৯ বছর পর বাড়ি ফেরা ভারতীয় ক্রিকেটারের অবিশ্বাস্য সংগ্রামের গল্প
ক্রিকেটকে ভালোবেসে সাফল্য পেতে নিবেদন বুঝি একেই বলে। বড় কিছু অর্জনের নেশায় কিশোর বয়সে বাড়ি ছেড়েছিলেন কুমার কার্তিকেয়া সিং। পরিবারের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বড় কিছু অর্জন না করে আর ফিরবেন না। এরপর খেয়ে না খেয়ে কঠিন লড়াই চালিয়ে সাফল্যের মুখ দেখলেন। বাড়ি ফিরে মায়ের দেখা পেলেন ৯ বছর ৩ মাস পর!
তার জীবনের গল্প রোমাঞ্চকর, আবেগময়। ১৫ বছর বয়েসে তিনি যখন কানপুরের বাড়ি ছাড়েন তখনো কেবল একটা স্বপ্ন বুকে জমা ছিল তার। সেই স্বপ্নের পিছু ছুটতে গিয়ে করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম, আধপেটা খেয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ।
অনেক সংগ্রামের পর আলোর মুখ দেখেন গত আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে সুযোগ পেয়ে। অভিষেকেই ছড়ান আলো। এরপর রঞ্জি ট্রফিতে মধ্যপ্রদেশের শিরোপা জেতায় রাখেন অবদান। এই দুই সাফল্যের পর তার মনে হয়েছে এসেছে অর্জন। অবশেষে তিনি গেলেন বাড়িতে। বুধবার ২৪ পেরুনো এই স্পিনার টুইটারে নিজের মায়ের সঙ্গে ছবি দিয়ে পোস্ট করেন, 'পরিবার ও মায়ের সঙ্গে ৯ বছর ৩ মাস পর দেখা হলো। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।'
ভারতের একটি ক্রিকেট ওয়েবসাইটকে কার্তিকেয়া শুনিয়েছেন তার সংগ্রামের পুরো গল্প। যা রীতিমতো শিহরণ জাগায়।
এমন না যে এই ক'বছর তার বাড়ি যাওয়ার পথ ছিল না। যাননি তীব্র সংকল্প আর প্রতিজ্ঞার কারণে, 'বাড়ি যাওয়ার সময় ছিল, সুযোগও ছিল। তবে বাবার সঙ্গে কথা হলেই বলতেন, "কিছু একটা অর্জন করে তবেই এসো।" আমি বলতাম "আচ্ছা", এরপর আর যেতাম না। ঠিক করেছিলাম কিছু অর্জন করতে পারলে তবেই যাব।'
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে শারীরিক দূরত্ব অনেক সময় ঘুচে যায় ভার্চুয়াল যোগাযোগ ব্যবস্থায়। তবে ফোনে কথা বললেও মায়ের সঙ্গে একটা সময় পর ভিডিও কলের আলাপও বাদ দিয়ে দেন, 'ভিডিও কল বাদ দেই কারণ মা দেখলেই কান্না করতেন। তবে রঞ্জি জয়ের পর, আইপিএলে সুযোগ পাওয়ার পর ভিডিও কল করেছি।'
২০১৩ সালে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে ক্রিকেট দীক্ষার সুযোগ খুঁজে বেড়ান তিনি। তবে টাকা না থাকায় সেই সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না। এক বন্ধুর সঙ্গে বিভিন্ন একাডেমিতে গিয়ে টাকার অঙ্ক দেখে ফেরত আসেন।
অবশেষে দ্রোণাচার্য অ্যাওয়ার্ড জয়ী কোচ সঞ্জয় ভরদ্বাজের বিখ্যাত এলবি শাস্ত্রী ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ মেলে তার। ভরদ্বাজকে বলেছিলেন, আর্থিক সামর্থ্য নেই। সব জেনে কোচ তাকে নেটে পরখ করে একাডেমিতে নিয়ে নেন।
দীক্ষার সুযোগ পেলেও থাকা-খাওয়ার চিন্তা রয়েই গিয়েছিল। কনস্টেবল বাবার পক্ষেও তাকে টাকা পাঠানো সম্ভব ছিল না। সেজন্য গাজিয়াবাদের মসুরি নামক গ্রামে একটি টায়ার কোম্পানিতে মেকানিকের কাজ নেন। ওই কোম্পানি ছিল ক্রিকেট একাডেমি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে! কোম্পানির পাশে থাকার জায়গা নিয়ে প্রতিদিন ট্রেনে ৮০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে নিতেন ক্রিকেটের পাঠ। কার্তিকেয়া জানান ১০ টাকা বাঁচানোর জন্যও তাকে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হতো।
কার্তিকেয়ার অনটনের এই দুরবস্থা জেনে চমকে যান ভরদ্বাজ, স্পর্শ করে যায় তাকে। একাডেমিতেই রাধুঁনির সঙ্গে তার থাকার ব্যবস্থা করে দেন। বাকি খরচও ভরদ্বাজই বহন করার ভার নেন। যা আবেগতাড়িত করে ফেলে কার্তিকেয়াকে, 'তিনি জানান আমার জুতা-কাপড় ক্রিকেতে যা কিছু লাগে সব দেবেন। আমি কাঁদতে শুরু করি। দিল্লিতে এতটা কে কার জন্য করে?।'
একাডেমিতে প্রথম যেদিন তাকে দুপুরের খাবার দেওয়া হলো সেদিন অঝোরে কাঁদছিলেন তিনি। দুপুরের আহার যে করেছিলেন এক বছর পর!
ভরদ্বাজই কার্তিকেয়াকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। স্কুলের হয়েই খেলতে থাকেন বিভিন্ন টুর্নামেন্ট।
গৌতম গম্ভির, অমিত মিশ্র, যোগিন্দর শর্মাদের গুরু ভরদ্বাজ এমন আরও অনেক ক্রিকেটারকেই গড়ে তুলেছেন। তবে কার্তিকেয়ার প্রতিজ্ঞা, সংগ্রাম আর নিবেদনের গল্প যেন ছাড়িয়ে গেছে সব কিছুকে।
সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে আসতে নিজের চেষ্টায় অনেক দক্ষতা অর্জন করে নিয়েছেন তিনি। এমনিতে প্রথাগত বাঁহাতি স্পিনার ছিলেন। পরে শুরু করেন রিস্ট স্পিন। যোগ করেন ক্যারম বল, ফ্লিপার, গুগলি। সবই এখন তার নিয়ন্ত্রণে।
ইউটিউবে নামিদামি স্পিনারদের বোলিং দেখে শিখে নিয়েছেন একেকটি অস্ত্র, সেসব আয়ত্ত করতে অবশ্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাটতে হয়েছে।
বৈচিত্র্যের জন্যই আইপিএলের দল মুম্বাই তাকে দলে নিয়েছিল। গত আসরে শেষ দিকে সুযোগ পেয়ে প্রথম ম্যাচে ৪ ওভারে দেন কেবল ১৯ রান। পান সঞ্জু স্যামসনের উইকেট। পরে আরও তিন ম্যাচে ৪ উইকেট পেয়েছেন তিনি। পরের আসরে নিশ্চিতভাবেই নজরে থাকবেন এই স্পিনার।
এবার রঞ্জিতে মধ্যপ্রদেশের শিরোপা জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান তার। ফাইনালে মুম্বাইকে হারাতে দ্বিতীয় ইনিংসে নেন ৪ উইকেট। ৬ ম্যাচে ৩২ উইকেট নিয়ে আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট তার।
বিপুল তাড়না থাকায় অনেক কষ্টে, অনেক ত্যাগে আজ এই পর্যায়ে এসেছেন তিনি। বাড়ি ফিরে এবার তার আনন্দে ভাসার পালা।