ট্রফি কেড়ে নেওয়া নাকি লিগ থেকে অবনমন: কত বড় শাস্তির মুখে সিটি?

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রিমিয়ার লিগের সঙ্গে ম্যানচেস্টার সিটির আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত রায় এখনো বাকি। তবে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের দায়ে ইংলিশ জায়ান্টদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে—এমন খবরে তোলপাড় ফুটবল বিশ্ব। সবার মনে এখন একই প্রশ্ন: সিটির ভাগ্যে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে?

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রিমিয়ার লিগে ছড়ি ঘোড়ানো দলটির ওপর বড় কোনো শাস্তির খাঁড়া নেমে এলে তা পুরো ইংলিশ ফুটবলেই বড় ধরনের ঝাঁকুনি দেবে।

ইতোমধ্যেই কোটি কোটি পাউন্ড ক্ষতিপূরণ চেয়ে সিটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিপক্ষ ক্লাবগুলো। পাশাপাশি আলোচনা উঠছে, গত ১৫ বছরে জেতা একাধিক শিরোপা সিটি থেকে কেড়ে নেওয়া হবে কি না।

শুক্রবার ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'দ্য অ্যাথলেটিক' প্রথম তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, সিটির বিরুদ্ধে আনা ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১টি ছাড়া বাকি ১১৪টিতেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে তাদের।

তবে ক্লাবের বিরুদ্ধে ঠিক কী শাস্তি কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

দোষী সাব্যস্ত করার পর শাস্তি যাই হোক না কেন, সিটি যে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবে, তা একপ্রকার নিশ্চিত।

শনিবার সমর্থকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সিটির চেয়ারম্যান খালদুন আল মুবারক নিজের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘শুরুতে আমরা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণে যতটা আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম, এখনো ঠিক ততটাই আছি।’

২০১৮ সালে জার্মান সংবাদমাধ্যম 'ডের স্পিগেল'-এ সিটির ভেতরের গোপন নথি ফাঁসের পর এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল। সেই জটিল আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি নিষ্পত্তি হতে এখনো লম্বা সময় লেগে যেতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক কোচ রবের্তো মানচিনি বলেন, ‘এটা এমন কোনো বিষয় নয় যা নিয়ে আমি চিন্তিত। গত চার-পাঁচ বছর ধরে মাঝে মাঝেই তো এই খবর সামনে আসছে, নতুন কিছু নয়। ম্যানচেস্টার সিটি কোনো অন্যায় করেনি আর খেলোয়াড়দের দ্বৈত চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। সমস্যা তৈরি হলেও সেটা ওদের নিজস্ব ব্যাপার।’

প্রিমিয়ার লিগের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, অপরাধ প্রমাণিত হলে দলটির পয়েন্ট কেটে নেওয়া, বড় অঙ্কের জরিমানা করা কিংবা লিগ থেকে সরাসরি বহিষ্কার বা অবনমনও হতে পারে।

২০২৩-২৪ মৌসুমে আর্থিক স্থায়িত্বের মাত্র একটি নিয়ম ভঙ্গের দায়েই এভারটন ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। সেই বিচারে শতাধিক নিয়মনীতি লঙ্ঘনের দায় মাথায় নিয়ে সিটির শীর্ষ লিগ থেকে ছিটকে পড়া অনেকটাই অনিবার্য মনে হচ্ছে।

তবে আপিল চলাকালেই এই শাস্তি কার্যকর হবে, নাকি আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা করা হবে—তা নিয়ে বড় ধরনের তর্ক দেখা দিয়েছে।

যদি আপিলের সিদ্ধান্ত আসার আগেই শাস্তি দেওয়া হয়, তবে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাওয়ার আগেই সিটিকে নেমে যেতে হবে নিচের লিগে।

অন্যদিকে, বর্তমানে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থানে থাকা সিটিকে শাস্তি দিতে যদি আপিল শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়, তবে অন্য ক্লাবগুলোর লিগে টিকে থাকা কিংবা ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নেওয়ার সমীকরণ ও আর্থিক হিসাব ওলটপালট হয়ে যাবে।

এমনকি প্রিমিয়ার লিগের আপিল প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গড়ায় কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। কারণ লিগের এই বিচার প্রক্রিয়া বা সালিস পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলে ইংল্যান্ডের হাইকোর্টে যেতে পারেন সিটির আবুধাবিভিত্তিক মালিকপক্ষ।

লাভবান হচ্ছে কে?

সিটির এমন করুণ পরিণতির খবরে বেশ উৎফুল্ল প্রতিপক্ষ দলগুলো।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ডিফেন্ডার রিও ফার্দিনান্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ করে লেখেন, 'ট্রফি ক্যাবিনেটে আরও একটা প্রিমিয়ার লিগ মেডেল যোগ হওয়ার সময় এসেছে।' উল্লেখ্য, ২০১১-১২ মৌসুমে সিটির কাছে শিরোপা হারিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিল ইউনাইটেড।

তবে ট্রফি কেড়ে নিয়ে অন্যকে তা বুঝিয়ে দেওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়।

সিটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের ভেতরের ঘটনা। এই সময়ে তারা মোট চারটি লিগ ট্রফি জিতেছিল, আর সেই চার মৌসুমে দুবার ইউনাইটেড এবং দুবার লিভারপুল রানার্সআপ হয়।

পরবর্তী সময়ে সিটি আরও চারটি লিগ শিরোপা জেতে, যার মূল ভিত্তি কিন্তু তৈরি হয়েছিল সেই আর্থিক অনিয়মের সময়েই।

এর পাশাপাশি ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চারটি লিগ কাপ ও একটি এফএ কাপ জেতে ম্যানচেস্টার সিটি।

স্টোক সিটির সাবেক কোচ টনি পুলিস বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের হতাশা চেপে না রেখে বলেন, ‘অন্য কারো হাতে ট্রফিগুলো তুলে দেওয়া হবে বলে আমি সত্যিই বিশ্বাস করি না। পয়েন্ট কেটে নেওয়া আর চড়া জরিমানা করার সম্ভাবনাটাই বেশি। তবে আমাদের কাছে মনে হয়, আমরা প্রতারিত হয়েছি।’

অবশ্য শিরোপা না পেলেও ক্ষতিগ্রস্ত ক্লাবগুলোর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

গত জুনেই আর্থিক নিয়ম না মানার কারণে এভারটনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বার্নলিকে ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৪৬ মিলিয়ন ডলার) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য। সেবার এভারটনের কারণে প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমন ঘটেছিল বার্নলির।

কী হবে সিটির তারকা ফুটবলারদের?

এক মাসেরও কম সময় আগে ৪৬০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে এনজো ফের্নান্দেস, এলিয়ট অ্যান্ডারসন ও আইয়ুব বুয়াদ্দির মতো ফুটবলারদের সই করিয়ে দলবদলের সব রেকর্ড গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ম্যানচেস্টার সিটি।

কিন্তু সম্ভাব্য কঠিন শাস্তির এই আবহ ফুটবল তারকাদের ধরে রাখা বা নতুনদের টানার ক্ষেত্রে সিটির শক্তিতে কতটা চিড় ধরাবে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

দলের অন্যতম বড় তারকা এরলিং হালান্ড ২০২৫ সালে ক্লাবটির সঙ্গে দীর্ঘ ৯ বছরের চুক্তি শেষ করেছেন, যার মেয়াদ থাকবে তার ৩৪ বছর বয়স পর্যন্ত।

তবে বড় কোনো শাস্তির মুখে পড়লে বর্তমান ফুটবলারদের কার চুক্তিতে কী ধরনের 'রিলিজ ক্লজ' বা দল ছাড়ার নিয়ম রাখা রয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এদিকে কোপেনহেগেনে ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবগুলোর এক আন্তর্জাতিক বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সিটির প্রধান নির্বাহী ফেরান সোরিয়ানো প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রেখেছেন। সেখানে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ক্লাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও শাস্তির প্রক্রিয়া এখনো অনেক দীর্ঘ এবং তারা শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।