নেতৃত্বের কোনো ‘শর্টকাট’ রাস্তা নেই

একুশ তাপাদার
একুশ তাপাদার

বাংলাদেশ ক্রিকেট আর বিসিবির নতুন অ্যাডহক কমিটি নিয়ে যা হচ্ছে, তা দেখে পুরনো সেই খচখচানিটা আবার ফিরে এল'রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন কি তবে কেবলই মুখরোচক কথা?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন। ভেবেছিলেন ভোজবাজির মতো সব বদলে যাবে, ক্রীড়াঙ্গন রাজনৈতিক ছায়া থেকে সরে নিখাদ খেলার দিকে ঝুঁকবে। সেই আশাবাদীরা হয়তো এখন নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।

সেই পুরনো গোলকধাঁধাতেই সব আটকে আছে। ক্ষমতার সেই চেনা কাড়াকাড়ি, ওপর মহলের ইশারা আর প্রশাসনিক হযবরলগল্পটা যেন একই, শুধু পাত্র-পাত্রী বদলেছে। বরং আগের চেয়েও রাখঢাক না করেই চলছে সব।

গত বছরের বিসিবি নির্বাচনে গোলমাল ছিল, প্রকাশ্যে অনিয়ম ছিলসেটা সবারই জানা। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের পর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) মঙ্গলবার আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দেয়। তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার সঙ্গেই এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে দ্রুত। প্রশাসনে গতিশীলতা সবসময়ই কাম্য, তবে যে ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা একটি সাধারণ নিয়ম, সেখানে এমন তৎপরতা স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন তৈরি করেএটি সত্যিই কি সংস্কারের প্রচেষ্টা, নাকি কেবল ক্ষমতার হাতবদল?

মাঠের মহানায়করা মাঠের বাইরের সংগঠন চালাতে এসে খাবি খাচ্ছেন, ক্ষমতার লোভে হারিয়ে ফেলছেন নিজেদের গর্বের অতীত। আমরা হয়তো একটু বেশিই আবেগপ্রবণ, তাই ভেবেছিলাম সাবেক ক্রিকেটাররা এলেই আলাদিনের চেরাগের মতো সব বদলে যাবে। কিন্তু মাঠের মুন্সিয়ানা আর সংগঠন চালানো যে আকাশ-পাতাল তফাত, সেটা আমরা বারবার ভুলে যাই।

২০১৩ সালে নাজমুল হাসান পাপন যখন ক্রিকেটারদের জন্য কাউন্সিলর কোটা বাড়ালেন, মনে হয়েছিল বিপ্লব ঘটে গেছে। কিন্তু সুযোগ বাড়লেও ক্রিকেট প্রশাসন পেশাদার হলো না। বরং অনেক সাবেক খেলোয়াড় ক্ষমতার মোহে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই অংশ হয়ে গেলেন।

ফারুক আহমেদের কথাই ধরুন। প্রধান নির্বাচক থাকার সময় তার যে নীতিনৈতিকতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল, বিসিবি সভাপতি হয়ে তিনি সেই একই রাজনৈতিক স্রোতে গা ভাসালেন। যে সততার ঝাণ্ডা নিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন, শেষটা হলো একরাশ আপস, চরম বিতর্ক আর অবশেষে অপসারণ দিয়ে। তার সেই ভাবমূর্তি আর নেই।

বুলবুলের গল্পটাও আলাদা কিছু নয় বরং আরও বেশি নাজুক। নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলে ‘কুইক টি-টোয়েন্টি ইনিংস খেলতে এসেছিলেন তিনি। নিজের কথা রাতারাতি বদলে শুরু করলেন টেস্ট। টি-টোয়েন্টির মানসিকতায় টেস্ট খেলতে নামলে যা হয়এলোপাথাড়ি শটে হাস্যরসের জন্ম দিয়ে ফিরেছেন ব্যর্থতার থলে ভরে।

বিসিবির বাইরে থাকার সময় নীতিবাক্য আওড়ানো সাবেক এই অধিনায়ক ক্ষমতা নিয়ে জড়িয়ে যান বিসিবির ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত এক ভোট উৎসবে। বিসিবির স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চেতনা তার সময়েই সবচেয়ে ভূলুণ্ঠিত হয়। দেশের প্রথম বিশ্বকাপের অধিনায়ক ছিলেন তিনি, অথচ তিনি দায়িত্বে থাকার সময় বাংলাদেশ একটা বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হারায়।

তার বিদায়ের সঙ্গে বিদ্যুৎবেগে তামিমের সিংহাসনে বসাসবই যেন ক্ষমতার সুতোয় গাঁথা। এখানে নেতৃত্ব ঠিক হয় রাজনীতির হাওয়া কোন দিকে বইছে তার ওপর। তামিম যখন দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলন করতে এলেন, বিসিবি প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের ভিড়, স্লোগান। চিরায়ত দৃশ্যটা মোটেও স্বস্তির ছিল না।

যখন কোনো পদে বসার জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বদলে ওপরের মহলের ‘দোয়া’ লাগে, তখন সেই পদের মর্যাদা কতখানি থাকে তা বড় প্রশ্ন। 

ক্রিকেটারদের বোঝা উচিত, মাঠের গৌরব যেন এই চেয়ারের লোভে ধুলোয় না মেশে। পুরনো জঞ্জাল দিয়ে নতুন ঘর বানানো যায় না। সত্যিকারের সংস্কার চাইলে স্বচ্ছতা, আদর্শ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আর জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই। 

তামিম এখন এক কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে। চাইলে তিনি ইতিহাস বদলে দিতে পারেন, আবার চাইলে পূর্বসূরিদের মতোই রাজনীতির ঘেরাটোপে হারিয়ে যেতে পারেন। সবটাই নির্ভর করছে তার মেরুদণ্ডের ওপর। শেষ পর্যন্ত দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত ক্রিকেটের স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যাবে, নাকি আমরা সত্যিই ভোরের আলো দেখব? উত্তরটা সময়ের কাছেই তোলা থাক।