‘অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি’, উইম্বলডন জেতার আনন্দে ভাসছেন সিনার
আলেকজান্ডার জেভেরেভের সঙ্গে সেন্টার কোর্টের সেই আগুনে লড়াই তখন সবে শেষ হয়েছে। পূর্ণশক্তির এক ফাইনালের স্নায়ুক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ট্রফিটা যখন হাতে উঠল, ইয়ানিক সিনার অকপটে স্বীকার করলেন—প্রতিপক্ষ তাকে একদম খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বাধা টপকে ক্যারিয়ারের পঞ্চম গ্র্যান্ড স্ল্যামটি উঁচিয়ে ধরে ইতালীয় এই তারকা একে আখ্যা দিলেন 'অবিশ্বাস্য' এক অর্জন হিসেবে।
এবারের টুর্নামেন্টে আগের ছয় ম্যাচের পথচলাটা সিনারের জন্য যতটা মসৃণ ছিল, রবিবারের ফাইনালের শুরুটা তেমন ছিল না। সেন্টার কোর্টের জমকালো মঞ্চে প্রথম সেটটিই ছিনিয়ে নেন ফ্রেঞ্চ ওপেনজয়ী জেভেরেভ। চলতি উইম্বলডনে সাত ম্যাচের মধ্যে এটি ছিল সিনারের মাত্র তৃতীয় সেট হার।
তবে শুরুর এই ধাক্কায় এতটুকুও দমে যাননি বিশ্ব টেনিসের এক নম্বর তারকা। জেভেরেভের ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ ভেঙে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। টেনিসপ্রেমীদের রোমাঞ্চের সাগরে ভাসিয়ে শেষ পর্যন্ত ৬-৭ (৭/৯), ৭-৬ (৭/২), ৬-৩, ৬-৪ ব্যবধানের জয়ে শিরোপা নিশ্চিত করেন সিনার। ২০২৫ সালে অল ইংল্যান্ড ক্লাবে প্রথমবার চুমু খেয়েছিলেন ট্রফিতে। এবার টানা দ্বিতীয়বারের মতো উইম্বলডন নিজের করে রাখলেন এই ইতালীয় সেনসেশন।
পুরো ম্যাচজুড়ে চলেছে গতির ঝড় আর বিধ্বংসী সব গ্রাউন্ড-স্ট্রোক। শিরোপার জন্য তাকে এতটা ঘাম ঝরাতে বাধ্য করার কারণে প্রতিপক্ষের প্রশংসায় মেতেছেন সিনার। জেভেরেভকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘প্যারিসে আপনি আপনার একটি বড় স্বপ্ন ছুঁয়েছেন। এখানেও জয়ের খুব কাছে চলে এসেছিলেন। এভাবে খেলতে থাকলে আমি নিশ্চিত, খুব দ্রুতই এই ট্রফিগুলোর একটি আপনার শোকেসে উঠবে।’
লড়াইয়ের আবহ মনে করিয়ে দিয়ে সিনার আরও যোগ করেন, ‘আমরা দুজনেই দুর্দান্ত শুরু করেছিলাম, সার্ভ আসছিল প্রচণ্ড গতিতে। আরও একটি অবিশ্বাস্য ফাইনাল দেখল টেনিসবিশ্ব। আর এমন ম্যাচের জন্য তো প্রতিপক্ষের কাছ থেকেও একই রকম সাড়া পেতে হয়। জয় নিয়ে আমি অবশ্যই রোমাঞ্চ অনুভব করছি, তবে তার চেয়েও বেশি ভালো লাগছে আমাদের খেলার মান দেখে। টেনিস খেলার জন্য এর চেয়ে নান্দনিক জায়গা আর দ্বিতীয়টি নেই।’
আগামী সপ্তাহেই এটিপি র্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসছেন জেভেরেভ। ২৯ বছর বয়সী এই জার্মান তারকার কাছ থেকে যে বড় রকমের তাড়া খেতে যাচ্ছেন, তা বেশ ভালোই বুঝতে পারছেন সিনার। মুখে মৃদু হাসি টেনে তাই বললেন, ‘আমি জানি আপনার অন্যতম লক্ষ্য বিশ্বের এক নম্বর হওয়া। আপনি একদম কাছাকাছি চলে এসেছেন। এখন থেকে আমাকে বেশ সাবধানেই থাকতে হবে।’
ফাইনালে মাঠে নামার আগের মনস্তাত্ত্বিক চাপের কথাও লুকাননি সিনার। রোববার সকাল থেকেই স্নায়ুচাপে ভুগছিলেন তিনি। তবে কোর্টে নামতেই চিরচেনা নির্মম রূপে ফিরে উবে গেছে সব দুশ্চিন্তা, 'রোববারের সকালটা আসলেই অন্যরকম, এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করে বুকের ভেতর। এই আঙিনাটা বড্ড স্পেশাল। আপনি কখনো জানবেন না এখানে আর কতবার ফিরে আসার সুযোগ পাবেন। তাই প্রতিটি মুহূর্তকেই আমি ভীষণ মূল্যবান মনে করি।'
অন্য দিকে প্রায় নিখুঁত টেনিস খেলা সিনারের কাছে হারলেও কোনো আক্ষেপ নেই জেভেরেভের। পুরো ম্যাচে সিনারকে মাত্র একটি ব্রেক পয়েন্টের মুখোমুখি করতে পেরেছিলেন তিনি। ট্রফি হাতছাড়া হলেও হারের বেদনা ভুলে রসবোধের পরিচয় দিলেন জেভেরেভ, 'ইয়ানিক, সত্যি বলতে আপনাকে আর একদম পছন্দ করতে পারছি না! আপনার কাছে টানা ১০ বার হারলাম।'
পরক্ষণেই সিনারের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে বললেন, 'তিনি আবারও প্রমাণ করলেন কেন তিনি এই মুহূর্তে দুনিয়ার সেরা খেলোয়াড়। এই উইকএন্ডে ফাইনালে আপনার সঙ্গে সেন্টার কোর্ট ভাগ করে নেওয়াটা এক দারুণ অভিজ্ঞতা। দুর্ভাগ্যবশত ভাগ্য আমার সহায় ছিল না, তবে সবার আগে আপনাকে অনেক অভিনন্দন।'
অল ইংল্যান্ড ক্লাব থেকে শূন্য হাতে ফিরলেও জেভেরেভের এই ফাইনালের সফর মোটেও ব্যর্থ নয়। কয়েক সপ্তাহ আগেই প্যারিসে ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতে নিজের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যামের দীর্ঘ খরা কাটিয়েছিলেন। আর এবার উইম্বলডনের ফাইনালে ওঠা নিশ্চিত করল—সব কটি বড় মঞ্চেই এখন তিনি শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার।
নিজের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে জার্মান এই দ্বিতীয় বাছাই বলেন, 'ফাইনালটা হারলেও আমি বলব গত দুটি মাস আমাদের অসাধারণ কেটেছে। উইম্বলডনে আসার আগে এখানে কখনো কোয়ার্টার ফাইনালও খেলিনি, আর এবার সরাসরি ফাইনাল মঞ্চে। ২৯ বছর বয়সে এসে এখন আমার মনে সত্যিই এই বিশ্বাস জন্মেছে যে, ভবিষ্যতে এই ট্রফিটা আমিও উঁচিয়ে ধরতে পারব।'