। গত ১৫ জুন জাগো নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজশাহী মহানগরীতে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়াই খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করাসহ আরও কিছু অভিযোগে একটি লাইভ বেকারিকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই অনলাইন পোর্টালের গত ২৪ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসটিআইয়ের মান সনদ না নিয়ে মিষ্টি, দই, বিস্কুট, পাউরুটি ও কেকসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন এবং বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগে চাঁদপুরের ইলিশ চত্বর এলাকার কাশ্মীরি সুইটস অ্যান্ড লাইভ বেকারিকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের এসব অভিযানে যা পাওয়া যাচ্ছে সেটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, লাইভ বেকারিগুলোকে আইনের মধ্যে রেখে নিয়মিত তদারকি করা জরুরি।

বেকারি খাতে দক্ষ জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই কর্মীদের দিয়ে খাদ্য উৎপাদনের কাজ করানো হচ্ছে, যা খাদ্যের মান ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অনেকের কাছে হয়তো মনে হতে পারে, এই আলোচনাটা লাইভ বেকারি খাতকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতা মোটেও তেমন নয়। বরং এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে আরও নিরাপদ, টেকসই ও ভোক্তাবান্ধব করে তোলাই এই আলোচনার লক্ষ্য। লাইভ বেকারি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করছে, কর্মসংস্থান বাড়াচ্ছে এবং ভোক্তাদের চাহিদাও পূরণ করছে। তাই এই খাতের বিকাশের পাশাপাশি খাদ্য-নিরাপত্তার মানও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

এ জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে লাইভ বেকারির জন্য একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। সেখানে উৎপাদনস্থলের ন্যূনতম আয়তন, নিরাপদ পানি ব্যবহার, কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বাধ্যতামূলক সুরক্ষা পোশাক, যন্ত্রপাতি পরিষ্কার রাখার মানদণ্ড, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পণ্যের লেবেলিং এবং নিয়মিত পরিদর্শনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হলে তারা সহজেই এসব মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারবেন।

একইসঙ্গে ভোক্তাদের সচেতনতাও বাড়াতে হবে। শুধু গরম বা টাটকা দেখেই খাদ্য কেনার পরিবর্তে দোকানের পরিচ্ছন্নতা, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি এবং পণ্যের প্রয়োজনীয় তথ্য দেখে কেনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সচেতন ভোক্তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার অন্যতম বড় শক্তি।

বাংলাদেশে লাইভ বেকারি শিল্পের সম্ভাবনা অনেক। প্রয়োজন শুধু এমন একটি নীতিমালা, যেখানে উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ভোক্তার স্বাস্থ্য, উভয়ই সমান গুরুত্ব পাবে। কার্যকর তদারকি, বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আরও আস্থার জায়গা তৈরি করবে।

 

হুমায়ুন আহমেদ বিলাস: করপোরেট কমিউনিকেশনস ও পাবলিক রিলেশন্স নিয়ে কাজ করছেন।
humayun.mcj02@gmail.com