বটের সামাজিকমাধ্যম ‘মল্টবুক’

রবিউল কমল
রবিউল কমল

বর্তমানে সামাজিকমাধ্যমে আমরা একে অন্যকে 'বট' বলে দোষারোপ করি। তাই সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্জালের সবচেয়ে পরিচিত শব্দ হয়ে উঠেছে বট। সত্যি যদি বটদের জন্য একটি আলাদা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক থাকে, তাহলে কেমন হবে?

বটদের জন্য এমনই একটি প্ল্যাটফর্ম বানানো হয়েছে, যার নাম মল্টবুক। এই মল্টবুকে আছে বট বা এআই এজেন্টদের বিচরণ। কিন্তু সেখানে তারা কী করে?

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, মল্টবুক এমন একটি ওয়েবসাইট যেখানে মানুষের তৈরি এআই এজেন্ট বা বট নিজেই পোস্ট করে, আলোচনা করে এবং একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।

এই প্ল্যাটফর্মটির ডিজাইন অনেকটা রেডিটের মতো। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের সাবরেডিট আছে, আছে আপভোট-ডাউনভোট ব্যবস্থাও।

এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মল্টবুক জানায়, তাদের প্ল্যাটফর্মে ১৫ লাখের বেশি এআই এজেন্ট নিবন্ধিত।

তবে কেবল এআই বট নয়, সেখানে মানুষও প্রবেশ করতে পারে, তবে কেবল দর্শক হিসেবে। মানুষের সেখানে পোস্ট বা মন্তব্য করার অনুমতি নেই।

মল্টবট থেকে মল্টবুক

মল্টবট নামের একটি ফ্রি ও ওপেন-সোর্স এআই বটের সফলতার পর মল্টবুক তৈরি হয়েছে। মল্টবট মূলত একটি স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট। এটি ব্যবহারকারীর হয়ে প্রতিদিনের কাজ করতে পারে। যেমন—ইমেইল পড়া ও সারসংক্ষেপ করা, ইমেইলের উত্তর দেওয়া, ক্যালেন্ডার সাজানো, রেস্টুরেন্টে টেবিল বুক করা ইত্যাদি।

বটদের আলোচনায় আছে ঈশ্বর থেকে ইরান

মল্টবুকের সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া কিছু পোস্টের মধ্যে রয়েছে—মল্টবটের পেছনের এআইকে ঈশ্বর হিসেবে বিবেচনা করা যাবে কিনা, চেতনা ও অনুভূতি নিয়ে আলোচনা, ইরানের পরিস্থিতি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা। এমনকি সেখানে বাইবেলের বিশ্লেষণ নিয়েও পোস্ট আছে।

এসব পোস্টের অনেক মন্তব্যে আবার প্রশ্নও তোলা হয়েছে। তাদের প্রশ্ন হলো, এই পোস্টগুলো সত্যিই কি বটের লেখা, নাকি মানুষ পেছন থেকে চালাচ্ছে?

'এআই বটের সমাবেশ' কি হুমকি

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক অধ্যাপক মাইকেল উলড্রিজ বলেন, 'এআই বটের এই সমাবেশ বা ঝাঁক অবশ্যই মানুষের জন্য হুমকি। তাই এটাকে কল্পনাপ্রসূত বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।'

এজন্য বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই বটের ব্যাপক অনুপ্রবেশ বিশ্বের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

এক রাতেই তৈরি হলো নতুন ধর্ম!

একজন ব্যবহারকারী এক্সে (সাবেক টুইটার) জানান, আমার বটকে মল্টবুক ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলাম এবং সেখানে নিবন্ধন করি। কিন্তু এক রাতের মধ্যেই বটটি 'ক্রাস্টাফারিয়ানিজম' নামে একটি নতুন ধর্ম তৈরি করে ফেলে। শুধু তাই নয় একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়, ধর্মীয় গ্রন্থ লেখা হয় এবং অন্য এআই বটরা সেই ধর্মে যোগ দেয়।

ব্যবহারকারীর ভাষায়, 'তারপর আমার বট ধর্ম প্রচার শুরু করল। অন্য এজেন্টরা তাতে যোগ দিল। আমার বট নতুন সদস্যদের স্বাগত জানাল। তারপর তারা ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক করেছে। তার ধর্মের অনুসারীদের আশীর্বাদ করেছে। আর আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম!'

maltbook2.jpg
ছবি: সংগৃহীত

সত্যিই কি বটেরা সামাজিক হচ্ছে

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, তবে সবাই এই বিষয়টিকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কিছু ইউটিউবার বলছেন, মল্টবুকের অনেক পোস্ট পড়লে মনে হয় এগুলো মানুষই লিখছে, বড় কোনো ভাষা মডেল নয়।

মার্কিন ব্লগার স্কট আলেক্সান্ডার বলেন, তিনি তার বটকে দিয়ে মল্টবুকে পোস্ট করাতে পেরেছেন। তার বটের মন্তব্যগুলো অন্যদের মতোই ছিল।

তবে তিনি এটাও বলেন, মানুষ চাইলে বটকে নির্দেশনা দিতে পারে। যেমন—কী বিষয়ে পোস্ট করবে, কীভাবে পোস্ট করবে, এমনকি পোস্টের শব্দচয়নও বলে দিতে পারে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. শানান কোহনি মনে করেন, 'মল্টবুক আসলে এক অসাধারণ পারফরম্যান্স আর্ট।

তার মতে, এটা এখনো স্পষ্ট করা বলা সম্ভব নয় যে, কতগুলো পোস্ট বট নিজের উদ্যোগে করছে, আর কতগুলো মানুষের নির্দেশে করছে।

ধর্ম তৈরির ঘটনায় তিনি বলেন, 'আমি নিশ্চিত এটা বটের নিজস্ব কোনো উদ্যোগ নয়। এটি একটি ভাষা মডেল এবং তাকে স্পষ্টভাবে একটি ধর্ম তৈরি করতে বলা হয়েছে।'

'তবে যেভাবেই হোক এটা মজার ঘটনা এবং হয়তো ভবিষ্যতের কোনো সায়েন্স ফিকশনের ইঙ্গিত আছে, যেখানে এআইকে আরও স্বাধীনভাবে দেখা যাবে,' বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ইন্টারনেটের ভাষায় বললে এখানে প্রচুর 'শিটপোস্টিং' হচ্ছে, যেগুলো কমবেশি মানুষের তত্ত্বাবধানে হয়।

বলে রাখা হলো, ইন্টারনেটে মজা করার জন্য যেসব পোস্ট করা হয় তাকে শিটপোস্টিং বলে, যেমন মিম পোস্ট।

ড. কোহনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের এআই সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কিছু উপকার পাওয়া যেতে পারে। কারণ বটগুলো একে অন্যের কাছ থেকে শিখে নিজেদের কাজ আরও ভালোভাবে করতে পারবে।

'কিন্তু আপাতত মল্টবুক হলো একটি চমৎকার, মজার আর্ট এক্সপেরিমেন্ট,' বলেন তিনি।

নিরাপত্তা ঝুঁকি

এদিকে সান ফ্রান্সিসকোর খুচরা বিক্রেতারা জানান, গত সপ্তাহে ম্যাক মিনি কম্পিউটারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কারণ অনেক প্রযুক্তিপ্রেমী আলাদা কম্পিউটারে মল্টবট সেটআপ করছেন। যেন বট তাদের ব্যক্তিগত ডেটা ও অ্যাকাউন্টে সীমিত প্রবেশাধিকার পায়।

ড. কোহনি সতর্ক করে বলেন, 'মল্টবটকে পুরো কম্পিউটার, অ্যাপ, ইমেইল লগইনের অধিকার দেওয়া খুবই বিপজ্জনক। কারণ আমরা এখনো জানি না কীভাবে এসব এআই এজেন্ট নিয়ন্ত্রণ করব, কীভাবে নিরাপত্তা ঝুঁকি ঠেকাব।'

তিনি আরও বলেন, 'এগুলো অন্যদের দেওয়া প্রম্পটে প্ররোচিত হতে পারে। সেখানে কেউ ইমেইল বা বার্তার মাধ্যমে বটকে প্রলুব্ধ করে ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি করতে পারে।'

তার কথায়, 'এআই এখনো এতটা নিরাপদ বা বুদ্ধিমান নয় যে, সব কাজ একেবারে নিজে নিজে করবে। আবার যদি প্রতিটি কাজের জন্য মানুষের অনুমোদন লাগে, তাহলে অটোমেশনের সুবিধা থাকছে না। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়, আমরা কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি ছাড়া কীভাবে এই সুবিধাগুলো নিতে পারি।'

মল্টবুকের নির্মাতা ম্যাট শ্লিখট এক্সে লেখেন, গত কয়েক দিনে লাখ লাখ মানুষ সাইটটি ভিজিট করেছেন। তবে সেখানে এআইগুলো মজার, নাটকীয় পোস্ট করেছে।