রাতে এমবাপে, সকালে মেসি: আশ্চর্য সুন্দর গোলের লড়াই দুই তারকার
জার্মান কিংবদন্তি গার্ড মুলার ১৯৭৪ বিশ্বকাপে ১৪ তম গোল করে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল করার যে রেকর্ড করেছিলেন, সেটি টিকে ছিল ৩২ বছর। পরবর্তীতে সেই রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন রোনালদো নাজারিও ও মিরোস্লাভ ক্লোসাও। দুজনের রেকর্ডই টিকেছে ১২ বছর। আজ অনবদ্য খেলে ক্লোসার পাশে বসেছেন লিওনেল মেসি, তবে আগের তিনজনের মতো এত লম্বা সময় মেসি এই রেকর্ড ধরে রাখতে পারবেন না, সেই সম্ভাবনা প্রবল। কারণ মেসির রেকর্ডের ওপর তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছেন কিলিয়ান এমবাপে।
দুই প্রজন্মের দুই অসাধারণ এই ফুটবলারের মধ্যে গোলের এক দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে গত বিশ্বকাপ থেকেই। একজন এক গোল করলে অপরজন দুই গোল করে পাল্টা জবাব দিচ্ছেন। এই বিশ্বকাপেও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে সেটি অনেকটা অনুমিতই ছিল। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ মেসি শুরু করেছিলেন ১৩ গোল নিয়ে, এমবাপের দখলে ছিল ১২ গোল। আজ সে সংখ্যা বাড়িয়ে নিয়েছেন দুজনেই।
আজকের ম্যাচেই দেখুন না, সেনেগালের বিপক্ষে যখন দিশা খুঁজে পাচ্ছিল না ফ্রান্সের শক্তিশালী আক্রমণভাগ, ত্রাতা হয়ে এসেছেন সেই এমবাপেই। করেছেন জোড়া গোল, পেরিয়ে গেছিলেন বিশ্বকাপে মেসির ১৩ গোল। অনুজ এমবাপেকে আবার পেছনে ফেলতে মেসি সময় নিয়েছেন মাত্র ঘণ্টা ছয়েক। যেন বার্তা দিতে চাইলেন, ‘বুড়ো’ হলেও এখনো লিওনেল মেসিকে টেক্কা দেয়া এত সহজ কাজ নয়!
এই নিয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন মেসি। তবে গোল করতে পেরেছেন পাঁচটি আসরে। মাঝে ২০১০ বিশ্বকাপ বাদ দিলে ২০০৬ থেকে ২০২৬- সব বিশ্বকাপেই গোলের দেখা পেয়েছেন। জার্মানিতে ২০০৬ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে বদলি হিসেবে করেছিলেন ১টি গোল, সবাইকে জানিয়েছিলেন নিজের আগমনীবার্তা। আশ্চর্যজনকভাবে বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে ২০১০ বিশ্বকাপে গেলেও সেবার ম্যারাডোনার অধীনে করতে পারেননি কোনো গোল।
স্বপ্নভঙ্গের ব্রাজিল বিশ্বকাপে করেছিলেন ৪ গোল, ২০১৮ এর রাশিয়া বিশ্বকাপে আবার মাত্র ১ গোল। তবে সব পাওয়ার টুর্নামেন্ট কাতার বিশ্বকাপে মেসি কাটিয়েছেন স্বর্ণালী সময়। ফাইনালে জোড়া গোল সহ মোট ৭ গোল করেছিলেন সেবার, এখন পর্যন্ত এক আসরে তাঁর সর্বোচ্চ। আর এই বিশ্বকাপ তো শুরুই করলেন ৩ গোল দিয়ে। এরই মধ্যে বিশ্বকাপ জিতে ফেলা নির্ভার মেসি কাতার বিশ্বকাপের গোলসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারেন কি না এবার, দেখার বিষয় সেটিই।
তবে এমবাপে যে গতিতে ছুটছেন, অস্বাভাবিক কিছু না হলে মেসি-ক্লোসার এই রেকর্ড ফ্রেঞ্চ তারকার পায়ে লুটাবে এটি একরকম নিশ্চিতই বলা চলে। এটি মাত্র তৃতীয় বিশ্বকাপ এমবাপের, এর মধ্যেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি গোলদাতার তালিকায় তাঁর অবস্থান যুগ্মভাবে চতুর্থ!
২০১৮ সালে যেবার পুরো বিশ্ব চিনলো কিলিয়ান এমবাপে নামক এক বিস্ময়বালককে, সেবারই চার গোল করে ফেলেছিলেন তিনি। পেলের পর দ্বিতীয় টিনেজার হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করেছিলেন। আর কাতার বিশ্বকাপে তো রীতিমতো গোলবন্যায় ভাসিয়েছেন প্রতিপক্ষদের। মেসির সাথে পাল্লা দিয়ে গোল করেছেন, টুর্নামেন্ট শেষ করেছিলেন সর্বোচ্চ ৮ গোল নিয়ে। এর মধ্যে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে তো ইতিহাসেরই অংশ হয়ে গেছেন। মাত্র দুই বিশ্বকাপে এমবাপের তখন ১২ গোল!
গত আসর যেখানে শেষ করেছিলেন, এবারও যেন সেখান থেকেই শুরু করেছেন এই ফরাসি তারকা। সেনেগালের বিপক্ষে দুই গোলে এমবাপে এখন আছেন ১৪ গোলে। মেসির এটিই শেষ বিশ্বকাপ, অপ্রত্যাশিত কিছু না ঘটলে ২৭ বছর বয়সী এমবাপের সামনে রয়েছে আরও একাধিক বিশ্বকাপ খেলার হাতছানি। মেসির রেকর্ড যে খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে না, কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে এই ঘোষণা বোধহয় দিয়েই ফেলা যায়!
সাময়িকভাবে মেসিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার রাতে আরেকটি গৌরবের মুকুট যুক্ত হয়েছে এমবাপের পালকে। অলিভিয়ের জিরুকে ছাড়িয়ে ৫৮ গোল নিয়ে ফ্রান্স জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও এখন এমবাপে।