আমরা কি পারমাণবিক বিপর্যয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম?
চলমান আলোচনার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ আরও কয়েকজনকে হত্যা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন, দেশটি ভেঙে পড়বে। জানা গেছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন, ইরানের ওই নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দিলে দেশটি ভেঙে পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রবান্ধব ও ইসরায়েলের অনুগত একটি সরকার সেখানে ক্ষমতায় আসবে।
কিন্তু ইরান তাদের আক্রমণকারীদের বিস্মিত করেছে এবং তাদের প্রতিরোধব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সম্মান অর্জন করেছে। হ্যাঁ, তারা কয়েকটি উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশে হামলা চালিয়েছে। তবে তা সীমাবদ্ধ ছিল সেসব দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা এবং কিছু জ্বালানি অবকাঠামোতে, যখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের ভূখণ্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে হামলা চালানোর অনুমতি দিচ্ছিল। ইরানের জনগণ প্রশংসার দাবিদার। কারণ তারা প্রমাণ করেছে, কোনো দেশ বা জোট সামরিকভাবে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের কর্মকাণ্ডের নৈতিক ও ন্যায়সঙ্গত ভিত্তি না থাকলে আক্রান্ত দেশ প্রতিরোধ করতে পারে, টিকে থাকতে পারে এবং পাল্টা আঘাতও হানতে পারে। এটি সবার জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা।
সম্প্রতি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে যেটি থামানো হয়েছে, সেখানে যুদ্ধের চেয়ে বেশি ছিল উন্মাদনা। এমন এক উন্মাদনা, যা বিশ্বকে পারমাণবিক বিপর্যয়ের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকেও নিয়ে যেতে পারত। এই সংঘাতের সঙ্গে যেসব দেশের কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের জনগণকেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বাংলাদেশে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মারাত্মক বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছি। বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাবে, ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যাবে যাদের অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল, ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যাবে এবং ২০২৮ অর্থবছরের মধ্যে সরকারি ঋণ জিডিপির ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এই সবই হয়েছে সেই উন্মাদনার কারণে।
বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ‘মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে, বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।’ তারা আরও জানায়, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি হ্রাস এবং প্রবাসী আয়ের পতন চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতিকে আরও বৃদ্ধি করতে পারে।
বাংলাদেশ এবং একই ধরনের অর্থনৈতিক অবস্থানে থাকা অন্যান্য দেশগুলো কি এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল? এমনকি উন্নত দেশগুলোও কি পারমাণবিক সংঘাতের এতটা কাছাকাছি চলে যাওয়ার কথা ছিল?
এই যুদ্ধে আমরা এমন পরাশক্তি দেখছি, যারা অন্ধভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির দ্বারা অযৌক্তিকভাবে প্রভাবিত। প্রথমজন তথ্য, যুক্তি, অভিজ্ঞতা বা বাস্তবতার পরিবর্তে প্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করেন। আর দ্বিতীয়জন অন্য দেশ দখল করে নিজের দেশ সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখেন, যদিও এতে তার দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সব পক্ষের মাঝে পাকিস্তান আপাতত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে এবং ইসলামাবাদে আলোচনার আয়োজন হচ্ছে। ঘোষণা অনুযায়ী, শুক্র বা শনিবার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। আমরা আশা করি, আলোচনা সফল হবে এবং এই অঞ্চলসহ পুরো বিশ্বে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে। তবে অবশ্যই ইসরায়েল এটি ব্যাহত করার চেষ্টা করবে, যার প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজকের যুক্তরাষ্ট্র এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়, যা আইনের ভিত্তিতে নয়, বরং উন্মুক্ত শক্তি প্রদর্শন ও আধিপত্য বিস্তারের ওপর নির্ভরশীল। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রকাশ্য ঘোষণা এবং কিউবা ‘পরিচালনার’ হুমকি—এসব দেখে মনে হয়, ট্রাম্প গোটা বিশ্বকে হাতের ‘খেলনা’ ভাবেন, যেটা যেমন খুশি চালাতে পারেন।
৭ এপ্রিল ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলা চালানোর নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আজ রাতে পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’। কোনো সভ্যতার সব মানুষকে হত্যা না করে কীভাবে এটিকে ধ্বংস করা যায়? তাহলে কি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের প্রতিটি পুরুষ, নারী ও শিশুকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলেন? এটি কেবল পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করেই সম্ভব। এর আগে যখন তিনি ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেন, তখন তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, দেশটিতে এমন তীব্র বোমাবর্ষণ করা হবে যাতে আধুনিক জীবনের প্রতিটি অবকাঠামো—বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, সড়ক, পানির সরবরাহ, খাদ্যের উৎস এবং সাধারণ জীবিকার উপকরণ—সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এসবই ইরানের জনগণের প্রতি গভীর ঘৃণার ইঙ্গিত বহন করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের একটি যুক্তি রয়েছে যা কিছুটা বিবেচনার দাবি রাখে। সেটি হলো—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। কিন্তু গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে পদত্যাগকালে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তা জো কেন্ট প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি’ নয়। এরপরেও ইরানের ওপর হামলা চালানো দেশটির ক্ষেত্রে এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার যৌক্তিকতা তৈরি করে। উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র একটি কথাও বলে না। অথচ তাদের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া কেবল পারমাণবিক বোমা থাকার কারণে উত্তর কোরিয়ার ভয়ে সর্বদা আতঙ্কে থাকে।
এখানে আমাদের মনে রাখা উচিত, ২০১৫ সালে ভিয়েনায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তি সই হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী এটি নিশ্চিত করা হয়েছিল যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে না। মূলত এটি ছিল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ থেকে বিরত রাখা। ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখতে (যা অস্ত্রমান ৯০ শতাংশের অনেক নিচে), তাদের মজুদ প্রায় ৯৮ শতাংশ কমাতে, পারমাণবিক অবকাঠামো সংকুচিত করতে এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর তদারকি মেনে নিতে সম্মত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তিকে ইতিহাসের ‘অন্যতম শক্তিশালী পরিদর্শন ব্যবস্থার’ একটি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। এর বিনিময়ে ইরান নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং অর্থনৈতিক একীকরণের সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল।
জেসিপিওএ চুক্তিকে পারমাণবিক বিস্তার রোধে আধুনিক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবুও, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সব স্থায়ী সদস্যের—যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি এবং ন্যাটোর সদস্য, যারা নিজেরাও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন চায় না—বছরের পর বছর সম্মিলিত প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান। তখন তিনি যুক্তি দেন, ওই চুক্তির শর্তগুলো যথেষ্ট কঠোর নয় এবং ইরান হয়তো ১০ বা ১৫ বছরের মধ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারবে এবং এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
এসব যুক্তি মূলত ইসরায়েলের ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নয়। কারণ ইসরায়েল সবসময়ই যেকোনো শান্তিপূর্ণ চুক্তির বিরোধিতা করেছে এবং ইরানের সঙ্গে দ্বন্দ্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছে যাতে একদিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ইচ্ছামতো পদক্ষেপ নেয়। চুক্তিটি সই হয়েছিল বারাক ওবামার আমলে এবং এই বিষয়টিও ট্রাম্পকে তা থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছিল। ফলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইরানও ধীরে ধীরে চুক্তির শর্ত মানার জায়গা থেকে সরে আসে। পরিস্থিতি পুরোপুরি ইসরায়েলের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়।
ট্রাম্প প্রশাসন চাইলে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ইরানের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করার ওপর জোর দিতে পারত। কিন্তু ইসরায়েল তা চায়নি। ফলে শান্তিপূর্ণ সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়ে যায়।
এরপর থেকে ইসরায়েলের প্রভাবাধীন হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতি আরও দ্রুত ঘটে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হয়। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ প্রয়োগ করে, যার লক্ষ্য ছিল তাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যা উভয় পক্ষকে সরাসরি সংঘাতের কাছাকাছি নিয়ে আসে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ২০২৫ সালের ২২ জুন ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনে যোগ দেয়। তখন বলা হয়েছিল, তারা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘ধ্বংস’ করে দিয়েছে। সেই সময় বিভিন্ন বিধি-নিষেধের মাধ্যমে দেওয়া মার্কিন চাপ এবং ছায়া কার্যক্রম সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়।
পেছন ফিরে দেখলে বলা যায়, এর পেছনের প্রকৃত কারণ ছিল—ইসরায়েল কখনোই চায়নি কোনো শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া সফল হোক। এভাবে তারা সবসময় যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপের দিকে প্ররোচিত করতে পেরেছে।
৭ এপ্রিল প্রকাশিত ‘হাউ ট্রাম্প টুক দ্য ইউএস টু ওয়ার উইথ ইরান’ শীর্ষক একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদনে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস দেখিয়েছে, কীভাবে ১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানের ওপর হামলা চালাতে রাজি করান। সেখানে তিনি এমন একটি পরিস্থিতি তুলে ধরেন, যেটিকে বৈঠকে উপস্থিত সিআইএ পরিচালক ‘প্রহসনমূলক’ ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘অর্থহীন’ বলে উল্লেখ করেন। ট্রাম্পের দলের অনেক সদস্যই যদিও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সেই বর্ণনায় সন্তুষ্ট হননি, তবুও তারা ইরানের ওপর হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি বা প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যুক্তি ছিল যে শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হবে, যা একটি গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেবে এবং এর মাধ্যমে দেশটির শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটবে এবং ইরানের শেষ শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি ফিরে এসে ধর্মতান্ত্রিক পরবর্তী ইরানের নেতৃত্ব দেবেন। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী মিলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করবে। এভাবে নেতানিয়াহু ও তার দল এমন একটি পরিস্থিতি তুলে ধরেন, যা প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে এতে সম্মতি দেননি। তবে উপস্থিত অন্যদের তুলনায় তিনি অনেক বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও কমান্ড কাঠামোকে লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা চালানো হয়, নিহত হন আলি খামেনিসহ আরও কয়েকজন। এই হামলার বিষয়টি ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ হিসেবে পরিকল্পিত ছিল। এটি ছিল পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সূচনা।
এই হামলা যখন চালানো হয়, তখন পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা চলছিল এবং তা অগ্রগতির পথে ছিল বলে জানা যাচ্ছিল। সেই কারণে হামলাটি বিশ্বের কাছে বিস্ময়কর ও ব্যাখ্যাতীত হয়ে ওঠে। প্রথম ১২ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ৯০০টি বিমান হামলা চালায়। যখন বিশ্বের মনোযোগ ছিল ইরানে হামলার দিকে, ইসরায়েল তখন সেই সুযোগে লেবাননে হামলা চালায় এবং তখন থেকেই টানা বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে ইসরায়েল ঘোষণা করে, বর্তমান যুদ্ধবিরতি ওই ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনায় নেতানিয়াহুকে ঠিক কতটা প্রভাব বিস্তার করতে দেবেন এবং কতদিন তিনি ইসরায়েলকে তাদের নিজস্ব উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘গুটি’ হিসেবে ব্যবহার করতে দেবেন, তা বর্তমান আলোচনার সফলতা বা ব্যর্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আজকের বাস্তবতা হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তখন বিশ্বের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তিনি এই পরিবর্তন কতটা গ্রহণ করতে পারবেন এবং ইসরায়েল তাকে কতটা তা করতে দেবে, সেটিই নিকট ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
আমরা একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমাদেরকে ভবিষ্যতে যেকোনো মূল্যে এটি প্রতিহত করতে হবে।
মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার