নাজমুলের মন্তব্যে পরিচালকদের অসন্তোষ, টালমাটাল বিসিবি
সাম্প্রতিক এক গণমাধ্যম সাক্ষাৎকারে দেওয়া মন্তব্যকে কেন্দ্র করে অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান এম নাজমুল ইসলামের সঙ্গে একাধিক পরিচালক মুখোমুখি হওয়ায় বর্তমানে এক ধরনের অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বৃহস্পতিবার অদম্য বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি কাপ ম্যাচ চলাকালে মাঠের পরিবেশ শান্ত থাকলেও বোর্ডরুমে উত্তেজনা ছিল চরমে।
এর আগেও সিনিয়র ক্রিকেটারদের, বিশেষ করে তামিম ইকবালকে নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছেন নাজমুল। সেই মন্তব্য একসময় খেলোয়াড়দের সব ধরনের ক্রিকেট বয়কটের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করেছিল এবং এর ফলে এক দিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)। এবার 'এখন টিভি'কে দেওয়া সর্বশেষ সাক্ষাৎকারেও তিনি নতুন করে অসন্তোষের জন্ম দেন, এবার ইস্যুটি ছিল আম্পায়ারদের ম্যাচ ফি বৃদ্ধির সমালোচনা।
“দুই বছর আগে একজন আম্পায়ারের ম্যাচ ফি ছিল ৭০০ ডলার, আর এখন দুই বছর পর সেটা হয়েছে ২,০০০ ডলার,” বলেন নাজমুল। তিনি আরও যোগ করেন, যারা বিষয়গুলো পরিচালনা করেন তারা ‘ভালো করেই জানেন’, এবং অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তার কাছে এ ধরনের অগ্রগতি ‘অস্বাভাবিক’ মনে হয়েছে।
“আমি যদি কাউকে ইনক্রিমেন্ট দিই, তার একটা সীমা থাকা উচিত। যদি বাড়াতেই হয়, তাহলে আমার চারপাশের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সেটা করতে হবে,” বলেন নাজমুল।
নাজমুল আরও প্রশ্ন তোলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়দের জন্য সরবরাহ করা ক্রিকেট সরঞ্জামের খরচ নিয়েও। তিনি বলেন, বোর্ডের মাধ্যমে অর্থ ছাড় করা হলেও তিনি নিশ্চিত নন সেই টাকা সরাসরি খেলোয়াড়দের হাতে পৌঁছেছে কি না, বা কীভাবে তা খরচ হয়েছে।
এই মন্তব্যগুলো বিসিবি পরিচালকদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ইফতেখার রহমান মিঠু নিশ্চিত করেন যে নাজমুলকে তার মন্তব্য নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেছেন, আম্পায়ারদের ম্যাচ ফি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি অনূর্ধ্ব-১৯ খেলোয়াড়দের জন্য বোর্ড থেকে দেওয়া ক্রিকেট গিয়ার নিয়েও কথা বলেছেন।
“আগে সবাই ৫০ হাজার টাকা বা ৫০০ ডলার করে পেত। এবার আমি কাঠামোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছি। এলিট প্যানেলের জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২,৫০০ ডলার, আইসিসি আন্তর্জাতিক আম্পায়ারদের জন্য ১,০০০ ডলার, আর আইসিসি নন-ইন্টারন্যাশনাল আম্পায়ারদের জন্য ৭০০ ডলার। এই লোক (নাজমুল) বলেছেন, এই টাকা আদৌ আম্পায়ারদের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়েই সন্দেহ আছে। আমি এ বছর এলিট প্যানেল আম্পায়ারদের ম্যাচ ফি ২,৫০০ ডলারে উন্নীত করেছি, কিন্তু আপনি যদি অন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ যেমন পিএসএল দেখেন, সেখানে এলিট প্যানেল আম্পায়াররা ৪,০০০ ডলার পান। আমি প্রশ্ন করেছি, বোর্ডের আলোচনার মধ্যেই তিনি কীভাবে এসব কথা বলতে পারেন,” দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন মিঠু।
তিনি আরও বলেন, “তিনি সাক্ষাৎকারে ক্রিকেট গিয়ার নিয়েও কথা বলেছেন, গেম ডেভেলপমেন্টের গিয়ার কেনাকাটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, একজন উদীয়মান খেলোয়াড় কি ৩৫,০০০ টাকার ক্রিকেট জুতা পাওয়ার যোগ্য? তিনি ৬০,০০০ টাকার ব্যাটের দিকে আঙুল তুলেছেন, কিন্তু এই লোকটা বোঝেন না যে অনূর্ধ্ব-১৯ খেলোয়াড়দের কাছে এত টাকা থাকে না, এই কারণেই বোর্ড এসব দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, আপনি যদি নাহিদ রানার মতো কাউকে সস্তা ক্রিকেট জুতা দেন, তাহলে তার পিঠের সমস্যা তৈরি হবে এবং সেই ব্যথাই তার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেবে।”
খবরে বলা হয়েছে, অন্তত ১০ জন পরিচালক নাজমুলের মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন করেন। সূত্র জানায়, সেখানে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়, এমনকি কয়েকজন পরিচালক পদত্যাগের হুমকিও দেন এবং অর্থ কমিটিতে নাজমুলের পুনর্নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
“পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল, চিৎকার-চেঁচামেচি চলছিল,” বলেন এক পরিচালক। বোর্ডের ভেতরে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে নাজমুলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা তার আচরণকে প্রভাবিত করছে।
“এত কিছু বলার পরও কীভাবে তাকে আবার অর্থ কমিটিতে নিয়োগ দেওয়া হয়? খেলোয়াড়দের বয়কটের ঘটনাটাও বোর্ডই সামাল দিয়েছিল, এরপর আবার তাকে কীভাবে ফিরিয়ে আনা হয়?” এক বিসিবি পরিচালক বলেন, এমন সিদ্ধান্তগুলো কোথা থেকে আসছে তা নিয়েই প্রশ্ন তুলে।
খবর অনুযায়ী, বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম একাধিকবার নাজমুলকে অনুরোধ করেছিলেন, যেন তিনি এ ধরনের মন্তব্য না করেন। “আমি মনে করি বিষয়টা (নাজমুলের মন্তব্যের প্রসঙ্গ) এতটা সহজ নয়। ভেতর থেকে অন্য কেউ কেউ তাকে পরিচালনা করছে,” বলেন একটি সূত্র।
কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় অসন্তুষ্ট বিসিবি পরিচালকরা এখন কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। “গতকাল যেমন ছিল, বিষয়টা সেভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে,” বলেন ওই পরিচালক, ইঙ্গিত দিয়ে যে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি আরও চলতে পারে।