পয়েন্ট কর্তন থেকে নির্বাসন, কেমন হতে পারে সিটির শাস্তি

স্পোর্টস ডেস্ক

নয় বছরের আর্থিক অনিয়মে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর এবার ম্যানচেস্টার সিটির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, শাস্তি কী?

প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষে থাকা ক্লাবটির বিরুদ্ধে রায় বহাল থাকলে পয়েন্ট কর্তন, বড় অঙ্কের জরিমানা থেকে শুরু করে প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কারের মতো শাস্তিও হতে পারে। এমনকি গত দেড় দশকে জেতা একাধিক লিগ শিরোপা ও ট্রফির ভবিষ্যৎ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। তবে শাস্তি কার্যকরের আগে আপিলের সুযোগ থাকায় দীর্ঘ এই আইনি লড়াইয়ের শেষ এখনো হয়নি।

মঙ্গলবার প্রিমিয়ার লিগ জানিয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নয় বছরের সময়ে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে আনা ১১৫টি অভিযোগের প্রায় সবকটিতেই ক্লাবটি দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। এখনই অবশ্য কোনো শাস্তি কার্যকর হচ্ছে না। রায় দেওয়া সেই স্বাধীন কমিশনই পরবর্তী ধাপে প্রমাণিত অপরাধগুলোর জন্য শাস্তি নির্ধারণ করবে।

প্রিমিয়ার লিগের নিয়ম অনুযায়ী, অপরাধের মাত্রা ও প্রকৃতি বিবেচনায় পয়েন্ট কেটে নেওয়া, বড় অঙ্কের জরিমানা কিংবা সরাসরি লিগ থেকে বহিষ্কারের মতো শাস্তি দেওয়া সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক নিয়ম ভাঙায় এভারটন ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের পয়েন্ট কাটা হয়েছিল। সিটির বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগের ব্যাপকতা বিবেচনায় বড় অঙ্কের পয়েন্ট কর্তন হলে অবনমনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

তবে শাস্তি কবে কার্যকর হবে, সেটি নিয়েও তৈরি হতে পারে নতুন জটিলতা। আপিলের শুনানি শেষ হওয়ার আগেই শাস্তি কার্যকর হলে রায় পরে বদলে গেলেও তার আগেই সিটিকে অবনমনের মুখে পড়তে হতে পারে। আবার আপিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত শাস্তি স্থগিত রাখা হলে বদলে যেতে পারে লিগের অন্য হিসাবও। বর্তমানে শীর্ষে থাকা সিটিকে পরে শাস্তি দেওয়া হলে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ কিংবা প্রিমিয়ার লিগে অবস্থানের হিসাব অন্য ক্লাবগুলোর ক্ষেত্রেও নতুন করে নির্ধারণ করতে হতে পারে।

এই মামলার শুরু ২০১৮ সালে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডের স্পিগেলে ম্যানচেস্টার সিটির কর্মকর্তাদের ফাঁস হওয়া কিছু নথি প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে। এরপর তদন্ত শুরু করে প্রিমিয়ার লিগ। দীর্ঘ তদন্তের পর মঙ্গলবার রায় এলেও পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে এখনো সময় লাগতে পারে।

প্রিমিয়ার লিগের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও সিটির সামনে আইনি লড়াইয়ের আরও পথ খোলা থাকতে পারে। আবুধাবি-সমর্থিত ক্লাবটি যদি মনে করে সালিশি প্রক্রিয়ায় কোনো আইনি সমস্যা হয়েছে, তাহলে ইংল্যান্ডের হাইকোর্টেও বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

শুরু থেকেই অবশ্য কোনো ধরনের অপরাধ স্বীকার করেনি ম্যানচেস্টার সিটি। রায়ের পরও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি ক্লাবটি। সমর্থকদের উদ্দেশে পাঠানো এক চিঠিতে সিটির চেয়ারম্যান খালদুন আল মুবারক লিখেছেন, 'ক্লাবটিকে নির্দোষ প্রমাণ করার ব্যাপারে আমাদের আত্মবিশ্বাস ও সংকল্প শুরুতে যেমন ছিল, এখনো তেমনই শক্তিশালী।'

রায়ের খবর প্রকাশের পর সিটির প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোর মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ডিফেন্ডার রিও ফার্দিনান্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'ক্যাবিনেটে যোগ হতে যাচ্ছে আরেকটি প্রিমিয়ার লিগ পদক।' ২০১১-১২ মৌসুমে সিটির পেছনে থেকে লিগ শেষ করা ইউনাইটেড দলের সদস্য ছিলেন ফার্দিনান্দ।

তবে সিটির জেতা শিরোপা কেড়ে নিয়ে সেগুলো অন্য ক্লাবের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি এতটা সহজ নয়। যে সময়ের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, সেই ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চারবার প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিল সিটি। ওই চার মৌসুমে দুইবার করে রানার্সআপ হয়েছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও লিভারপুল।

প্রশ্নটা অবশ্য শুধু ওই চার শিরোপায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৮ সালের পরও সিটি আরও চারবার প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে। ফলে আগের সাফল্যের ভিত্তি যদি অনিয়মের মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ের অর্জনগুলোর ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠতে পারে। একই সময়ে চারটি লিগ কাপ ও একটি এফএ কাপও জিতেছে তারা।

তবে সাবেক স্টোক সিটি কোচ টনি পুলিস মনে করেন, শিরোপা ও ট্রফি ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কম। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, 'আমি সত্যিই বিশ্বাস করি না যে অন্য কোনো ট্রফি বা শিরোপা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। পয়েন্ট কাটা এবং বড় অঙ্কের জরিমানাই বেশি সম্ভাব্য মনে হচ্ছে। তবে আমার এখনো মনে হয়, আমরা বঞ্চিত হয়েছি।'

সিটির কারণে সুযোগ হারিয়েছে বলে মনে করা ক্লাবগুলোর ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও সামনে আসতে পারে। শিরোপা পুনর্বণ্টনের পরিবর্তে আর্থিক ক্ষতিপূরণই তাদের জন্য সম্ভাব্য প্রতিকার হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই মামলার প্রভাব পড়তে পারে সিটির বর্তমান খেলোয়াড়দের ভবিষ্যতেও। রায়ের আগে থেকেই অনিশ্চয়তা থাকলেও বড় তারকা দলে ভেড়ানো কিংবা গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের ধরে রাখার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বড় কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। এরই মধ্যে এক দলবদলেই প্রায় ৪৬ কোটি পাউন্ড খরচ করে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দলবদল ব্যয়ের রেকর্ড গড়েছে সিটি। এনজো ফার্নান্দেজ, এলিয়ট অ্যান্ডারসন ও আয়ুব বুয়াদ্দিসহ একাধিক খেলোয়াড়কে দলে ভিড়িয়েছে তারা।

দলের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন আর্লিং হলান্ডও ২০২৫ সালে সিটির সঙ্গে নয় বছরের চুক্তি করেছিলেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী ৩৪ বছর বয়স পর্যন্ত ক্লাবটিতে থাকার কথা তার। তবে বড় ধরনের শাস্তি হলে খেলোয়াড়দের চুক্তিতে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ বা বিশেষ শর্ত রাখা হয়েছিল কি না, সেটি এখনো জানা যায়নি।