ছাত্রীদের জন্য সান্ধ্য আইন, ছাত্রদের জন্য স্বাধীনতা
দিনাজপুর থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন কাসিরাহ সুলতানার মা। উদ্দেশ্য ছিল প্রিয় খাবার রান্না করে মেয়েকে চমকে দেওয়া। কিন্তু যখন তিনি রোকেয়া হলের সামনে পৌঁছালেন, তখন ঘড়িতে রাত ১০টা ৫৮ মিনিট। হল গেট বন্ধ হয়েছে আরও প্রায় এক ঘণ্টা আগে। নিয়মের বেড়াজালে তাকে হলের ভেতর ঢুকতে দেওয়া হয়নি, এমনকি হলের আবাসিক শিক্ষার্থী কাসিরাহকেও মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ঠিক একই সময়ে, পাশের একটি ছাত্র হলের এক শিক্ষার্থী নিশ্চিন্তে ক্যাম্পাসে রাতের হাঁটাহাঁটি করতে বের হচ্ছিলেন। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হলে প্রবেশ বা বের হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই।
এই চরম বৈপরীত্য আসলে আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সাধারণ চিত্র। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীদের ওপর ছাত্রদের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে কেবল তাদের চলাফেরাই সীমিত হচ্ছে না, বরং ব্যাহত হচ্ছে তাদের পার্ট-টাইম কাজ, ক্যাম্পাস জীবন ও সামাজিক যোগাযোগ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের হলে ফেরার প্রাতিষ্ঠানিক সময় রাত ১০টা (যা অনানুষ্ঠানিকভাবে বড়জোর ১১টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়)। তবে অন্যান্য অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সময়সীমা আরও কঠোর। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের রাত ৮টা বা ৯টার মধ্যে হলে ফিরতে হয়। এর ব্যতিক্রম হলে সতর্কতা থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ২০ জনেরও বেশি ছাত্রীর সাক্ষাৎকার নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রদের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম না থাকলেও ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো অত্যন্ত কড়াকড়ি ও অসমভাবে প্রয়োগ করা হয়।
ঝুঁকিতে উপার্জন
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই টিউশনি বা পার্ট-টাইম চাকরি জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু হলের এই কঠোর সান্ধ্য আইনের কারণে ছাত্রীদের পক্ষে এসব কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আফরিন জানান, বেশিরভাগ টিউশনির সময় থাকে বিকেলে বা সন্ধ্যায়, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ হতেই বিকেল ৪টা বা ৫টা বেজে যায়। কিন্তু শহরের যানজট ঠেলে রাত ৮টা বা ৯টার ডেডলাইনের মধ্যে হলে ফেরা অনেক সময়ই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, ঠিক সময়ে হলে ফিরতে না পারার কারণে আমার বেশ কয়েকজন বন্ধুকে টিউশনি ছেড়ে দিতে হয়েছে।
টাঙ্গাইলের মাভাবিপ্রবির ছাত্রীরাও একই সমস্যার কথা জানান। ফজিলাতুন্নেসা জোহা হলের আবাসিক ছাত্রী লিজা বলেন, টিউশনি করতে শহরে যাতায়াত করতেই অনেক সময় চলে যায়, ফলে নির্ধারিত সময়ে হলে ফেরাটা একরকম যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও যোগ করেন, যাদের ক্লাস বিকেলে শেষ হয়, তারা ডেডলাইনের মধ্যে ফিরতে রীতিমতো হিমশিম খায়।
নেহা নামের আরেক শিক্ষার্থী জানান, দেরিতে ঢোকার অনুমতির জন্য হল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও অনেক সময় কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। ফলে ছাত্রীদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
এই বিধিনিষেধের কারণে অনেককে ভালো চাকরির সুযোগও হাতছাড়া করতে হয়েছে। কাসিরা জানান, একটি ফ্যাশন হাউজে কাজের সুযোগ পেয়েও তাকে তা ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল। কারণ সেখানে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো, যা তার পক্ষে হলে ফেরার সময়ের সঙ্গে মেলানো সম্ভব ছিল না।
সংকুচিত হয়ে গেছে ক্যাম্পাস জীবন
উপার্জন ছাড়াও ছাত্রীদের দাবি—এই ব্যবস্থা তাদের সাধারণ ক্যাম্পাস জীবনকে সংকুচিত করে তুলছে।
এমনকি সাধারণ কোনো প্রয়োজনেও ছাত্রীদের অন্য মেয়েদের হলে ঢুকতে দেওয়া হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাবেক সভাপতি নুজিয়া হাসিন রাশা এই নীতিকে ‘বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ছাত্রদের ক্ষেত্রে এমন কোনো নিয়ম নেই। এই নিয়মগুলো ছাত্রীদের একা করে তুলছে এবং তাদের সামাজিক ও একাডেমিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এর প্রভাব পড়ছে সহশিক্ষা কার্যকলাপেও। শাবিপ্রবির ছাত্রী রুমা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হলের কড়াকড়ি বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ক্লাব ও ক্যাম্পাসের অনুষ্ঠানে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ অনেক কমে গেছে।
তিনি বলেন, অনুষ্ঠানগুলো প্রায়ই সন্ধ্যায় শুরু হয়। আর ঠিক সময়ে হলে ফিরতে পারবে না বলে অনেকেই এখন আর অংশ নিতে চায় না।
দেরিতে ফেরার জন্য আগে থেকে অনুমতি নেওয়ার এই প্রক্রিয়াটিকে অবাস্তব বলে মনে করেন ঢাবির কবি সুফিয়া কামাল হলের সায়মা আজম মৃদুলার মতো অনেক ছাত্রী। তাদের মতে, জরুরি পরিস্থিতি বা রাস্তায় জ্যামের মতো আকস্মিক বিষয়গুলো আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়।
নিরাপত্তার অজুহাত
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য বরাবরের মতোই এই বিধিনিষেধকে নিরাপত্তার খাতিরে প্রয়োজনীয় বলে ডিফেন্ড করছে।
ঢাবির কবি সুফিয়া কামাল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সালমা নাসরিন বলেন, বর্তমান সময়সীমা বাড়ানোর তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। তার ভাষ্যমতে, আমাদের ব্যবস্থায় কিছুটা নমনীয়তা রয়েছে, বিশেষ ক্ষেত্রে দেরিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। ডেডলাইন আরও বাড়ালে ছাত্রীরা হয়তো আরও দেরিতে ফিরতে শুরু করবে।
রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক হোসনে আরা বেগমও নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সামাজিক পরিবেশের কথা বিবেচনা করলে গভীর রাতে আমরা ছাত্রীদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারি না। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সময় বাড়ানো সমীচীন হবে না। তবে জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয় অভিভাবক এসে নিয়ম অনুযায়ী ছাত্রীকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন বলে তিনি জানান।
খুবি’র অপরাজিতা হলের সহকারী প্রাধ্যক্ষ শেখ ফাইজান বিন হালিম ও শাবিপ্রবি’র সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ সাবিহা আফরিন বেগম জানান, রাতে হলে ফেরার এই নিয়মটি মূলত ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই। তবে তারা বিশেষ ক্ষেত্রে দেরিতে প্রবেশের অনুমতি দেন এবং দেরিতে ফেরার কারণে ছাত্রীদের চরিত্র নিয়ে কোনো কটূক্তি করা হয় না।
আচরণের ওপর নজরদারি ও নীতিপুলিশি
তবে ছাত্রীদের অভিযোগ, এই নিয়ম প্রয়োগের নামে প্রায়ই নিরাপত্তার সীমানা পেরিয়ে ব্যক্তিগত নজরদারি ও নীতিপুলিশি করা হয়।
শাবিপ্রবির সাবেক শিক্ষার্থী সামিরা ফারজানা বলেন, হল কর্তৃপক্ষ অনেক সময় ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলতেন—ভালো মেয়েরা এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে না।
রুমা জানান, আরও আপত্তিকর মন্তব্যও শুনতে হয় তাদের। একজন প্রাধ্যক্ষ নাকি ছাত্রীদের বলেছিলেন, তোমরা মাঝরাতে বাইরে কী করো, তা আমাদের জানা আছে।
খুবি ও মাভাবিপ্রবির ছাত্রীরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই ধরনের মন্তব্য তাদের অপমানিত বোধ করায় এবং হলে থাকার মানসিকতা নষ্ট করে। বাড়তি আর্থিক চাপ থাকা সত্ত্বেও অনেক ছাত্রী হলের এই পরিবেশ এড়াতে বাইরে মেস বা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রীদের দাবি একটাই—তাদের একাডেমিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে আরও নমনীয় ও সমতার নীতি তৈরি করা হোক। বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে দেরিতে প্রবেশের প্রক্রিয়াটি যেন আরও সহজ করা হয়।
কর্তৃপক্ষের দাবি, এই নিয়মগুলো কেবলই ‘নিরাপত্তা’র জন্য। কিন্তু ছাত্রীদের ভাষায়—এই তথাকথিত নিরাপত্তার মূল্য তাদের শোধ করতে হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি, ক্যাম্পাস জীবনের আনন্দ বিসর্জন ও নিজেদের স্বাধীনতাহীনতার মধ্য দিয়ে।
(সাক্ষাৎকারদাতাদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে সায়মা আজম মৃদুলা, সামিরা ফারজানা, কাসিরাহ সুলতানা ও ছাত্রনেতা নুজিয়া হাসিন রাশা নিজ নামেই বক্তব্য দিয়েছেন।)