বিশ্বকাপ ফাইনালে হার নিয়ে মেসি বললেন, ‘অদ্ভুত কিছুই ঘটেনি’
মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে সময় যেন থমকে গেল। ভর্তি গ্যালারিতে কান্নার রোল, সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে থাকা এনজো ফার্নান্দেজও নিজেকে সামলাতে না পেরে অঝোরে কাঁদছিলেন। কিন্তু মঞ্চের ঠিক মাঝখানে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকম শান্ত, অবিচল।
আর্জেন্টিনার বিখ্যাত আকাশি-সাদা জার্সিতে দুই দশকের মহাকাব্যের ইতি টানতে আসা লিওনেল মেসিকে পাওয়া গেল অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসী রূপে। প্রীতি ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর পর কেবল বিদায়ের সুরই বাজাননি, গত বিশ্বকাপের ফাইনালের আড়ালে জমে থাকা সেই মেঘ নিয়েও স্পষ্ট বার্তা দিলেন তিনি।
স্পেনের কাছে হেরে টানা দ্বিতীয় শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার ক্ষতটা এখনো তাজা। ১২০ মিনিটের সেই স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে মেসি ও আর্জেন্টিনা দল ছিল নিজেদের ছায়া হয়ে। ম্যাচ শেষে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মেসিকে বলতে শোনা যায়— ‘সবাই শান্ত হও’।
ব্যস, ড্রেসিংরুমের অন্দরমহলে কোনো ফাটল ধরেছিল কি না, তা নিয়ে চারদিকে ডালপালা মেলেছিল নানা গুঞ্জন আর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। সতীর্থরা এর আগে তা মেটানোর চেষ্টা করলেও, অবশেষে ঘরের মাঠে হাজারও অনুরাগী ও গোটা বিশ্বের সামনে স্বয়ং অধিনায়ক নিজেই দূর করলেন সব ধোঁয়াশা।
আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে বিদায়ী বার্তার এক পর্যায়ে সব রটনা ও গুঞ্জন উড়িয়ে মেসি বলেন, ‘আমি চিরকাল এখানে থেকে যেতে চাই, তবে মনে হচ্ছে এটাই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়। সবশেষ বিশ্বকাপটা আমার ওপর দিয়ে বড্ড বেশি ঝড় বইয়ে দিয়েছে। আমরা আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, খুব কাছেও গিয়েছিলাম।’
‘সত্যি বলতে, বাইরে অনেকে যেমনটা বলছে, তেমন অদ্ভুত কিছুই ঘটেনি। আমরা আমাদের সর্বস্ব উজাড় দিয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে আমাদের সবকিছু একেবারে নিংড়ে নিয়েছিল। বাস্তবতা হলো, কোনোমতে আমরা শেষ পর্যন্ত গিয়েছিলাম।’
ট্রফি জয়ের আনন্দে সবাইকে পাশে পাওয়া যায়। কিন্তু পরাজয়ের অন্ধকার দিনে যারা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, মেসির কাছে তাদের আত্মত্যাগ কোনো অংশেই কম নয়। সতীর্থদের সেই আড়ালের লড়াই স্মরণ করেন তিনি, ‘এই জার্সির জন্য আমরা সব সময় লড়াই করেছি— আমার যেসব সতীর্থের সঙ্গে এটি ভাগাভাগি করে নেওয়ার সুযোগ হয়েছে, তাদের সবাইকে নিয়ে। শুধু শিরোপা জয়ের মুহূর্তের সতীর্থরা নয়, যাদের নিয়ে আমরা শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে পারিনি, তারাও একইভাবে লড়েছে।’
‘আমরা খুব কাছাকাছি গিয়েছিলাম। কিন্তু বিন্দুমাত্র সন্দেহ রাখবেন না, আমার পাশে থাকা প্রতিটি সতীর্থ সব সময় এই জার্সির জন্য নিজেদের শেষবিন্দু পর্যন্ত দিয়ে গেছে।’
যিনি এতগুলো বছর পুরো একটি দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার ভার নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে বেড়ালেন, বিদায়বেলায় তিনি দলকে দিয়ে গেলেন বাইরের আক্রমণ ঠেকিয়ে সংঘবদ্ধ থাকার অমর মন্ত্র। দলীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে আর্জেন্টিনার বিদায়ী অধিনায়ক বলেন, ‘আমরা যখন একতাবদ্ধ থাকি, তখন আমরা সবার চেয়ে শক্তিশালী এবং যেকোনো বাধা পার হতে পারি। এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। সামনে নিশ্চিতভাবেই কঠিন সময় আসছে, কারণ এতদিন ধরে আমরা যা করেছি, তা মোটেও সাধারণ কিছু ছিল না। আর সেই কঠিন দিনগুলোতে এই দলটাকে আগের চেয়েও বেশি সমর্থন দিয়ে যেতে হবে।’
‘আমি তাদের যেমনটা সবসময় বলি, আমাদের শেষ বৈঠকেও যেমনটা বলেছি— বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়তে হয়। কারণ কিছু মানুষ জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে চায়, আমরা তাদের সেই তৃপ্তি পাওয়ার সুযোগ দেব না।’
আকাশি-সাদা পরিবারের সেই অটুট বন্ধনই যে আর্জেন্টিনার সমস্ত সাফল্যের আসল চাবিকাঠি, বুটজোড়া তুলে রাখার মুহূর্তে বিশ্বকে আবার তা-ই মনে করিয়ে দিলেন মেসি। দৃঢ় কণ্ঠে শেষ কথাটি বলেন তিনি, ‘ঝড়ঝাপটার কঠিন দিনগুলোতেই আসলে একটা দলের আসল শক্তিটা ফুটে ওঠে। দল ভেতর থেকে শক্তিশালী না হলে সাফল্য পাওয়া অসম্ভব।’
‘আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমরা এক অসাধারণ দল ছিলাম। আর সে কারণেই আমরা যা কিছু অর্জন করেছি, তা সম্ভব হয়েছে।’

