হাজার আলোকবর্ষ দূরের মহাজাগতিক বস্তু আবিষ্কার করলেন বাংলাদেশি জ্যোতির্বিদ

মো. জাহিদুর রাব্বী
মো. জাহিদুর রাব্বী

পৃথিবী থেকে এক হাজার আলোকবর্ষেরও বেশি দূরে একটি অস্বাভাবিক মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন এক বাংলাদেশি গবেষক।

এই অসামান্য কীর্তির নেপথ্যে আছেন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের পিএইচডি গবেষক ও বাংলাদেশি জ্যোতির্বিজ্ঞানী মো. রেদোয়ান আহমেদ।

পিএইচডি গবেষণার অংশ হিসেবে তিনি টিওআই-২১৫৫বি নামের মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন।

পৃথিবী থেকে এক হাজার ৩৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে এটি। আকারে বৃহস্পতি গ্রহের মতো হলেও এর ভর সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহটির তুলনায় প্রায় ৮০ দশমিক ৬ গুণ বেশি।

এটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ (বাদামি বামন) নাকি অতি কম ভরের নক্ষত্র, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

রেদোয়ান বলেন, ‘এটি হয়তো বিশাল ভরের একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ অথবা খুব কম ভরের একটি নক্ষত্র।’

ব্রাউন ডোয়ার্ফ মূলত এমন একটি মহাজাগতিক বস্তু, যা দেখতে নক্ষত্রের মতো হলেও আদতে নক্ষত্র নয়। একটি নক্ষত্রকে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে হাইড্রোজেন দহন প্রক্রিয়া চালানোর সক্ষমতা থাকতে হয়। ব্রাউন ডোয়ার্ফের সেই সক্ষমতা থাকে না। এগুলোও নক্ষত্রের মতো বিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। তবে এক পর্যায়ে এগুলো শীতল ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

এ কারণে ব্রাউন ডোয়ার্ফকে কখনো কখনো ‘ব্যর্থ নক্ষত্র’ বলা হয়—অর্থাৎ এমন বস্তু, যা নক্ষত্রের মতো প্রক্রিয়ায় গঠিত হলেও দীর্ঘস্থায়ী হাইড্রোজেন-দহনকারী নক্ষত্রে পরিণত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভর অর্জন করতে পারেনি।

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নক্ষত্র ও ব্রাউন ডোয়ার্ফ মোটামুটি একই ধরনের মহাকর্ষীয় প্রক্রিয়ায় গঠিত হলেও তাদের বিবর্তনের পথ ভিন্ন।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সাধারণত হাইড্রোজেন-দহনকারী নক্ষত্র হওয়ার ন্যূনতম ভর বৃহস্পতির ভরের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ গুণ বলে মনে করেন।

তবে সুনির্দিষ্ট সীমাটি বয়স, রাসায়নিক গঠন, বায়ুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য এবং ব্যবহৃত নাক্ষত্রিক মডেলের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

টিওআই-২১৫৫বি এই মানদণ্ড অনুযায়ী নক্ষত্র ও ব্রাউন ডোয়ার্ফের সীমারেখার প্রায় ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। এর পরিমাপ করা ভর বৃহস্পতি গ্রহের তুলনায় প্রায় ৮০ দশমিক ৬ গুণ। ফলে এটি সবচেয়ে বেশি ভরের ব্রাউন ডোয়ার্ফ এবং সবচেয়ে কম ভরের নক্ষত্রের মধ্যকার তাত্ত্বিক সীমার কাছাকাছি।

এর ভর নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হওয়ায় হাইড্রোজেন-দহন সীমা নিয়ে বিভিন্ন মডেল যাচাই করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে ব্রাউন ডোয়ার্ফ ও নক্ষত্রের মধ্যকার রূপান্তরকে সত্যিই একটি নির্দিষ্ট সীমা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় কি না, সেই প্রশ্নও তোলা সম্ভব হচ্ছে।

এই আবিষ্কারের শুরু হয়েছিল নক্ষত্রের আলোয় পরিবর্তন শনাক্ত করার মাধ্যমে—অর্থাৎ নক্ষত্র থেকে নির্গত তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণে পরিবর্তন।

রেদোয়ান ও তার সহগবেষকেরা নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট বা টিইএসএস ব্যবহার করে টিওআই-২১৫৫বি শনাক্ত করেন। এই মহাকাশযান নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্যের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে।

রেদোয়ান বলেন, ‘আমরা আসলে এই বস্তুটিকে “দেখিনি”। ট্রানজিট—অর্থাৎ নক্ষত্রের আলোয় পরিবর্তন—এবং রেডিয়াল ভেলোসিটি পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা এটিকে শনাক্ত করেছি।’

‘টিওআই-২১৫৫বি-কে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত ও এটি নিয়ে গবেষণা করতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়ার স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছি। স্যাটেলাইট এবং স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপগুলো তথ্য সরবরাহ করে; আমরা সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে এর অন্তর্নিহিত পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি’, যোগ করেন রেদোয়ান।

টিওআই-২১৫৫বি-এর ঘনত্বও অস্বাভাবিক। এটি এমন একটি অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে ভর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘনত্ব কমতে শুরু করে। ফলে ব্রাউন ডোয়ার্ফ কোথায় শেষ হয় এবং নক্ষত্র কোথা থেকে শুরু হয়—সেই ধাঁধা আরও জটিল হয়েছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই রূপান্তর অঞ্চলে থাকা মহাজাগতিক বস্তু খুঁজে আসছেন। কারণ এগুলো নক্ষত্র কীভাবে জীবনের শুরু করে এবং কেন কিছু বস্তু দীর্ঘস্থায়ী হাইড্রোজেন-দহনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারে না, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

একটি মাত্র বস্তু দিয়ে সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে টিওআই-২১৫৫বি-এর মতো আরও বস্তু নিয়ে গবেষণা করা গেলে নক্ষত্র ও উপ-নাক্ষত্রিক বস্তুর বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত মডেলগুলো আরও নিখুঁত করা সম্ভব হতে পারে।

সহযোগীদের নিয়ে রেদোয়ানের এই আবিষ্কার নিয়ে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল’ সাময়িকীতে।

এর ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্নের অনুসন্ধানের কেন্দ্রে চলে এসেছে তার গবেষণা—ঠিক কোথা থেকে একটি নক্ষত্রের শুরু?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো শিগগিরই পাওয়া যাবে না। টিওআই-২১৫৫বি আসলে কী, তা নির্ধারণ করতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হবে। আপাতত এই আবিষ্কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কয়েকটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। 

গ্রহ, ব্রাউন ডোয়ার্ফ ও নক্ষত্রের মধ্যকার অস্পষ্ট সীমারেখা এবং প্রকৃতি কীভাবে নির্ধারণ করে কখন একটি মহাজাগতিক বস্তু নক্ষত্রে পরিণত হবে, সেই প্রশ্নের জবাব মিললেই অনেক ধোঁয়াশা দূর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।