বাংলাদেশের কোচের ‘মহানাটকীয়’ আত্মপ্রকাশ!

আতিক আনাম

জাতীয় দলের পরবর্তী প্রধান কোচ খোঁজার জন্য একটা স্বচ্ছ, নিখুঁত আর যুগান্তকারী প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। তবে দিনশেষে দেশের ফুটবলপ্রেমীরা যা দেখলেন; বরং মনে হলো কোনো রিয়ালিটি শোর জমকালো গ্র্যান্ড ফিনালে!

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা গুঞ্জন, চটকদার সব বিদেশি নাম আর সুকৌশলে বাজারে ছেড়ে দেওয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গত শুক্রবার রাতে থমাস ডুলিকে নতুন প্রধান কোচ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিল বাফুফে। তবে কোনো প্রথাগত সংবাদ সম্মেলনে নয়।

এর জন্য ফেডারেশন বেছে নিল এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানকে!

প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন আয়োজিত ‘কুল-বিএসপিএ স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ডস’-এর মঞ্চে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালকে ডেকে নেন উপস্থাপক। এরপর দর্শকদের দিকে ছুড়ে দেন এক প্রশ্ন—বাংলাদেশের কোচ হওয়ার মতো এই কঠিন ও অকৃতজ্ঞ দায়িত্ব নিতে কেউ রাজি আছেন কি না? মিলনায়তন থেকে কোনো সাড়া না আসায়, সভাপতি বেশ নাটকীয়ভাবে ডুলির নাম ঘোষণা করেন। আর ঠিক তখনই, কোনো রিয়ালিটি শোর ফাইনালের চমক জাগানো প্রতিযোগীর মতো ব্যাকস্টেজ থেকে হেঁটে মঞ্চে হাজির হন আমেরিকার সাবেক এই অধিনায়ক।

ডুলি হাসলেন, সবার সঙ্গে হাত মেলালেন, কুশল বিনিময় করলেন এবং বাংলাদেশের ২৩ বছরের ট্রফির খরা কাটানোর বার্তা দিলেন।

তবে আসল পরিহাস হলো, ডুলি যখন তার এই 'জমকালো প্রবেশ' ঘটাচ্ছেন, ততক্ষণে অধিকাংশ সাংবাদিকই জেনে গিয়েছেন যে তিনিই হচ্ছেন বাংলাদেশের নতুন চাণক্য। ফেডারেশন আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাম প্রকাশ করার অনেক আগেই, আগের রাতেই তার ঢাকায় পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি হোটেলের ভেতরেও বাফুফে কর্মকর্তারা তার উপস্থিতিকে এমনভাবে আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন, যা দেখে মনে হতে পারে কোনো অতিগোপন কূটনৈতিক অভিযান চলছে!

আপাতত মনে হচ্ছে, বাফুফে কর্তারা বিশ্বাস করেছিলেন যে কেবল এই নাটকীয়তা দিয়েই দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে জমে থাকা সব সংশয় উড়িয়ে দেওয়া যাবে।

অথচ সংশয়ের পাল্লাটা কিন্তু বেশ ভারীই ছিল।

কয়েক সপ্তাহ ধরে বাফুফে কর্মকর্তারা ক্রিস কোলম্যান কিংবা বার্নড স্টর্কের মতো হাইপ্রোফাইল সব নাম বাতাসে ভাসিয়ে প্রত্যাশার পারদ উসকে দিয়েছিলেন—যারা ইউরোপীয় ফুটবলে পরীক্ষিত এবং যাদের পারিশ্রমিকের অঙ্কটাও আকাশচুম্বী। ফেডারেশন আসলে বোঝাতে চেয়েছিল, তারা এবার অনেক বড় স্বপ্ন দেখছে।

হয়তো সামর্থ্যের চেয়েও একটু বেশিই!

পেছনের গল্পটা অবশ্য এতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাফুফের এক সদস্য স্বীকার করেছেন, কোলম্যান বা স্টর্কের মতো কোচদের ডাগআউটে আনা কখনোই বাস্তবসম্মত ছিল না। আর্থিক ও কাঠামোগত দিক থেকে তাদের যে চাহিদা ছিল, তা মেটানো ফেডারেশনের সাধ্যের বাইরে ছিল।

তাই ঘুরেফিরে ফেডারেশনকে সেই ডুলির কাছেই থিতু হতে হলো—জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এই আমেরিকান কোচ সম্প্রতি এক 'নতুন চ্যালেঞ্জ'-এর খোঁজে গায়ানা জাতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়েছেন। বাফুফের জন্য সুবিধার বিষয় হলো, ডুলির আর্থিক চাহিদা যেমন কম, তেমনি আলোচনায় বসার ক্ষেত্রেও তিনি অনেক সহজলভ্য। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি স্থানীয় কোচিং স্টাফদের সঙ্গে কাজ করতেও রাজি।

এই শেষ বিষয়টি অবশ্য সমর্থকদের মধ্যে দ্বিমত তৈরি করেছে। অনেকেই আশা করেছিলেন, নতুন বিদেশি কোচ হয়তো নিজের মতো করে পুরো ব্যাকরুম সেটআপ নিয়ে আসবেন, যিনি বাংলাদেশ ফুটবলের চেনা ইকোসিস্টেমের বাইরে গিয়ে কাজ করবেন।

তার পরও, একটা জায়গায় ডুলিকে খাটো করার সুযোগ নেই—তার প্রোফাইল কিন্তু বেশ ভারী। বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, খেলেছেন ফুটবলের দুটি মহোৎসবে এবং মার্কিন ডাগআউটে কাজ করেছেন ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের মতো কিংবদন্তির অধীনে। বাংলাদেশের অতীত কোচদের তুলনায় ডুলির অন্তর্ভুক্তিকে অন্তত মনে হচ্ছে, ফেডারেশন কোনো পরীক্ষামূলক প্রোটোটাইপের পেছনে না ছুটে বাজারে চেনা কোনো ‘ব্র্যান্ড’ বেছে নিয়েছে।

তবুও একটা মৌলিক প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়: বাংলাদেশ ফুটবলের বর্তমান যে কাঠামো, তাতে কি আসলেই কোনো কোচের পক্ষে জাদুকরি কিছু করা সম্ভব?

২৭০টিরও বেশি জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়া, নাটুকে আত্মপ্রকাশ আর দলবদল মৌসুমের মতো এক মাসের দলীয় গুঞ্জন—সব মিলিয়ে বাফুফের এই দীর্ঘ কোচ শিকারের গল্পটা শেষ হলো এমন এক কোচের হাত ধরে, যার আগমনকে কোনো মহাপরিকল্পনার ফসল মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে, কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক প্রকার আপস করতেই হলো ফেডারেশনকে।

জাতীয় দলকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ সামলাতে পারবেন কি না—জানতে চাওয়া হলে ডুলি অবশ্য দারুণ পেশাদারিত্ব দেখালেন। বেশ শান্ত গলায় বললেন, ‘জার্মানিতেও বিষয়টা ঠিক একই রকম। আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে।’