শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কতটা প্রভাব ফেলছে

দুলি মল্লিক
দুলি মল্লিক

কারওয়ান বাজার। রাত তখন সাড়ে ৮টা। পেট্রোবাংলা ভবনের সামনে থেকে বাসায় যাওয়ার জন্য রিকশা ঠিক করছিলেন এক দম্পতি। পাশে দাঁড়িয়ে স্মার্টফোনে গেম খেলতে থাকা তাদের ৯-১০ বছরের মেয়েটি স্ক্রিনে এতটাই ডুবে ছিল যে আশপাশের কিছুই খেয়াল করছিল না।

পথচারীদের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সে মূল সড়কে চলে যায়। হঠাৎ একটি মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে ছুটে আসছিল ওই দিকেই। চারপাশে শুরু হয় চিৎকার। শেষ মুহূর্তে এক পথচারী দৌড়ে মেয়েটিকে সরিয়ে নেন। মেয়েটির হাত থেকে ছিটকে পড়ে মোবাইল ফোন।

এই পরিস্থিতিতেও শিশুটির প্রথম চিন্তা ছিল অন্য কিছু। দৌড়ে মোবাইল ফোনটি তুলে স্ক্রিন অন করে স্বস্তির হাসি দিলো—গেমটা তখনো চলছে।

শিশুটির বাবা-মা দৌড়ে এসে ফোন কেড়ে নিয়ে বকাঝকা শুরু করেন। কিন্তু, শিশুটি ফোন ফেরত চেয়ে বলছিল, ‘মা, আর একটা লেভেল বাকি।’ মা রাজি না হওয়ায় মেয়েটি কান্নাজুড়ে দেয় এবং জেদ ধরে বসে যে রিকশায় উঠবে না, বাসায়ও যাবে না।

প্রশ্ন হলো, ৯-১০ বছর বয়সী এই শিশুটির জেদ ও কান্না থামাতে তার হাতে আবারও স্মার্টফোনটি তুলে দেওয়া কি ঠিক হবে?

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার এ বিষয়ে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় ভুল হলো শিশুর কান্নায় আবেগাপ্লুত হয়ে তার দাবি মেনে নেওয়া।’

তিনি বলেন, ‘যদি শিশুটির স্ক্রিনে আসক্তি অতটা তীব্র না হয়, তাহলে বাবা-মাকে শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ বা জেদ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করতে হবে। শিশু যদি দেখে কান্নাকাটি বা চেঁচামেচি করে মোবাইল পাচ্ছে, তাহলে এই কাজ বারবার করবে। এক্ষেত্রে কোনো যুক্তি বা বকাঝকায় না গিয়ে বাবা-মায়ের উচিত মোবাইল ফোন না দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর থাকা। এই সময়ে শিশুটির প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ বা কেয়ার সাময়িকভাবে কমিয়ে দিয়ে তাকে বোঝাতে হবে, ফোন ব্যবহারে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা যাবে না।’

‘কিন্তু যদি শিশুটির স্ক্রিনে আসক্তি বেশি হয়, তাহলে প্রয়োজন বুঝে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।’

৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন টাইম কমাতে বাবা-মাকেই প্রথম উদ্যোগ নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন ডা. মেখলা সরকার।

তিনি বলেন, ‘বাবা-মা যদি দৃঢ়ভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করেন, তাহলে শিশু ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে যে রাগ করে লাভ হবে না।’

সম্প্রতি ঢাকায় ছয়টি স্কুলে ৪২০ শিশুকে নিয়ে পরিচালিত আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় দেখা যায়, ৮৩ শতাংশ শিশুই দৈনিক দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে। আর এসব শিশুর মধ্যে ৬৩ শতাংশের মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয়। প্রতি সাত শিশুর পাঁচটি উদ্বেগ এবং প্রতি তিন শিশুর দুটি একাকিত্বে ভোগে।

গবেষণায় চিহ্নিত শিশুদের পাঁচটি প্রধান মানসিক সমস্যা হলো, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা বা মন খারাপের প্রবণতা, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মনোযোগের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত রাগ বা বিরক্তি।

এ ছাড়া, গবেষণায় অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে আচরণগত ও আবেগজনিত সমস্যারও স্পষ্ট উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

প্রধান পাঁচটি আচরণগত সমস্যা হলো—অতিরিক্ত রাগ ও বিরক্তি, নির্দেশ অমান্য করার প্রবণতা, আগ্রাসী আচরণ, সামাজিক মেলামেশায় অনীহা এবং স্ক্রিন নির্ভরতা বা আসক্তির লক্ষণ।

গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রতিটি আচরণগত সমস্যায় বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারীদের হার বেশি। বিশেষ করে স্ক্রিন নির্ভরতা ও রাগের প্রবণতা সর্বাধিক।

অভ্যাস থেকে আসক্তি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার একপর্যায়ে আসক্তিতে রূপ নিতে পারে। তবে প্রথম থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আসক্তি ঠেকানো সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে ডা. মেখলা সরকার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শিশুর স্ক্রিনে আসক্তির শুরুটা কিন্তু বাবা-মায়েরাই করেন। বিশেষ করে ছোটবেলায় শিশুকে শান্ত রাখতে বা খাওয়ানোর সময় হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে।’

কখন বোঝা যাবে যে শিশু স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়ছে? জানতে চাইলে মেখলা সরকার বলেন, ‘আসক্তি বিষয়টি হঠাৎ করে হয় না, এটি বেশ ধীরগতিতে হয়। যখন দেখা যাবে স্ক্রিন টাইমের কারণে খেলাধুলা, পড়াশোনা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে শিশুদের সময় কাটানোর মতো স্বাভাবিক কাজ কমে যাচ্ছে, তখনই বুঝতে হবে ধীরে ধীরে সে আসক্ত হয়ে পড়ছে।’

তার মতে, স্ক্রিন আসক্তির ফলে মূলত তিনটি ক্ষেত্রে শিশুর পরিবর্তন স্পষ্ট হয়। সেগুলো হলো—পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া ও পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়া, সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং নিজের শরীরের প্রতি অযত্ন বা অবহেলা দেখানো।

মেখলা সরকার বলেন, ‘আসক্তির ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে সময় কাটানোও বাড়তে থাকে। আজ এক ঘণ্টা, কাল তিন ঘণ্টা—এভাবে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে বাবা-মা বাধা দিলে শিশু খুব তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় বা আগ্রাসী আচরণ করে। অনেক সময় ভাঙচুরও করতে পারে।’

একই সূত্রে গাঁথা একাধিক সমস্যা

আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় এটা স্পষ্ট, মানসিক সমস্যাগুলো আলাদা নয়, বরং একটি আরেকটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

গবেষকদের মতে, যেসব শিশুর ঘুমের সমস্যা আছে, তাদের মধ্যে রাগ ও মনোযোগের ঘাটতি বেশি। যেসব শিশু স্ক্রিনে আসক্ত, তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও একাকিত্ব বেশি।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের স্ক্রিন আসক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে? তা নিয়ে মেখলা সরকার বলেন, ‘একটি শিশু যখন বেড়ে ওঠে, তখন পরিবেশ ও মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে তার সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। কিন্তু শিশু যখন কেবল স্ক্রিনে থাকে, তখন বাইরের জগত তার কাছে এলিয়েন বা অচেনা মনে হতে থাকে। ফলে তার জীবন পরিচালনার দক্ষতা তৈরি হয় না।’

তার মতে, বিশেষ করে যারা আগে থেকেই একটু অন্তর্মুখী বা উদ্বিগ্ন স্বভাবের, তাদের ক্ষেত্রে এই আসক্তির ঝুঁকি বেশি থাকে। তারা বাস্তব জগতের চাপ নিতে না পেরে ভার্চুয়াল জগতে স্বস্তি খোঁজে।

তিনি আরও বলেন, ‘এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। শৈশবের এই আসক্তি কৈশোরে ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভবিষ্যতে আবারও ডিজিটাল আসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে শিশুটি।’

বড় হয়ে এসব শিশুরা সামাজিকভাবে দক্ষ হতে পারে না, ফলে একাকিত্ব থেকে অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বলে উল্লেখ করেন ডা. মেখলা সরকার।

করণীয়

ডা. মেখলা সরকারের মতে, শিশুর জেদ বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। শিশুর কান্নায় আবেগপ্রবণ হয়ে মোবাইল ফোন ফেরত দিলে তার আসক্তি আরও বাড়বে।

প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে বলেন তিনি।

অন্তত ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে মোবাইল বা এ ধরনের ডিভাইস দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা বা চোখে চোখে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।

ডিজিটাল ডিভাইসের বিকল্প হিসেবে তিনি খেলাধুলা, বই পড়া ও সামাজিক মেলামেশায় শিশুদের উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

শিশুদের জীবনে প্রযুক্তির উপস্থিতি দিনকে দিন বাড়ছে। পড়াশোনা থেকে বিনোদন—সবকিছুই এখন স্ক্রিননির্ভর। গবেষণায় দেখা গেছে, বাস্তবে অনেক শিশু দিনে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা হচ্ছে, শিশুদের দৈনিক ১ থেকে ২ ঘণ্টার বেশি বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম ক্ষতিকর।

স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নীরব সংকট তৈরি করছে। একে এখনই গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, সুস্থ শৈশব মানে সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন, যা আগামীতে একটি দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম তৈরি করবে।