অনন্ত দূরত্বে মেসি
একটি ট্রফি তার হাতে ছিল। সোনালি, ভারী, ঝকঝকে। কিন্তু তার চোখ দুটো সেই ট্রফির দিকে ছিল না, ছিল সেই জিনিসটার দিকে, যেটা কিছুক্ষণ পরই জার্মানির হাতে তুলে দেওয়া হবে। বিশ্বকাপ। তার খুব কাছেই। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়, তারপরও স্পর্শ করা যায় না।
মারাকানার মঞ্চে সেই রাতে লিওনেল মেসির মুখে যে অভিব্যক্তি ছিল, তাকে শুধু 'হতাশা' বলা যায় না। এটা আরও গভীর কিছু, যেন একটা মানুষ তার নিজের ভাগ্যের কাছে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন, এবং ভাগ্য তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।
১৩ জুলাই, ২০১৪। রিও ডি জানেইরোর এস্তাদিও মারাকানায় মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও জার্মানি। এক্সট্রা টাইমের ১১৩তম মিনিটে মারিও গোটজের একটি চমৎকার ভলি সব শেষ করে দেয় মেসির আর্জেন্টিনার।
কিন্তু এই গল্প শুধু হার-জিতের নয়। এই গল্প একটি চাহনির, মঞ্চে পুরস্কার নিতে উঠে আসা মেসির সেই দুটো চোখের, যেখানে জয়ের আলো নেই, পরাজয়ের কান্নাও নেই। শুধু একটা বিশাল, নিঃশব্দ শূন্যতা।
২০১৪ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে মেসির কাঁধে ছিল অদ্ভুত এক চাপ। তিনি তখন বার্সেলোনার হয়ে প্রায় সবকিছু জয় করেছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন, লা লিগা জিতেছেন, ব্যালন ডি'অর জিতেছেন। অসংখ্য রেকর্ড ভেঙেছেন। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় বলা হচ্ছে তাকে। কিন্তু একটি প্রশ্ন যেন সব অর্জনের ওপরে ছায়া ফেলে রেখেছিল।
মেসি কি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারবেন?
প্রশ্নটি অন্য কোনো ফুটবলারের জন্য হয়তো এত বড় ছিল না। কিন্তু মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার সন্তান। সেই দেশের মানুষ এখনও দিয়েগো ম্যারাডোনাকে প্রায় পৌরাণিক এক চরিত্রের মতো দেখত। ১৯৮৬ সালে যিনি প্রায় একাই বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। তিনি জাতির বুকে চিরস্থায়ী নায়ক হয়ে গিয়েছিলেন।
মেসির জন্য তুলনাটা ছিল অবধারিত।
যত বড়ই হোন না কেন, যত গোলই করুন না কেন, যত শিরোপাই জিতুন না কেন, বিশ্বকাপ ছাড়া তার গল্পকে অনেকে অসম্পূর্ণ মনে করতো।
সেই অসম্পূর্ণতা দূর করার মিশন নিয়েই মেসি এসেছিলেন ব্রাজিলে।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দেখা গেল ভিন্ন এক মেসিকে। তার চোখে ছিল দৃঢ়তা। তার চলাফেরায় ছিল নেতৃত্বের ছাপ। বসনিয়া, ইরান, নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে তিনি দলকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। বিশেষ করে ইরানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের সেই বাঁকানো শট যেন পুরো আর্জেন্টিনাকে নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল।
ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনা এগোতে লাগল।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন লড়াই, বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্নায়ুর পরীক্ষা, তারপর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেমিফাইনাল। সেই ম্যাচে প্রতিটি পাস, প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওজন ছিল অসীম।
পেনাল্টি শুটআউটে জয় আসার পর পুরো আর্জেন্টিনা যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। চব্বিশ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে। আর সেই ফাইনালে অধিনায়ক হিসেবে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মেসি।
এরপর আসে সেই রাত।
যে রাতে একটি মুহূর্তই যথেষ্ট ইতিহাস লেখার জন্য। আর সেই সুযোগ এসেছিল আর্জেন্টিনার কাছেও। হিগুয়াইন জার্মান রক্ষণ ভেঙে একা এগিয়ে গিয়েছিলেন। গোল হয়নি। পালাসিও সুযোগ পেয়েছিলেন। গোল হয়নি। মেসি নিজেও সুযোগ পেয়েছিলেন।
একটি পাস ধরে তিনি এগিয়ে গেলেন। জার্মান ডিফেন্ডাররা পিছনে। সামনে গোলপোস্ট। পুরো পৃথিবী যেন থেমে আছে। শট নিলেন। বলটি পোস্টের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
মাত্র কয়েক ইঞ্চি। কিন্তু সেই কয়েক ইঞ্চিই বিশ্বকাপ আর না-পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল।
অবশেষে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজে আঘাত করলেন। একটি নিয়ন্ত্রণ। একটি ভলি। একটি গোল। আর সেই গোলের সঙ্গে ভেঙে পড়ল আর্জেন্টিনার স্বপ্ন।
শেষ বাঁশি বাজার পর জার্মান খেলোয়াড়রা আনন্দে ছুটে বেড়াচ্ছিল। তারা জানত, তারা ইতিহাস লিখেছে।
কিন্তু অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এমন একজন, যার ইতিহাস লেখা এখনও শেষ হয়নি। মেসি তখন প্রায় নিথর। মনে হচ্ছিল তিনি যেন মাঠে আছেন, অথচ নেই।
তারপর আসে পুরস্কার বিতরণী। একে একে খেলোয়াড়রা মঞ্চে উঠছেন। বিশ্বকাপ ট্রফিটি সেখানে রাখা। ঝলমলে, সোনালি, অপার্থিব। সেই ট্রফির পাশ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিলেন মেসি। ফিফা তাঁকে গোল্ডেন বল দিচ্ছে। পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। অথচ সেই সম্মান গ্রহণের সময়ও তার চোখ যেন অন্য কিছু খুঁজছিল।
আর তখনই ক্যামেরা বন্দি করে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত মুহূর্ত।
হাতে গোল্ডেন বল। চোখ বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে। সেকেন্ড কয়েকের জন্য। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ড যেন অনন্তকাল।
তিনি সেই ট্রফির দিকে তাকাচ্ছিলেন না। তাকাচ্ছিলেন বিশ্বকাপের দিকে, যেটা একটু পরই যাবে জার্মান ক্যাপ্টেন ফিলিপ লামের হাতে। সেই চাহনিতে লোভ ছিল না, রাগও ছিল না। ছিল এক ধরনের চেনা বেদনা। একজন মানুষের মুখ, যিনি জানেন এই মুহূর্তটা কতটা কাছে এসেছিল, এবং তারপরও।
আবারও এলো সেই প্রশ্নটা, আর্জেন্টিনার হয়ে কি তিনি কখনো বড় কিছু জিততে পারবেন?
২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনাল, ২০০৮ অলিম্পিকে সোনা ছাড়া বাকি সব, ২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১১ কোপার ফাইনালে হার, ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে এই রাত। প্রতিটি ক্ষত একটু একটু করে জমছিল।
একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে এই ভার বহন করা সম্ভব কিনা জানা নেই। কিন্তু মেসি সাধারণ মানুষ নন। তিনি বহন করেছিলেন। প্রতিটি টুর্নামেন্টে ফিরে গেছেন। আবার চেষ্টা করেছেন।
সেই রাতে মারাকানায় যখন মেসি মঞ্চ থেকে নামলেন, গোল্ডেন বলটা হাতে ঝুলছে, তার সতীর্থরা কেউ কেউ কাঁদছেন, কেউ মাঠেই বসে পড়েছেন, তখন তাকে দেখাচ্ছিল একা। এক অদ্ভুত একাকিত্বে।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সেই একাকিত্বই তাকে থামায়নি। ২০২২ সালে কাতারে সেই ট্রফি তার হাতে উঠেছে। সেই গল্প আরেকদিন হবে।
আজকের গল্পটা শুধু সেই একটি মুহূর্তের, ২০১৪ সালের জুলাইয়ের রাতে, মারাকানার আলোয়, একজন মানুষের চোখে যে অনন্ত দূরত্ব ছিল, এবং তারপরও যিনি ফিরে গিয়েছিলেন।
কারণ কিছু মানুষ থামতে জানে না। তারা জানে শুধু চেষ্টা করতে।