একটি পুতুল, একটুখানি কল্পনা ও মিরাবেলের পৃথিবী
শিশুর চাওয়া-পাওয়ার হিসাব বড় অদ্ভুত। বড়দের কাছে যে জিনিসটি একেবারেই সাধারণ, শিশুর কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি পুতুল, একটি খেলনা, একটি লাল ফিতা কিংবা জানালার বাইরে দেখা কোনো অচেনা দৃশ্য—এসব নিয়েই শিশুর মনে তৈরি হতে পারে বিশাল এক কল্পনার জগৎ।
শিশুদের এই জগতের কথা খুব ভালো করেই জানতেন বিখ্যাত সুইডিশ লেখক অস্ট্রিড লিন্ডগ্রেন। তার গল্প পড়লে মনে হয়, তিনি কেবল শিশুদের জন্য গল্প লিখছেন না; বরং আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন তাদের কল্পনার জগতে।
‘মিরাবেল’ তেমনই এক আশ্চর্য গল্প।
গল্পের শুরুতে খুব বেশি হৈচৈ নেই। নেই রাজা-রানি, ড্রাগন কিংবা তলোয়ারের ঝনঝনানি। আছে একটি ছোট্ট মেয়ে, তার একটি ইচ্ছা ও সেই ইচ্ছাকে ঘিরে তৈরি হতে থাকা এক আশ্চর্য পৃথিবী।
লিন্ডগ্রেন জানেন, শিশুর কল্পনাকে একটু জায়গা দিলেই সেখান থেকে জন্ম নিতে পারে দারুণ একটি গল্প। মিরাবেলে এ ঠিক সেটিই ঘটে। একটি ছোট্ট মেয়ের জীবনে এমন এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে, যা তার চেনা পৃথিবীটাকেই বদলে দেয়। আর তখন পাঠকের মনেও প্রশ্ন জাগে, এ কি সত্যিই ঘটছে? নাকি সবই মিরাবেলের কল্পনা?
গল্পটির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এটি শিশুদের সামনে কোনো উপদেশের ডালি নিয়ে হাজির হয় না। লেখক কোথাও বলে দেন না, ‘এই গল্প থেকে তোমাদের এই শিক্ষা নিতে হবে।’ তিনি কেবল গল্প বলেন। আর সেই গল্পের ভেতর দিয়েই শিশুর মনে ঢুকে যায় আনন্দ, মায়া, বিস্ময় ও ভালো লাগা।
ভালো শিশুসাহিত্য বোধ হয় এমনই হয়। সেখানে শিশুর ইচ্ছাকে ছোট করে দেখা হয় না, তার ভয়কে নিয়ে হাসাহাসি করা হয় না, তার কল্পনাকেও বলা হয় না, ‘এসব অসম্ভব!’
শৈশবের একটি মজার ক্ষমতা আছে। শিশুরা জড় জিনিসকেও প্রাণ দিতে পারে। একটি পুতুল তখন আর কেবল পুতুল থাকে না; হয়ে ওঠে বন্ধু। তার সঙ্গে কথা বলা যায়, খেলা করা যায়, রাগ-অভিমান করা যায়। কখনো কখনো সেই পুতুলই হয়ে ওঠে শিশুর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী।
মিরাবেল একটি পিকচারবুক। তাই বইটির ছবিও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লেখার সঙ্গে রঙিন অলঙ্করণ মিলেমিশে তৈরি করেছে গল্পের আরেকটি জগৎ। ছবিগুলোও যেন নিজের মতো করে গল্প বলে।
শিশুদের বইয়ে ছবির গুরুত্ব এখানেই। শিশুরা কেবল শব্দ পড়ে গল্প বোঝে না, অনেক সময় ছবি দেখেও গল্প বুঝতে শেখে। একটি চরিত্রের মুখের হাসি, চোখের চাহনি কিংবা ছবির এক কোণে ঘটে যাওয়া ছোট্ট কোনো ঘটনা দেখে তারা নিজের মতো করে গল্প ভাবতে পারে। মিরাবেলের অলঙ্করণ তাই বইটির আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিদেশি শিশুসাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করা সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে শিশুদের গল্পের ভাষা হতে হয় সহজ, সাবলীল ও স্বাভাবিক। অথচ সহজ ভাষা তৈরি করাই অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন। মাজহার জীবনের অনুবাদে মিরাবেলকে খুব দূরের কোনো বিদেশি গল্প বলে মনে হয় না। ভাষার স্বাভাবিকতা গল্পটিকে বাংলা পাঠকের কাছেও আপন করে তুলেছে।
অস্ট্রিড লিন্ডগ্রেনের লেখা মিরাবেলের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছে গপ্পোসপ্পো পাবলিকেশন্স।
এই বইয়ের মিরাবেল কেবল গল্পের একটি চরিত্র নয়। সে যেন শৈশবের একটি দরজা। সেই দরজা দিয়ে ঢুকলে দেখা যায়, একটি ছোট্ট ইচ্ছাও কত বড় হতে পারে, একটি পুতুলও কতটা আপন হয়ে উঠতে পারে, আর একটি শিশুর কল্পনা কত সহজেই তার নিজের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী তৈরি করে নিতে পারে।
এই কারণেই ‘মিরাবেল’ পড়তে ভালো লাগে। বইটি পড়তে পড়তে শিশুরা হয়তো মনে মনে বলবে, ‘আহা! এমন কিছু যদি আমার সঙ্গেও ঘটত!’