জুলাই অভ্যুত্থানকালে হামলা

জাবির ১২ শিক্ষক-কর্মকর্তার শাস্তি, প্রহসনের বিচার বলছে ছাত্র সংগঠনগুলো

নিজস্ব সংবাদদাতা, জাবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় মদদ দেওয়ার অভিযোগে ১৯ শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর; নয় শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে পদাবনতি ও বেতন অবনমন; দুই শিক্ষককে সতর্ক করা এবং সাতজন শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তৎকালীন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও কোষাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান গণমাধ্যমকর্মীদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

এর আগে গতকাল বিকেল ৪টা থেকে আজ ভোর পৌনে ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে টানা প্রায় ১৩ ঘণ্টাব্যাপী সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসরাফিল আহমেদ রঙ্গন, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. আলমগীর কবির, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান, একই বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদ, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাজউদ্দিন শিকদার, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের প্রভাষক কানন কুমার সেনের বেতন নিম্নধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে।

কয়েকজনের ক্ষেত্রে আগামী পাঁচ বছর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং শর্ত পূরণ সাপেক্ষে দুই বছর পর পদোন্নতির আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এছাড়া, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে প্রভাষক পদে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে। শর্ত সাপেক্ষে তারাও দুই বছর পর পদোন্নতির আবেদন করতে পারবেন।

ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ মামুনকে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি ড. এ মামুনকে আগামী পাঁচ বছর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

অন্যদিকে আইবিএ-জেইউর সহকারী অধ্যাপক পলাশ সাহা, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জহিরুল ইসলাম খন্দকার, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ছায়েদুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মনির উদ্দিন শিকদার, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার খসরু পারভেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার রাজীব চক্রবর্তীকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

সিন্ডিকেট সভা শেষে কামরুল আহসান বলেন, ‘২০২৫ সালের ১৭ মার্চ গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দীর্ঘ আলোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পান, এবং কোনো অপরাধী যেন পার পেয়ে না যান, বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত কমিটির ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট স্ট্রাকচার কমিটি গঠন করেছিল, এবং সেখানে ১৯ জন শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেই কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করেই আজকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।’

উপাচার্য আরও বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও কোষাধ্যক্ষের ভূমিকাও উঠে এসেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে তখন কোনো স্ট্রাকচার কমিটি গঠন করা হয়নি। তাই সিন্ডিকেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া

জাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি অদ্রি অঙ্কুর বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় মদদদাতা শিক্ষকদের বিচারের নামে গতকালের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। সে সময় প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের মধ্যে শুধু প্রো-ভিসি (শিক্ষা) সম্পর্কে সিদ্ধান্ত এসেছে। ভিসি, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) ও ট্রেজারারের ক্ষেত্রে নতুন করে স্ট্রাকচার কমিটি গঠন ছাড়া আর কোনো সিদ্ধান্ত আমরা দেখিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তৎকালীন প্রক্টর আলমগীর কবিরের ক্ষেত্রে কেবল বেতন গ্রেড কমানো এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নিয়ে জুলাইয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মশকরা করা হয়েছে। অভিযুক্ত অন্যান্য শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সতর্ক করা, বেতন গ্রেড কমানো, প্রশাসনিক দায়িত্বে নিষেধাজ্ঞা ও পদাবনতির মতো সিদ্ধান্ত জুলাইয়ের স্পিরিটের প্রতি বেঈমানি।’

জাকসুর জিএস ও জাবি ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই হামলায় অভিযুক্ত জাবি শিক্ষকদের বিচারের নামে প্রহসন করেছে প্রশাসন। উনারা সাপও মারলেন না, লাঠিও ভাঙলেন না। শিক্ষকদের বিচার যেন শিক্ষকরা কখনো করতেই পারেন না।’

‘আমরা প্রশাসনের এই রায়কে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি,’ যোগ করেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশক্তির সভাপতি জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা আসলে শিক্ষকদের বিচার করতে চান না। গণঅভ্যুত্থানের ২০ মাস পর জুলাই হামলায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিচারের রায়ে প্রশাসন আবারও সেটিই প্রমাণ করল।’

এ বিষয়ে জাবি ছাত্রদলের সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক বলেন, ‘ছাত্রদল রায়টি আরও পর্যালোচনা করে পরে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে।’