৪৯ দিন বাকি

বারুদের গন্ধ থেকে ঘাসের ঘ্রাণ: এক রক্তাক্ত মানচিত্রের ফুটবল-বিপ্লব

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

নব্বইয়ের দশকের শুরু। বলকান অঞ্চলের আকাশ নীল নয়, ক্রমাগত বিমান হামলার আগুনে সৃষ্ট কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। সাইরেনের শব্দে মাঠের খেলা থেমে যায়, ফুটবলারদের পায়ে ওঠে সেনাসদস্যের ভারী বুট। ক্রোয়েশিয়া তখন যেন মানচিত্রের সুনির্দিষ্ট কোনো রেখা নয়, এক রক্তাক্ত সংগ্রামের নাম।

১৯৯১ থেকে ১৯৯৫— টানা প্রায় পাঁচটি বছর ক্রোয়াটরা যমদূতের সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছে। একটি জাতি হিসেবে স্বাধীনভাবে টিকে থাকার প্রাণান্ত লড়াই শেষ হওয়ার ঠিক তিন বছর পর ফ্রান্সের সবুজ গালিচায় যা রচিত হয়েছিল, সেটা স্রেফ কোনো খেলা ছিল না। দাভর সুকার-জভনিমির বোবান-রবার্ত প্রসিনেচকি-স্লাভেন বিলিচ-ইগর স্তিমাচ-দ্রাজেন লাদিচদের নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ পরিণত হয়েছিল এক অদম্য জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার ইশতেহারে।

যুগোস্লাভিয়া নামক সমাজতান্ত্রিক ফেডারেশন থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াটি ক্রোয়েশিয়ার জন্য সুখকর ছিল না। ১৯৯১ সালে জাগরেব স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে শুরু হয় এক অসম লড়াই। একপাশে সার্ব নিয়ন্ত্রিত শক্তিশালী যুগোস্লাভ পিপলস আর্মি (জেএনএ), অন্যপাশে সদ্য স্বাধীনতাকামী ক্রোয়াট বাহিনী।

যুদ্ধের বিভীষিকায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, ঘরছাড়া হয় আরও প্রায় ৩ লাখ মানুষ। আজকের ফুটবল তারকা লুকা মদ্রিচ তখন শিশু। শরণার্থী শিবিরের পার্কিং লটে ড্রিবলিং শিখছেন, আর কান পেতে শুনছেন কামানের গর্জন। সেই বারুদের গন্ধ মাখা মাটি থেকে উঠে আসা একদল ফুটবলার ১৯৯৮ সালে বিশ্বকে শোনান নতুন নাম— ক্রোয়েশিয়া।

এই বিপ্লবীরা কেবল মাঠের খেলোয়াড় ছিলেন না, অনেকে ছিলেন সরাসরি রণক্ষেত্রের যোদ্ধা। ফরোয়ার্ড পেতার ক্রপান মাত্র ১৭ বছর বয়সেই ফ্রন্টলাইনে লড়েছিলেন। এই সংগ্রামের নেপথ্যে ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা আর দমনের ইতিহাস।

১৯৯০ সালের ১৩ মে জাগরেবের মাক্সিমির স্টেডিয়ামে দিনামো জাগরেব বনাম রেড স্টার বেলগ্রেডের ম্যাচে ক্রোয়াট ও সার্ব সমর্থকদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়। সেসময় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে লাথি মেরে জাগরেবের এক সমর্থককে রক্ষা করেছিলেন বোবান। ওই একটি লাথি ক্রোয়াটদের মনে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। বোবান ফুটবলার থেকে রাতারাতি পরিণত হন জাতীয় বীরে। ফুটবলের মাধ্যমে জাতীয়তাবোধ জাগানোর দর্শন পাহাড়ের মতো অটল ছিল তার হৃদয়ে। বোবান ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরবর্তীতে বলেছিলেন, 'যদি খেলাধুলার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয় তৈরির কথা বলতে হয়, তবে ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বের এক নম্বর হওয়া উচিত।'

১৯৯৮-এর রূপকথা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর প্রথম সলতে পাকানো হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে। ফুটবল বিশ্ব প্রথমবারের মতো লাল-সাদা চেকারবোর্ড জার্সির অদম্য শক্তিকে দেখেছিল। ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ডেনমার্ককে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ক্রোয়েশিয়া জানিয়ে দেয়— বলকান অঞ্চলে নতুন সূর্যের উদয় হয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে বিতর্কিত হারে বিদায় নিলেও সেটাই ছিল তাদের ভবিষ্যতের প্রতিশোধের প্রধান জ্বালানি।

কোচ মিরোস্লাভ ব্লাজেভিচের স্কোয়াড ছিল দুর্দান্ত। গোলপোস্টের নিচে লাদিচ, রক্ষণে বিলিচ ও স্তিমাচ ছিলেন দুর্ভেদ্য প্রাচীর। মাঝমাঠে প্রসিনেচকির ড্রিবলিং আর বোবানের সৃষ্টিশীলতা প্রতিপক্ষকে দিশেহারা করত। প্রসিনেচকি ছিলেন জাদুকরী এক প্রতিভা, যিনি এর আগে যুগোস্লাভিয়ার হয়েও বিশ্বকাপে গোল করেছিলেন। নবজাতক ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে গোল করাটা তার কাছে ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

আক্রমণভাগের প্রধান সেনাপতি সুকারের বাঁ পা ছিল শিল্পীর তুলির নিখুঁত আচরণের মতো। বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ বাদে (আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে) প্রতিটিতে গোল করার অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা দেখান তিনি। জ্যামাইকা, জাপান, রোমানিয়া, জার্মানি কিংবা নেদারল্যান্ডস— কেউই ছাড় পায়নি। সর্বোচ্চ ৬ গোল করে 'গোল্ডেন বুট' জয়ী সুকারের প্রতিটি লক্ষ্যভেদ ছিল যেন বাস্তুচ্যুত ক্রোয়াটদের জন্য সান্ত্বনা। তার ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, ক্রোয়েশিয়া মাত্র কয়েক বছর আগে চিতার আগুনে পুড়েছে। সুকার যখন বল নিয়ে বক্সে ঢুকতেন, তখন পুরো দেশ গোলের প্রার্থনায় থাকত।

মাঠের ভেতরে আসল বিপ্লব ঘটে ৪ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক রাতে। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী জার্মানি। তখন ফুটবল বিশ্বে ৪-৪-২ ফরমেশনের জয়জয়কার। ব্লাজেভিচ হাঁটলেন ভিন্ন পথে। তিনি খেলালেন ৩-৫-২ ফরমেশন।

রবার্ত ইয়ার্নি আর মারিও স্তানিচ উইং-ব্যাক হিসেবে জার্মান রক্ষণকে তছনছ করে দেন। আধুনিক ফুটবলে ৩-৫-২ এর যে জয়গান, ব্লাজেভিচ সেটার ভিত্তি গেঁথেছিলেন ওই রাতেই। ম্যাচের আগের ক্রোয়েশিয়ার ড্রেসিংরুমের আবহ ছিল নাটকীয়। তিনি শিষ্যদের জন্য সাজানো ট্যাকটিকসের সব কাগজ ছিঁড়ে ফেলে গর্জে ওঠেন। ব্লাজেভিচের ভাষ্যমতে, 'আমি তখন বলেছিলাম— কৌশল চুলোয় যাক। তোমাদের আজ মাঠে গিয়ে ক্রোয়েশিয়ার পতাকার জন্য এবং যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, তাদের জন্য লড়তে হবে।'

ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্য। সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করে বিশ্বমঞ্চে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের সগর্ব পদচারণা নিশ্চিত হয়। সেমিফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে ২-১ গোলে হারলেও ক্রোয়াটরা ভেঙে পড়েনি। লিলিয়ান থুরামের অলৌকিক জোড়া গোল না থাকলে হয়তো ফাইনালটা তারাই খেলত। তবে ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে অভিষেকে নেদারল্যান্ডসকে ২-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করা ছিল বিশ্ব জয়েরই সমান।

ক্রোয়েশিয়ার এই অর্জন স্রেফ স্কোরলাইনের চেয়ে অনেক বড় ছিল। বছরের পর বছর শরণার্থী শিবিরে থাকা মানুষের জন্য এই সাফল্য ছিল বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ভুকোভারের ধ্বংসস্তূপ থেকে যারা প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়েছিল, ওই মানুষগুলোই জাগরেব বা রিয়েকার রাস্তায় নেমে উৎসবে মেতেছিল। ফুটবল সেখানে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল, হয়ে উঠেছিল মুক্তির গান।

সোনালী প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বিলিচ তাদের অদম্য মানসিকতার ব্যাখ্যা অনেক পরে দিয়েছিলেন এক মর্মস্পর্শী উক্তিতে। স্মৃতির পাতায় ফিরে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'আমরা শুধু নিজেদের বা ক্রোয়েশিয়ার জন্য খেলছিলাম না। আমরা খেলছিলাম ওই সব মানুষের জন্য, যারা যুদ্ধের আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন।'

লুকা মদ্রিচ-ইভান রাকিতিচ-মারিও মানজুকিচদের আধুনিক ক্রোয়েশিয়ার সাফল্যের ডিএনএ তৈরি হয়েছিল যুদ্ধের সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৯৮ সালের আসরে পাওয়া সফলতাকে কেন্দ্র করেই। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা বা ২০২২ সালে আবারও সেমিফাইনালে খেলা— সবই ছিল ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। বারুদের গন্ধ ফিকে হয়ে গেলেও ঘাসের ঘ্রাণে মিশে থাকা ফুটবল বিপ্লবের গল্প তাই প্রতিটি ক্রোয়াট ফুটবলারকে প্রেরণা দেয়। সেই সোনালী প্রজন্ম প্রমাণ করেছিল যে, মানচিত্র ছোট হতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বপ্ন যদি হিমালয় সমান হয়, তবে বিশ্ব জয় করা অসম্ভব কিছু নয়।