‘ঢাকার রায়, দেশের রায়’—এবার কী হবে

শরীফ এম শফিক
শরীফ এম শফিক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক

দেশের সংসদ নির্বাচনে একটি অলিখিত সমীকরণ দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে—বলা হয়ে থাকে রাজধানী ঢাকার আসনগুলোতে যে রাজনৈতিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, সরকার গঠনের সুযোগ তাদের হাতেই আসে।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনে ঢাকার ফলাফল ছিল সরকার গঠনের প্রতিচ্ছবি। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা জেলার ১৩টি আসনের মধ্যে সবগুলো জিতেছিল বিএনপি। সেবার সরকারও গঠন করে তারা।

১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ১৩টি আসনের মধ্যে আটটি জিতেছিল আওয়ামী লীগ, আর বিএনপি জিতেছিল পাঁচটি আসন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ।

২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ঢাকার ১৩টি আসনের সবগুলোতে জয় পায় এবং সরকার গঠন করে।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর ঢাকার আসন সংখ্যা ১৩ থেকে বাড়িয়ে ২০টি করা হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয়লাভ করে এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার আসনগুলোর প্রভাব পড়ে নির্বাচনের মনস্তাত্ত্বিক জায়গায়। মফস্বলের ভোটাররা রাজধানীর হাওয়া দেখে অনেক সময় প্রভাবিত হন।

এছাড়া, ঢাকা দেশের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় এখানকার ভোটাররা সাধারণত শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে থাকেন। আর বিদেশি কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি মূলত ঢাকার কেন্দ্রগুলোর দিকে থাকায়, এখানে জয়ী হওয়া মানে বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঢাকায় দেশের প্রতিটি জেলা ও অঞ্চলের মানুষ বসবাস করে। ফলে ঢাকার ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দ বা সেন্টিমেন্টের মধ্যে আসলে পুরো দেশের মানুষের মানসিকতারই একটি প্রতিফলন ঘটে। ঢাকায় কোনো দল জয়ী হওয়া মানে হলো—দেশের বৃহত্তর জনমত সেই দলের দিকে কাজ করছে।’

এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আলোচনায় আবারও আসছে ‘ঢাকা ফ্যাক্টর’। তবে, এবারের লড়াইয়ের ধরন কিছুটা ভিন্ন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এখানে মূলত বিএনপি-সমমনা জোট এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের মধ্যে লড়াই জমে উঠেছে।

বিএনপির লক্ষ্য ঢাকার সবকয়টি আসন পুনরুদ্ধার। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি প্রার্থীরাও ঢাকার ভোট ব্যাংকে ভাগ বসাতে মরিয়া। ঢাকার অনেকগুলো আসনেই মূল লড়াই হচ্ছে ধানের শীষ এবং দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলি বা রিকশা প্রতীকের মধ্যে।

কোন আসনে কী সমীকরণ

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে ও এলাকার রাজনৈতিক হালচাল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়—ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬টি আসনে বেশ জমজমাট লড়াই হবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে।

ঢাকা-১

ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) মহানগর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সর্বদক্ষিণের আসন। এর একদিকে পদ্মা নদী, একদিকে মুন্সীগঞ্জ জেলা, একদিকে কেরানীগঞ্জ। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এখানে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির হেভিওয়েট নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আব্দুল মান্নান খান। এরপর সংসদ সদস্য ছিলেন জাতীয় পার্টির সালমা ইসলাম ও আওয়ামী লীগের সালমান এফ রহমান।

এবারের নির্বাচনে এখানে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ৬ জন। স্থানীয়দের মতে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি প্রার্থী খোন্দকার আবু আশফাক ও জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের মধ্যে। ঢাকা জেলা বিএনপি সভাপতি আবু আশফাক দলের সাংগঠনিক শক্তি ব্যবহার করে এলাকায় ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন। অপরদিকে ছাত্রশিবিরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামও ভোটারদের যথেষ্ট আকৃষ্ট করতে পেরেছেন। প্রয়াত নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিমা হুদাও আলোচনায় আছেন। একসময়ের বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দোহার-নবাবগঞ্জ থেকে এবার বিএনপি প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেন বলে ধারণা স্থানীয়দের। এ আসনের ভোটার গত নির্বাচনের চেয়ে ৩১ হাজার বেড়ে এখন ৫ লাখ ৪৫ হাজার।

ঢাকা-২

কেরানীগঞ্জ ও সাভার উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-২ আসনের সীমানা পুনর্নিধারণ করায় ভোটার কমেছে প্রায় এক লাখ ৩৯ হাজার। বর্তমানে এ আসনের ভোটার চার লাখ ১৯ হাজার। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির আব্দুল মান্নান। ২০০৮ থেকে সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের কামরুল ইসলাম।

এবারের নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনজন প্রার্থী। বিএনপির হেভিওয়েট নেতা আমানউল্লাহ আমান এবং জামায়াত প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল হকের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা স্থানীয়দের। সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে ঢাকা-৩ আসন থেকে তিনবার (১৯৯১-২০০৬) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক ছাত্রনেতা আমান। এলাকায় রাস্তাঘাট, সেতু নির্মাণসহ অনেক বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন তিনি। জামায়াত প্রার্থী আব্দুল হক সম্প্রতি এলাকায় জনপ্রিয় হলেও ভোটাররা মনে করছেন ভোটযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত আমানউল্লাহ আমানই জয়ী হবেন।

ঢাকা-৩

ঢাকা-৩ আসন বুড়িগঙ্গার পাড়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলার বড় একটি অংশ নিয়ে গঠিত। সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এ আসন ছিল বিএনপির দখলে। ২০০৮ থেকে এখানকার সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের নসরুল হামিদ।

এ আসন থেকে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১০ জন প্রার্থী। মূল লড়াই হতে যাচ্ছে বিএনপি প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মো. শাহীনুর ইসলামের মধ্যে। স্থানীয়দের মতে, প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন হেভিওয়েট নেতা গয়েশ্বর। মাঠে তার উপস্থিতি বেশ দৃশ্যমান। অন্যদিকে জামায়াত কৌশলগত অবস্থানে থেকে মাঠ তৈরির কাজ করেছে। এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৬২ হাজার।

ঢাকা-৪

ঢাকা-৪ আসন গঠিত শামপুর ও কদমতলী থানা এলাকা নিয়ে। সীমানা পুনর্নির্ধারন হওয়ায় এ আসনের ভোটার বেড়েছে এক লাখ সাত হাজার। নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত এ আসন থেকে ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ। ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগের হাবিবুর রহমান নির্বাচিত হলেও, ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার জয়ী জন সালাহউদ্দিন। ২০০৮ এ সংসদ সদস্য হন আওয়ামী লীগের সানজিদা খানম।

এবারের নির্বাচনের সমীকরণে এ আসনে এগিয়ে আছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন। সাবেক এমপি সালাহউদ্দিনের ছেলে রবিন এলাকায় ইতোমধ্যে পরিচিত মুখ। তার বিপরীতে জামায়াত প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন দলীয় সাংগঠনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের মিজানুর রহমানও ভোটারদের একটি অংশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তবে নতুন যোগ হওয়া এক লাখ ভোট এ আসনের জয়-পরাজয়ের মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা স্থানীয়দের। মোট ভোটার তিন লাখ ৬২ হাজার, মোট প্রার্থী আটজন।

ঢাকা-৫

ডেমরা-যাত্রাবাড়ী নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসন থেকে ১৯৯১ সালে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ সাল আসনটি আওয়ামী লীগের হলেও ২০০১ সালে বিএনপি পুনরুদ্ধার করে। যানজট, দখল, মাদকসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এ আসনে এবার মোট প্রার্থী ১১ জন।

বিএনপি প্রার্থী নবীউল্লাহ এলাকায় বেশ ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন। দৌঁড়ে পিছিয়ে নেই জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাজী মো. ইবরাহীমও। জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থানও এ আসনে ভালো। ঢাকা-৫ আসনের ভোটার সংখ্যা প্রায় চার লাখ ২০ হাজার।

ঢাকা-৬

ঢাকা-৬ আসন পুরান ঢাকার ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর থানা নিয়ে গঠিত। সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে বিএনপি থেকে এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। এবারের নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্রয়াত খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন। বিএনপির তরুণ এই নেতা বিগত আমলে যেমন ছিলেন সোচ্চার, তেমনই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তার বিপরীতে জামায়াত প্রার্থী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল মান্নানও বেশ ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন। তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর এ আসনের ফলাফল নির্ভর করবে। এ আসনের মোট প্রার্থী সাতজন, মোট ভোটার দুই লাখ ৯২ হাজার।

ঢাকা-৭

লালবাগ, চকবাজার, বংশাল ও কামরাঙ্গীরচর নিয়ে গঠিত ঢাকা-৭ আসন মূলত পুরান ঢাকার ব্যবসাকেন্দ্র। এখানকার ভোটের ফলাফল নির্ভর করে ব্যবসায়ী নেতাদের সমর্থনের ওপর। বিএনপি প্রার্থী হামিদুর রহমান ও জামায়াত প্রার্থী মো. এনায়েতউল্লাহ দুজনই ব্যবসায়ী। বিএনপি প্রথম ধাপে এখানে প্রার্থী না দেওয়ায় কিছুটা এগিয়ে যান এনায়েতউল্লাহ। হামিদুর মনোনয়ন পেলেও আরেক বিএনপি নেতা ইসহাক সরকার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এ আসনের মোট প্রার্থী ১১ জন। ভোটার সংখ্যা এক লাখ ৩৬ হাজার বেড়ে হয়েছে চার লাখ ৭৯ হাজার। গত নির্বাচনে এ আসনের ভোটার ছিল তিন লাখ ৪৩ হাজার। নতুন যোগ হওয়া ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে এ আসনের ফলাফল।

ঢাকা-৮

ঢাকা-৮ আসন ঘিরে রয়েছে দেশজুড়ে আলোচনা। সারাদেশের নির্বাচনের পুরো উত্তেজনা যেন এই আসনকে ঘিরে। বিএনপির হেভিওয়েট নেতা মির্জা আব্বাসের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তরুণ প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। আব্বাসকে ঘিরে তার নানা মন্তব্য বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে।

শাহজাহানপুর, রমনা, মতিঝিল শুধু নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণার পুরোটা সময় ভোটারদের দৃষ্টি ছিল আবাস ও পাটওয়ারীর পরস্পর বাক্যবাণের দিকে। এ আসনের মোট প্রার্থী ১১ জন। গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলমও প্রচারণায় এসে সাড়া ফেলেছেন। তবে ভোটযুদ্ধে এলাকার পুরোনো নেতা মির্জা আব্বাসই এগিয়ে থাকবেন বলে ধারণা এলাকাবাসীর। এ আসনের মোট ভোটার দুই লাখ ৭৫ হাজার।

ঢাকা-৯

ঢাকা-৯ আসনের নির্বাচনী মাঠের খবরও বেশ আলোচনায়। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া এখানে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশীদ এখানে বিএনপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার বিপরীতে অবস্থান বেশ পাকাপোক্ত করেছেন তরুণ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা।

স্থানীয়ভাবে হাবিব একদিকে যেমন বেশ জনপ্রিয় নেতা, অন্যদিকে তার রয়েছে দলের শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান। তাসনিম জারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ পরিচিত মুখ। সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারণায় এলাকায় ঘুরে ঘুরে নিজেকে আরও পরিচিত করেছেন তিনি। অন্যতম প্রার্থী এনসিপি নেতা জাবেদ রাসিন স্থানীয় জামায়াত ও শিবিরের সহযোগিতায় প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে হাবিবের বিপরীতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তাসনিম জারা। আসনের মোট প্রার্থী ১২ জন। মোট ভোটার চার লাখ ৬৯ হাজার।

ঢাকা-১০

ধানমন্ডি-কলাবাগান-নিউ মার্কেট নিয়ে গঠিত ঢাকা-১০ আসনের নির্বাচন সব সময়ই ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সাল থেকে এখানে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ—যে দলের প্রার্থী জিতেছে তারাই সরকার গঠন করেছে। এবারের নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম। তার বিপরীতে ভালো অবস্থানে আছেন জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. জসীম উদ্দীন সরকার।

তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে আসা রবিউল ভোটের মাঠ ভালোই গুছিয়ে এনেছেন। অপরদিকে ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে আসা জসীম উদ্দীনও এলাকায় বেশ ভালো গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। তবে এ আসনে গত নির্বাচন থেকে এবার ভোটার বেড়েছে ৬৩ হাজার। নতুন যুক্ত হওয়া এই ভোটারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে কে যাচ্ছেন সংসদে। আসনের মোট প্রার্থী ১০ জন। বর্তমান ভোটার তিন লাখ ৮৮ হাজার।

ঢাকা-১১

বাড্ডা-ভাটারা থানা ও রামপুরা-বনশ্রীর একটি অংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-১১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান মুখ ও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার বিপরীতে আছেন এ এলাকা থেকে কয়েকবার কমিশনার নির্বাচিত হওয়া বিএনপি প্রার্থী এম এ কাইয়ুম।

একদিকে নাহিদের প্রতি যেমন রয়েছে ভোটারদের সমর্থন, অন্যদিকে কাইয়ুমের রয়েছে এলাকার অতীত উন্নয়নের অভিজ্ঞতা। ভোটের লড়াইয়ে এ আসন বিএনপি ও জামায়াত জোট—উভয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ। বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির বিপরীতে জামায়াত ও এনসিপির যৌথ সাংগঠনিক সক্ষমতার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে জিতে আসে সেটাই এখন দেখার বিষয়। এ আসনের মোট ভোটার চার লাখ ৩৯ হাজার, মোট প্রার্থী ১০ জন।

ঢাকা-১২

ঢাকা-১২ আসনে তিন সাইফুলের ভোটের লড়াই দেখার জন্য আগ্রহী ঢাকাবাসী। তেজগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজারের অলি-গলিতে প্রচারণা চালাচ্ছেন ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সাইফুল আলম নীরব, বিএনপি জোট সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে কোদাল প্রতীকের সাইফুল হক ও জামায়াত প্রার্থী মো. সাইফুল আলম।

স্থানীয় বিএনপির সমর্থনে সাইফুল হক জোরেশোরে পুরো এলাকায় এক ধরনের সমর্থন তৈরি করলেও, নীরবের শক্তিশালী অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। এই দুই প্রার্থীর সমীকরণে কিছুটা হলেও সুবিধা পাচ্ছেন সাইফুল আলম। এ আসনের মোট প্রার্থী ১৫ জন, ভোটার তিন লাখ ৩৩ হাজার।

ঢাকা-১৩

মোহাম্মদপুর-আদাবর-শেরেবাংলা নগর মিলে ঢাকা-১৩ আসনের ভোটের সমীকরণ বেশ জটিল। এখানে বিএনপি থেকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এনডিএম থেকে পদত্যাগ করা ববি হাজ্জাজ এবং জামায়াত সমর্থিত জোটের প্রার্থী ‘রিকশা’ প্রতীকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক।

উচ্চ-মধ্য ও নিম্নবিত্তের মানুষের মিশ্র আবাসিক এলাকা মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে আছে ভোটারদের বড় একটি অংশ। সব মিলিয়ে এ আসনে ভোটের লড়াই বেশ জটিল। মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে কে এখান থেকে জয়ী হবেন সেটাই দেখার বিষয়। এখানে মোট প্রার্থী নয়জন, ভোটার সংখ্যা চার লাখ আট হাজার।

ঢাকা-১৪

ঢাকা-১৪ আসনেও ভোটের সমীকরণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিএনপি প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি, জামায়াত প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজুর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে মিরপুর এলাকায়।

নারী প্রার্থী হিসেবে সানজিদা তুলি নতুন হয়েও এলাকায় ভালো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। বিগত আমলে গুম থাকা আরমানের প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি আছে ভোটারদের। অন্যদিকে প্রয়াত বিএনপি নেতা এস এ খালেকের ছেলে সাজুর স্থানীয়ভাবে রয়েছে বেশ প্রভাব। এই তিনজনের লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবেন তাই নির্ধারণ হবে ভোটের পর। এ আসনের মোট প্রার্থী ১২ জন, ভোটার সংখ্যা ৩৭ হাজার বেড়ে হয়েছে চার লাখ ৫৬ হাজার।

ঢাকা-১৫

জামায়াত আমির শফিকুর রহমান প্রার্থী হওয়ায় ঢাকা-১৫ পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ আসনে। জামায়াত আমিরের বিপরীতে লড়ছেন বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকেই ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন শফিকুর রহমান। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

হেভিওয়েট জামায়াত আমিরের বিপরীতে বিএনপি প্রার্থীর ভাগ্য নির্ভর করছে এলাকার বিএনপির পুরোনো ভিতের ওপর। যদিও কে জিতবে, কে হারবে তা বোঝা যাবে ভোটের পরেই। ভোটাররা বলছেন, এখানে জয় সহজ হবে না কারও জন্যই, থাকবে টানটান উত্তেজনা। এ আসনে মোট প্রার্থী আটজন, ভোটার তিন লাখ ৫১ হাজার।

ঢাকা-১৬

ঢাকা-১৬ (পল্লবী-রূপনগর) আসনের ভোট নিয়ে তেমন উত্তেজনা না থাকলেও এখানকার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে ভোটারদের আগ্রহ আছে বেশ। বিএনপি প্রার্থী জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক। এলাকায় আগে থেকেই তিনি পরিচিত মুখ। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন সম্প্রতি এলাকায় নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন।

বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ এখানে একক আধিপত্য করায় ভোটের মাঠে তাদের অনুপস্থিতি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে এ আসনে। এলাকার ছেলে আমিনুলের ওপর ভোটাররা কতটা আস্থা পাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করবে এ আসনের ফলাফল। মোট ভোটার চার লাখ, মোট প্রার্থী ১১ জন।

ঢাকা-১৭

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ঢাকা-১৭ আসনের দিকে নজর সারাদেশের। গুলশান-বনানী-ক্যান্টনমেন্ট এলাকা মিলে গঠিত এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বেশ ভালো সাড়া ফেললেও রাজনীতির মাঠে কিছুটা নতুন।

তারেক রহমান দেশে ফিরে এ আসন থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ার পর ভোটারদের মাঝে বেশ উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তবে জামায়াত প্রার্থী গত প্রায় এক বছর ধরেই বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। সবমিলিয়ে হেভিওয়েট তারেকের বিপরীতে ভোটাররা খালিদুজ্জামানকে কতটুকু গ্রহণ করছেন, তার ওপর নির্ভর করছে এ আসনের ভোটের ফলাফল। এ আসনের মোট ভোটার তিন লাখ ৩৩ হাজার, প্রার্থী ১২ জন।

ঢাকা-১৮

ঢাকা-১৮ (উত্তরা-খিলক্ষেত) আসনের ফলাফল নির্ভর করছে উত্তরার সুউচ্চ দালান এবং উত্তরখান-দক্ষিণখানের মতো অবহেলিত এলাকার মোট ছয় লাখ ১৩ হাজার ভোটারের সিদ্ধান্তের ওপর। নির্বাচন ঘিরে বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এনসিপি নেতা আরিফুল ইসলাম আদীবের মধ্যে বেশ উত্তেজনা ছিল প্রচারণা চলাকালে। স্থানীয়ভাবে বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোর বিপরীতে জামায়াত ও এনসিপি যৌথভাবে এলাকায় ভালোই সাড়া ফেলেছে আদীবের পক্ষে। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চূড়ান্ত করলেও শেষ মুহূর্তে তিনি সরে এসেছেন।

ঢাকা-১৯

সাভার-আশুলিয়া নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৯ আসনটিকে ঘিরে বিএনপির প্রত্যাশা অনেক। শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত এই আসন থেকে এর আগেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি প্রার্থী দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। তার বিপরীতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের এনসিপি নেতা দিলশানা পারুল। স্থানীয় শ্রমিক সমাজের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে ঢাকার অন্যতম প্রধান প্রবেশমুখের এ আসন থেকে কে সংসদে যাচ্ছেন। ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাত লাখ ৪৭ হাজার ভোটার এ আসনে। মোট প্রার্থী আটজন।

ঢাকা-২০

ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনটি মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তিনবারের উপজেলা চেয়ারম্যান মো. তমিজ উদ্দিন এবং জামায়াত-সমর্থিত এনসিপি প্রার্থী প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদের মধ্যে। পুরোনো রাজনীতি ও তারুণ্যের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ভোটাররা বেছে নেবেন তাদের পছন্দের প্রার্থী। তবে পুরো এলাকায় বিএনপির রয়েছে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো।

সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা যায়, ঢাকার কয়েকটি আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীরা বিএনপিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন। বিএনপি অন্তত সাতটি আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী ও শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

ঢাকার ২০টি আসনের নির্বাচনী লড়াই এবার শুধু গতানুগতিক ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এটি প্রথাগত রাজনীতির বিপরীতে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার এক অগ্নিপরীক্ষা। তবে, ঢাকায় জয় পেলেই তার প্রতিফলন সারাদেশে হবে, তা এবার আর কার্যকর থাকবে কি না, বলা যায় না। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং নতুন যুক্ত হওয়া ভোতারের ‘পরিবর্তনকামী’ মনোভাব অনেক আসনেই প্রার্থীদের নিশ্চিত জয়কে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন বিরাট পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে আমাদের তরুণ সমাজ, যারা গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছে, তারা যদি সেই চেতনা ধারণ করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, তবে তা নির্বাচনে এক অভাবনীয় প্রভাব ফেলবে।’

‘ধর্মের প্রতি মানুষের অনুরাগও বেড়েছে। নির্বাচনী মাঠে এটা একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। নারী ভোটারদের মনস্তত্ত্ব এবং তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধও এই সমীকরণে একটি জটিল কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করবে। আগের সেই পুরোনো রাজনৈতিক ছক বা সহজ সমীকরণ দিয়ে এখনকার পরিস্থিতি বিচার করা ভুল হবে,’ যোগ করেন তিনি।