নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে ভুয়া ‘হাহা’ রিঅ্যাকশন
২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেত্রী ফেসবুকে একটি পোস্টের স্ক্রিনশট শেয়ার করেন। সেই পোস্টে আরেক সহনেতার বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ করেছিলেন তিনি।
আতঙ্কিত হয়ে তিনি লেখেন, '...ভাইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে আমি সত্যিই উদ্বিগ্ন। আপনার মতাদর্শ তার সঙ্গে না মিললেও এই কঠিন সময়ে তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়াটা মানবিক দায়িত্ব। স্ক্রিনশটে থাকা ব্যক্তিকে যদি কেউ চেনেন বা তার সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় জানেন, অনুগ্রহ করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসুন।'
এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত পোস্টটিতে ১০ হাজারেরও বেশি রিঅ্যাকশন (প্রতিক্রিয়া) পড়ে। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৫০০টিই ছিল 'হাহা'। এটা কোনো উদ্বেগ নয়, বরং বিদ্রূপের ইঙ্গিত দেয়।
সাধারণত সামাজিক মাধ্যমে কেউ কারও মতের সমর্থন বা বিরোধিতা জানাতে 'লাইক', 'লাভ' বা 'হাহা'সহ বিভিন্ন রিঅ্যাকশন দেয়। কিন্তু এই ৮ হাজার ৫০০টি 'হাহা' রিঅ্যাকশন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি পাঁচটির মধ্যে একটি এসেছে সন্দেহজনক প্রোফাইল থেকে।
অনেক ইউজারনেম ছিল বিদেশি, বাংলা বা ইংরেজি ছাড়া অন্য লিপিতে লেখা। বেশিরভাগ ব্যবহারকারীর কোনো প্রোফাইল ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য নেই। এর মধ্যে ছিল টোগোর 'কোকো খেলিওস' কিংবা মাদাগাস্কারের 'অলিভিয়ে রান্দ্রিয়ানজাকা'র মতো নাম, যাদের ওই পোস্টের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার কথাই না।
দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রিপোর্টের শুরুতে উল্লেখ করা ওই বাংলাদেশি ছাত্রনেত্রীর পোস্টে এসব অ্যাকাউন্টের রিঅ্যাকশন কোনো কাকতালীয় ব্যাপার ছিল না। এগুলো মূলত বট প্রোফাইল, যা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ বা ভুয়া সমর্থন তৈরির জন্য অনলাইনে খুব সহজেই কেনা যায়।
এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দ্য ডেইলি স্টার দুদিনে চারটি আলাদা 'ক্লিক ফার্ম' থেকে পাঁচটি ডামি (নকল) ফেসবুক প্রোফাইল ব্যবহার করে নয়টি মিম পোস্টে প্রায় ৩০ হাজার রিঅ্যাকশন কিনেছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আমাদের পোস্টে ভুয়া রিঅ্যাকশন দেওয়া অনেক প্রোফাইলই আবার ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অন্তত ছয়জন প্রার্থী ও অসংখ্য রাজনৈতিক ব্যক্তির পোস্টেও সক্রিয়—কখনো সমর্থনে, কখনো বা ট্রল করতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে এই ধরনের সমন্বিত বট তৎপরতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে কৃত্রিমভাবে এমন এক জনমত গড়ে ওঠে, যার সঙ্গে বাস্তব জনমতের কোনো মিল নেই।
এ ধরনের কাজ মেটার নীতিমালারও সরাসরি লঙ্ঘন।
ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী কৃত্রিমভাবে এনগেজমেন্ট বাড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভুয়া অ্যাকাউন্ট, স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম কিংবা সমন্বিত ক্লিক ফার্মের মাধ্যমে রিঅ্যাকশন, ফলোয়ার বা শেয়ার বাড়ানো নীতিমালার পরিপন্থী।
নীতিমালায় বলা আছে, লাইক, শেয়ার, ভিউ, ফলো, ক্লিক বা নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ ব্যবহারের মতো এনগেজমেন্ট কেনাবেচা বা বিনিময় আমরা অনুমোদন করি না।
তবু এই অনুসন্ধানে উঠে আসা প্রভাব বিস্তারকারী নেটওয়ার্ক প্রমাণ করে, মেটার শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এসব ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে।
মেটার কাছে ইমেইলে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
ডিজিটাল মব
দ্য ডেইলি স্টার গত দুই মাসে ২৬৩টি ফেসবুক পোস্টে পাওয়া 'হাহা'সহ বিভিন্ন রিঅ্যাকশন বিশ্লেষণ করে অন্তত চারটি রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত গোষ্ঠীর সন্ধান পেয়েছে। এসব গোষ্ঠী বা ক্লাস্টার সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাদের আচরণে মিল রয়েছে এবং সংগঠিত কোনো বাহিনীর মতো তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এই গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক বা আদর্শিক প্রতিপক্ষের পোস্টে দলবদ্ধভাবে 'হাহা' রিঅ্যাকশন দেয়। এর ফলে একটি ব্যাপক উপহাসের পরিবেশ তৈরি হয় এবং একই সঙ্গে নির্ধারিত পোস্টটির দৃশ্যমানতাও কমে যায়।
চিহ্নিত চারটি ক্লাস্টারের মধ্যে দুটি জামায়াতপন্থী বলে ধারণা করা হচ্ছে। একটি বিএনপিপন্থী এবং আরেকটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগপন্থী। তবে এই অনুসন্ধানে কোনো দলের সঙ্গে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা যাচাই করা হয়নি।
এই তৎপরতা কেবল ট্রলিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিপুল পরিমাণ শত্রুভাবাপন্ন রিঅ্যাকশন ব্যবহার করে তারা ফেসবুকের অ্যালগরিদমকে কৌশলে প্রভাবিত করে।
২০২১ সালে ফাঁস হওয়া 'ফেসবুক পেপারস' অনুযায়ী, কোনো পোস্টে ট্রলিংয়ের লক্ষণ দেখা দিলে ফেসবুক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটির রিচ কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ সমন্বিত 'হাহা' আক্রমণ শুধু ব্যঙ্গের প্রকাশ নয়, বরং সচেতনভাবে কোনো পোস্টকে জনদৃষ্টির আড়ালে ঠেলে দেওয়ার একটি কৌশল।
এ ধরনের আক্রমণ চালানোও খুব সহজ। দরকার হয় শুধু একজন ক্রেতা, একটি মোবাইল ওয়ালেট, ফেসবুকে সক্রিয় অসংখ্য এনগেজমেন্ট বিক্রেতার যেকোনো একজন এবং বড়জোর পাঁচ মিনিট সময়।
এই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাইরে থেকে যা স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ বা মতাদর্শিক সংঘাত বলে মনে হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক হাজার টাকায় কেনা এক ধরনের কৃত্রিম বাস্তবতা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জনমতকে প্রভাবিত করতেই এই কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে।
পর্যালোচনায় নেওয়া ২৬৩টি ফেসবুক পোস্ট এসেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনের বিভিন্ন অংশ থেকে। এর মধ্যে ৫৫টি ছিল বিএনপিপন্থী, ৫২টি জামায়াতপন্থী, ৪২টি আওয়ামী লীগপন্থী এবং ২৪টি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সমর্থকদের পোস্ট।
পাশাপাশি বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত ছিল ২৯টি গণমাধ্যমের পোস্ট, ১৪টি সাংবাদিকদের পোস্ট, দলীয় পরিচয়হীন ২০টি ডানপন্থী এবং ২৭টি বামপন্থী ব্যবহারকারীর পোস্ট।
সব মিলিয়ে এসব পোস্টে পড়েছে ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮১১টি রিঅ্যাকশন। এর মধ্যে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ১২৯টি, অর্থাৎ মোটের ৬২ শতাংশ ছিল 'হাহা'। অন্তত ১৯ হাজার ৭০৮টি রিঅ্যাকশন এসেছে এমন প্রোফাইল থেকে, যেগুলোর বৈশিষ্ট্য বট অ্যাকাউন্টের সঙ্গে মিলে যায়।
এই অনুসন্ধানে কোনো গোষ্ঠীকে 'ক্লাস্টার' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তখনই, যখন তাদের সদস্যরা নিজেদের রাজনৈতিক শিবিরের পোস্টে প্রকাশ্য সমর্থন দেখিয়েছে এবং একই সঙ্গে অন্য শিবিরের অন্তত সাতটি পোস্টে দলবদ্ধভাবে 'হাহা' রিঅ্যাকশন দিয়েছে।
এই মানদণ্ডে চারটি রাজনৈতিক ক্লাস্টার শনাক্ত হয়েছে। জামায়াতপন্থী দুটি ক্লাস্টার (যাদের সদস্যসংখ্যা ৩২৬ ও ১৬), আওয়ামী লীগপন্থী একটি ক্লাস্টার (১৩৪ সদস্য) এবং বিএনপিপন্থী একটি ক্লাস্টার (১২ সদস্য)।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াতপন্থী দুই ক্লাস্টারই সবচেয়ে আক্রমণাত্মক। এই ডেটাসেটে তারা বিএনপি-সমর্থিত পোস্টের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৪৬৫ বার দলবদ্ধ 'হাহা' হামলা চালিয়েছে।
তাদের দ্বিতীয় প্রধান লক্ষ্য ছিল বামপন্থীরা। তাদের পোস্টে আক্রমণ হয়েছে ১ হাজার ১৯৬ বার। তুলনামূলকভাবে আওয়ামী লীগপন্থী পোস্টে আক্রমণের সংখ্যা ছিল কম, ২০৭ বার।
এই আক্রমণের শিকারদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রনেতাও রয়েছেন, তাদের একজন বামপন্থী সংগঠনের এবং অন্যজন ছাত্রদলের।
আওয়ামী লীগপন্থী ক্লাস্টার মূলত জামায়াত-সংশ্লিষ্ট পোস্টে আক্রমণ করেছে, এরপর এনসিপি সমর্থকদের কনটেন্টে। বিএনপি ও বামপন্থী পোস্টে তাদের তৎপরতা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। তাদের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিলেন ঢাকার একজন এনসিপি প্রার্থী এবং প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই নারীনেত্রী।
সবচেয়ে ছোট বিএনপিপন্থী ক্লাস্টারটিই ছিল সবচেয়ে কম সক্রিয়। তারা জামায়াতপন্থী পোস্টে ৫৫ বার এবং এনসিপিপন্থী পোস্টে ৩০ বার আক্রমণ চালিয়েছে।
রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও সব ক্লাস্টারের একটি অভিন্ন লক্ষ্য ছিল—গণমাধ্যম।
প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার এবং নিউ এজের পোস্টগুলো নিয়মিতভাবে 'হাহা' হামলার মুখে পড়েছে।
জামায়াতপন্থী ক্লাস্টারগুলো গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৫১৫ বার আক্রমণ চালিয়েছে, যা তাদের মিডিয়াবিরোধী তৎপরতায় শীর্ষে রেখেছে। আওয়ামী লীগপন্থী ক্লাস্টারের আক্রমণের সংখ্যা ছিল ২৮৭ বার, আর বিএনপি ক্লাস্টারের ক্ষেত্রে তা ছিল মাত্র ৫ বার।
তবে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ও ধারাবাহিক হয়রানি এসেছে একটি পৃথক ডানপন্থী ক্লাস্টার থেকে। ২৩৪টি প্রোফাইল নিয়ে গঠিত এই গোষ্ঠীর কোনো সুস্পষ্ট দলীয় পরিচয় নেই। তারা সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত কনটেন্টে ৯৭০ বার আক্রমণ চালিয়েছে, যা জামায়াতপন্থী সবচেয়ে সক্রিয় রাজনৈতিক ক্লাস্টারগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
এই ডানপন্থী ক্লাস্টারটি আদর্শিকভাবে স্পষ্ট অবস্থানও দেখিয়েছে। তারা বামপন্থী পোস্টে ৭৬১ বার, বিএনপিপন্থী পোস্টে ৪৮৮ বার এবং আওয়ামী লীগপন্থী পোস্টে ১১১ বার আক্রমণ চালিয়েছে।
বট বাজার
এই অনুসন্ধানে ফেসবুকের এমন একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে একাধিক পেজ প্রকাশ্যেই রিচ, রিঅ্যাকশন ও ফলোয়ার বাড়ানোর সেবা বিক্রি করছে।
দ্য ডেইলি স্টার সম্ভাব্য ক্রেতা সেজে এমন চারটি ক্লিক ফার্ম—সোশিফাই, ফিনিক্স আইটি, টেক ড্রিমস এবং ফিনিক্স আইটি বুস্টিং-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাদের সেবা যাচাই করতে পাঁচটি ডামি ফেসবুক পেজ খোলা হয় এবং সেখান থেকে দেওয়া মিম পোস্টে রিঅ্যাকশন কেনা হয়।
পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল খুবই সহজ। তারা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া দেয় এবং আমরা কারা, কেন রিঅ্যাকশন কিনছি বা এগুলো কী কাজে ব্যবহার হবে—এসব বিষয়ে কোনো প্রশ্নই করেনি। ১৯ থেকে ২১ জানুয়ারির মধ্যে অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে তৈরি করা নয়টি পোস্টে মোট ৩০ হাজার 'লাভ' ও 'হাহা' রিঅ্যাকশন কেনা হয়।
সোশিফাই-এর মালিক নাঈম উদ্দিন বলেন, আমাদের এমন লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, যাদের কাছে ফেসবুক প্রোফাইলের 'সার্ভার' বা বড় সংগ্রহ রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এমন সার্ভার পরিচালনা করেন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ জন।
তিনি বলেন, এসব সার্ভার মালিক দেশীয় ফেসবুক অ্যাকাউন্ট কিনে থাকেন প্রতিটি ১৫-১৬ টাকায়, আর বিদেশি প্রোফাইল তুলনামূলকভাবে আরও সস্তা।
আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে তারা থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের সার্ভারের ওপর নির্ভর করেন।
তিনি বলেন, যে পোস্টে রিঅ্যাকশন দরকার, আমি শুধু লিংকটা সার্ভার থাকা লোকের কাছে পাঠিয়ে দিই। বাকিটা তারা নিজেরাই করে।
এনগেজমেন্ট কেনার খরচও খুব কম। সাধারণত প্রতি হাজার রিঅ্যাকশনের দাম ১২০ থেকে ২০০ টাকা। বড় অর্ডার দিলে দাম আরও কমে যায়, আমাদের ক্ষেত্রে ৫ হাজার রিঅ্যাকশন পাওয়া গেছে ৫০০ টাকায়।
বিদেশি নামধারী প্রোফাইল থেকে আসা রিঅ্যাকশন প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে যায়। আমাদের অভিজ্ঞতায়, এক মিনিটেই এসেছে প্রায় এক হাজার এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পাঁচ হাজার রিঅ্যাকশন।
এর বিপরীতে দেশি নামের প্রোফাইল থেকে রিঅ্যাকশন আসতে সময় বেশি লাগে এবং দামও তুলনামূলকভাবে বেশি।
এই 'দেশীয়' রিঅ্যাকশনগুলোর দাম সাধারণত প্রতি হাজারে ২০০ টাকার বেশি এবং পৌঁছাতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে। তবে অতিরিক্ত টাকা দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ডেলিভারি সম্ভব।
আন্তর্জাতিক প্রোফাইল থেকে রিঅ্যাকশন প্রায়ই ধারাবাহিক ও নির্বিঘ্নে আসে। কিন্তু 'বাংলাদেশি' প্রোফাইলের রিঅ্যাকশন অনেক সময় খণ্ড খণ্ডভাবে পৌঁছে। কখনও ১২ ঘণ্টার মধ্যে ধীরে ধীরে আসে, আবার কখনও ১৫-২০ মিনিট পরপর অনিয়মিত বড় ঢেউয়ের মতো হাজির হয়। এর মূল কারণ হলো সেবাদাতারা দেশীয় অ্যাকাউন্টগুলো তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখতে সমস্যায় পড়েন।
এই বট অ্যাকাউন্টগুলোর অনেকের প্রোফাইল ছবি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি, আর ব্যক্তিগত তথ্য প্রায় থাকে না। তবে দ্য ডেইলি স্টার যখন 'খাঁটি বাংলাদেশি' প্রোফাইল চেয়েছে, তখন ডেলিভারির গতি ধীর হয়ে গেছে। এসব অ্যাকাউন্ট তুলনামূলকভাবে বেশি পরিশীলিত। এদের টাইমলাইনে পোস্ট আছে, একাধিক ছবি আছে এবং আচরণে তাদের বাস্তব ব্যবহারকারীর মতোই মনে হয়।
একজন বিক্রেতা বলেন, বাংলাদেশি সার্ভিস একটু ধীর, কারণ এগুলো অর্গানিক। আরেকজন বলেন, বাংলাদেশি বট ব্যবহার করাই ভালো, কারণ এগুলো কম 'ড্রপ' হয়।
'ড্রপ' বলতে বোঝানো হয়, মেটা যদি ভুয়া প্রোফাইল শনাক্ত করে তা মুছে দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট রিঅ্যাকশনও হঠাৎ উধাও হয়ে যায়।
দেখতে আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান মনে হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে চারটি ক্লিক ফার্মই মূলত একই বট প্রোফাইলের পুল ব্যবহার করে সেবা দিচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বাণিজ্যিক এনগেজমেন্ট সেবার সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে চালানো দলবদ্ধ ডিজিটাল আক্রমণের সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
আমাদের মিম পোস্টে ব্যবহৃত অন্তত ৩৫৪টি বট প্রোফাইল আবার সেই ২৬৩টি রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম-সংক্রান্ত পোস্টেও 'হাহা' রিঅ্যাকশন দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রার্থীদের জন্যও বট
এই অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অন্তত ৫৪৭টি বট অ্যাকাউন্ট ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছয়জন প্রার্থীর ফেসবুক পেজে সক্রিয়।
এর মধ্যে বিএনপির দুজন, জামায়াতের দুজন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন।
বিএনপির দুই প্রার্থী (ঢাকা ও বরগুনা) মিলিয়ে ৬ হাজার ৯৮টি বট ফলোয়ার পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৩৫৬টি বট ওই ক্লিক ফার্মের পেজ থেকে এসেছে, যেখান থেকে দ্য ডেইলি স্টার আমাদের মিম পোস্টের জন্য ভুয়া এনগেজমেন্ট কিনেছিল।
জামায়াতের দুই প্রার্থী (বরগুনা ও কুমিল্লা) আরও বড় বট ফলোয়ারের সংখ্যা দেখাচ্ছে, ৫ হাজার ৩১২টি। এর মধ্যে অন্তত ১৩৫টি বট সরাসরি সেই একই বিক্রেতার পেজ থেকে এসেছে, যারা আমাদের জন্য ভুয়া এনগেজমেন্ট সরবরাহ করেছে।
একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী এবং একজন জয়পুরহাটের স্বতন্ত্র প্রার্থীও বট ফলোয়ার ব্যবহার করছেন। এটি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ নির্বিশেষে মিথ্যা জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও একই বট ফলোয়ার শেয়ার করছে। এটি বোঝায় যে এসব বট আদর্শগত সমর্থক নয়, বরং যে কেউ অর্থ দিয়ে ব্যবহার করতে পারবে এমন ডিজিটাল সম্পদ।
সোশিফাই-এর মালিক নাঈম উদ্দিন এসব প্যাটার্ন সম্পর্কে অভ্যস্ত। তিনি বলেন, আমি নোয়াখালী ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। প্রার্থীরা নিয়মিতভাবে এনগেজমেন্ট সার্ভিস কেনেন। তবে তিনি কোনো নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমার কাছে একজন আওয়ামী লীগ প্রার্থী এসেছেন এবং একটি পোস্টের জন্য 'হাহা' রিঅ্যাকশন কিনেছেন। আবার ওই একই পোস্টের জন্য অন্য একজন বিএনপি প্রার্থী 'লাভ' রিঅ্যাকশন কিনেছেন। এটা এমন একটা বাজার, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা একই বট পুল থেকে রিঅ্যাকশন নেন।
এই অনুসন্ধানটি সব প্রার্থীর বট ফলোয়ার যাচাই করেনি। শুধু সেই প্রার্থীদের পরীক্ষা করা হয়েছে, যারা আমাদের তৈরি নয়টি মিম পোস্টের জন্য একই ক্লিক ফার্মের বট ব্যবহার করেছেন।
ছয় প্রার্থীর মধ্যে তিনজন ফোন বা ম্যাসেজের কোনো জবাব দেননি। বাকি তিনজন জানিয়েছেন যে, তারা তাদের পেজে কোনো বট কার্যক্রমের কথা জানেন না এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো পার্টি সমর্থক বা আত্মীয়রা পরিচালনা করেন।
একই সার্ভার, সবার জন্য
টেক ড্রিমের উদ্যোক্তা শাহরিয়ার ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে ভুয়া এনগেজমেন্ট বিক্রি করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কেন এতগুলো রাজনৈতিক পেজে একই বট প্রোফাইল দেখা যায়। তিনি বলেন, আমরা সবাই একই সার্ভার ব্যবহার করি।
টেক ড্রিম তাদের সেবা সম্পর্কে ফেসবুকে প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন দেয় এবং বর্তমানে সাতটি বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে যেখানে এনগেজমেন্ট বৃদ্ধির প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে।
শাহরিয়ার ও অন্যান্যরা যে সার্ভারের ওপর নির্ভর করেন, তার একটি হলো ফাদারপ্যানেল ডটকম। এটি একটি অনলাইন ক্লিক ফার্ম। এখানে 'বাংলাদেশি' ফেসবুক রিঅ্যাকশন যেমন 'হাহা' ও 'লাভ' প্রতি হাজারে এক টাকারও কমে পাওয়া যায়। ডেলিভারি সময় ১৫ থেকে ৪৯ ঘণ্টার মধ্যে।
এছাড়া এখানে বিভিন্ন ধরনের বট প্রোফাইল আছে। যেমন—১০০% বাংলাদেশি, বিডিপ্লাসমিক্সড, আরব এবং ভিয়েতনাম। এখানে বাংলাদেশি লেবেলযুক্ত প্রোফাইলের দাম সবচেয়ে বেশি। পেমেন্ট করা যায় বিকাশ, নগদ, উপায় এবং অন্যান্য মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমে।
ফার্মের মালিক সাইফুল ইসলাম সামি বলেন, বিদেশি বট তিনি ভিয়েতনাম, পাকিস্তান এবং অন্যান্য দেশের সার্ভার থেকে সংগ্রহ করেন। তিনি মূলত তাদের রিসেলার।
দেশীয় বটের জন্য তিনি স্থানীয় সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল, যারা ফেসবুক প্রোফাইলের সংগ্রহ সংরক্ষণ করে রাখে।
তিনি বলেন, আমি কেবল সার্ভিস দেই। মানুষ কীভাবে ব্যবহার করবে, তা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। রাজনৈতিক ব্যবহারের ওপরও আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
পদ্ধতি
এইসব ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত। নেওয়া হয়েছে পাবলিক পোস্ট থেকে, যেগুলোতে যথেষ্ট রিঅ্যাকশন পাওয়া গেছে।
২৬৩টি পোস্টের রিঅ্যাকশন বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক ক্লাস্টার চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে একরকম কার্যক্রম দেখানো প্রোফাইলগুলো একই ক্লাস্টারে রাখা হয়েছে।
পোস্টগুলো রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে সমানভাবে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি পোস্টে কত প্রোফাইল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তা জানার সুযোগ রাখা হয়নি। এর ফলে রিঅ্যাকশনের ঘনত্ব নির্বাচনের কারণে নয়, বরং ডিজিটাল হামলার প্রকৃত প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
২৬৩টি পোস্টে 'হাহা' রিঅ্যাকশন এবং সমর্থক রিঅ্যাকশন দুটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মোট প্রায় পাঁচ লাখ রিঅ্যাকশন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপটি সমর্থন নির্ধারণের জন্য করা হয়েছে। ১১০টি পোস্টে 'লাভ' রিঅ্যাকশন বিশ্লেষণ করে ব্যবহারকারীর রাজনৈতিক শিবির নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব পোস্টে সাধারণত বিপরীতমুখী বক্তব্য, বিভাজনমূলক বর্ণনা বা সরাসরি ভুল তথ্য ছিল।
'হাহা' রিঅ্যাকশন নথিভুক্ত করার জন্য কোনো ব্যঙ্গাত্মক বা হাস্যরসাত্মক পোস্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বরং নিরপেক্ষ বা তথ্যভিত্তিক পোস্টকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যাতে 'হাহা' প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে দমন বা উপহাস হিসেবে বোঝা যায়। এই উদ্দেশ্যে ১৫৩টি পোস্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রোফাইলগুলোকে তখনই রাজনৈতিক ক্লাস্টারে রাখা হয়েছে, যখন তারা নিজেদের শিবিরের পোস্টে প্রকাশ্য সমর্থন দেখায় ও একই সঙ্গে অন্তত সাতটি বিরোধী শিবিরের পোস্টে একসাথে 'হাহা' রিঅ্যাকশন দেয়।
(রিপোর্টিং ও গবেষণা: জায়মা ইসলাম, মীর রওনক, নওরীন সুলতানা তমা, আব্দুল্লাহ হেল বুবুন, তারেক হোসেন এবং আবীর অয়ন)