সাগর-মহাদেশ পাড়ি দিয়ে কেন নতুন ঠিকানার খোঁজে প্রজাপতি

দুলি মল্লিক
দুলি মল্লিক

কমলা রঙের পাখায় ভর করে নিজ জন্মভূমির গণ্ডি ছাড়িয়ে হাজার কিলোমিটার দূরে অন্য এক মহাদেশে পাড়ি জমিয়েছে একদল প্রজাপতি। সাদা-কালো রঙে চমৎকার আলপনা আঁকা রঙিন পাখায় বাংলাদেশে রঙ্গন ফুল, হলুদ গাঁদা, চন্দ্র মল্লিকা কিংবা বেলী ফুলে ঘুরে ঘুরে মধু আহরণ করে তারা। তবে, তাদেরই একটি দল পাড়ি জমিয়েছে সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়। এখন সেখানে কোনো বুনো ফুল কিংবা সূর্যমুখী ফুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

অস্ট্রেলীয় প্রজাপতি বিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল ব্র্যাবি এই প্রজাপতিকে প্রথম দেখে বলেছিলেন, ‘ওরা যখন উড়ে, তখন সূর্যের আলো পাখায় প্রতিফলিত হয়, মনে হয় যেন জ্বলন্ত আগুনের শিখা উড়ছে।’

প্রজাপতিটির নাম টাউনি কোস্টার। বাংলাদেশে এটি ‘হরিণছড়া’ নামে পরিচিত।

টাউনি কোস্টারের আদি নিবাস বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কায়। দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রজাপতিটি ২০১২ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় দেখা যায়। তবে এই পথ সরাসরি অস্ট্রেলিয়ায় ছিল না, এর মাঝে আরও অনেক দেশ ঘুরেছে টাউনি কোস্টার।

প্রায় ৩০ বছরের এই ভ্রমণে থাইল্যান্ড, নেপাল, মালয় উপদ্বীপ, পাকিস্তান, ভুটান, ভিয়েতনাম, চীন, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ হয়ে তিমুর সাগর পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছে এই রঙিন প্রজাপতি।

ড. মাইকেল ব্র্যাবির কাছে বিষয়টা খুব চমকপ্রদ মনে হয়েছে। সংবাদ মাধ্যম এবিসিকে তিনি বলেন, ‘তিমুর সাগর পাড়ি দিতে প্রজাপতিটিকে ৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ উড়তে হয়েছে। প্রজাপতিটি সত্যিই প্রাণশক্তিকে ভরপুর।’

ড. মাইকেল ব্র্যাবি ও অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যাওয়া টাউনি কোস্টার। ছবি: সংগৃহীত

অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর পর এর বিস্তার ছিল দ্রুত। ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক একাডেমিক জার্নাল ‘কনজারভেশন বায়োলজি’তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার এলাকায় বিস্তার করেছে টাউনি কোস্টার।

সম্প্রতি ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রজাপতির বিচরণক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন’ শিরোনামে ন্যাচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভ্যুলিউশন পত্রিকায় প্রকাশিত ২০২৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ১০৫টি দেশের ছয় হাজার ১৮২টি প্রজাপতি রেঞ্জ-শিফট বা অবস্থান বদলেছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ নতুন এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে এবং ২২ শতাংশ প্রজাতি আরও উঁচু এলাকায় সরে গেছে।

এক হাজার ৭৫৮টি প্রজাতির প্রজাপতি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই গবেষণায়।

ছবি:এআইয়ের সহায়তায় তৈরি

গবেষকদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতির আয়ু সাধারণত মাত্র ৭ থেকে ১০ দিন, সর্বোচ্চ ১৫ দিন হয়ে থাকে। এ ছাড়া আকারে ছোট এবং পাখাগুলোও নাজুক।

তাহলে প্রশ্ন উঠে, এমন নাজুক একটি প্রজাপতি কীভাবে এত অল্প সময়ে হাজারো কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রজাপতি পার্ক ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘একটি প্রজাপতির পক্ষে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব না। তাই তারা এই দীর্ঘ যাত্রা সম্পন্ন করতে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম ব্যবহার করে।’

প্রজাপতি যেভাবে দূরের কোন স্থানে যায়। ছবি: এআইয়ের সহায়তায় তৈরি

বহু প্রজন্মের পর্যায়ক্রমিক সফর

ড. মনোয়ার হোসেন জানান, পথিমধ্যে বিভিন্ন উপযুক্ত স্থানে থামে, ডিম পাড়ে এবং মারা যায় প্রজাপতি। সেই ডিম ফুটে বের হওয়া পরবর্তী প্রজন্মের প্রজাপতিরা আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করে। এভাবেই প্রজাপতিরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার কিলোমিটার দূরের গন্তব্যে পৌঁছায়।

এখন প্রশ্ন উঠে, একটি প্রজন্ম কীভাবে মারা যাওয়ার পর ডিম অবস্থায় থাকা নতুন প্রজন্মের কাছে এই অবস্থান পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেন?

জেনেটিক্যাল প্রি-প্রোগ্রামিং

ড. মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রজাপতিদের জিনে বা ডিএনএতে ভ্রমণের পথ, দিক এবং কোথায় গিয়ে থামতে হবে, তার সম্পূর্ণ দিকনির্দেশনা আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা থাকে। তাদের প্রতিটি প্রজন্ম এই তথ্য পরবর্তী প্রজন্মের জিনের মধ্যে মেমোরি বা স্মৃতি হিসেবে রেখে যায়। নতুন প্রজন্ম সেই তথ্য ডিকোড করে পথ চিনে এগিয়ে চলে।’

তবে প্রশ্ন এখনো শেষ হয়নি—এই ছোট ও নাজুক প্রজাপতি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মতে শক্তি কোথা থেকে পায়?

সৌরশক্তি সংগ্রহ ও রূপান্তর

ড. মো. মনোয়ার হোসেন জানান, প্রজাপতির পাখায় বিশেষ এক ধরনের শক্তি রয়েছে। তারা সূর্যের আলো বা ফোটন কণা নিজেদের ডানায় আটকে রাখতে পারে এবং তা ইলেকট্রিক্যাল পটেনশিয়ালে রূপান্তর করে।

তার মতে, মূলত এই শক্তি ব্যবহার করেই সাগর-মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার মতো অবিশ্বাস্য কাজ করে প্রজাপতি।

টাউনি কোস্টারের বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার প্রক্রিয়া। ছবি: সংগৃহীত

পোলারাইজড লাইট

জাবির এই অধ্যাপক বলেন, প্রজাপতিরা কেবল দিনেই নয়, রাতেও চলাচল করতে পারে। রাতে ওড়ার সময় তারা পোলারাইজড লাইট ব্যবহার করে চলাচল করে।

পোলারাইজড লাইট হলো—বাতাস ও আলোর সংমিশ্রণে তৈরি এক ধরনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য, যা মানুষ খালি চোখে দেখতে পায় না। তবে প্রজাপতিরা দেখতে পায়।

সোলার কম্পাস

মনোয়ার হোসেন জানান, সূর্যের অবস্থান, তীব্রতা ও দিক শনাক্ত করার জন্য প্রজাপতির দেহে বিশেষ কিছু জিন থাকে, যাতে সোলার কম্পাস মেমোরি হিসেবে রাখা হয়। নতুন প্রজন্ম সেই তথ্য ডিকোড করে নির্ধারণ করে যে তারা উত্তরে যাবে নাকি দক্ষিণে।

‘এ ছাড়াও বেশ কিছু অসাধারণ প্রাকৃতিক কৌশল ব্যবহার করে প্রজাপতি’, যোগ করেন তিনি।

টাউনি কোস্টারের আবাস পরিবর্তন ধাপে ধাপে। ছবি: এআইয়ের সহায়তায় তৈরি.j

বাতাসের গতিবেগ

ওড়ার সময় প্রজাপতিরা বাতাসের গতিবেগকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করে দীর্ঘ পথ সহজে পাড়ি দেয়। বড় পর্বতমালা বা উপকূলরেখা দেখেও দিক নির্ধারণ করে অগ্রসর হয় প্রজাপতিরা।

টাউনি কোস্টার ঘণ্টায় গড়ে কত কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়—সে তথ্য এখনো জানা যায়নি। তবে গবেষণা তথ্য বলছে, পরিযায়ী প্রজাপতির উড়ার গতি প্রজাতি ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে।

মোনার্ক প্রজাপতি যেভাবে হাজার মাইল পাড়ি দেয়

ড. মো. মনোয়ার হোসেন উদাহরণস্বরূপ বিশ্বব্যাপী পরিচিত মোনার্ক প্রজাপতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, শীতের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে মেক্সিকোয় যাত্রা শুরু করে মোনার্ক প্রজাপতি।

প্রায় দুই থেকে তিন হাজার কিলোমিটারের এই পথ পাড়ি দিতে সাধারণত ২ থেকে ৩টি প্রজন্ম শেষ হয়ে যায় তাদের।

আর এই পুরো ভ্রমণ শেষ করে গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রায় ৩ থেকে ৪ মাস সময় লেগে যায় তাদের।

গবেষণাগারে মোনার্ক প্রজাপতির গড় গতি ঘণ্টায় ৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার পাওয়া গেছে।

মোনার্ক প্রজাপতি। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে পেইন্টেড লেডি নামে আরেকটি পরিযায়ী প্রজাপতি ঘণ্টায় প্রায় ২১ দশমিক ৬ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে।

২০২৪ সালে ন্যাচার কমিউনিকেশনে ‘সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটারের বেশি উড়েছে পেইন্টেড লেডি প্রজাপতি’ শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসের সাহায্যে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর অন্তত চার হাজার ২০০ কিমি পথ ৫–৮ দিনে পাড়ি দিতে পারে পেইন্টেড লেডি প্রজাপতি।

কেন প্রজাপতি নতুন আশ্রয়ের সন্ধান করে

প্রজাপতিরা আনন্দের জন্য স্থান পরিবর্তন করে না, মূলত বেঁচে থাকার চরম তাগিদে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি এড়াতে তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য হয়।

‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রজাপতির বিচরণক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন’ শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রজাপতির বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তনের ৭৯ শতাংশই জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার কারণে ঘটেছে।

ছবি: এআইয়ের সহায়তায় তৈরি

গবেষক ড. মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রজাপতিকে প্রকৃতির “স্বাস্থ্য সূচক” বলা হয়। কারণ তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, উদ্ভিদের পরিবর্তন কিংবা আবাসস্থল ধ্বংসের প্রভাব তারা খুব দ্রুত অনুভব করে। তাই প্রজাপতির বিস্তৃতি বদলে যাওয়া মানে প্রকৃতির ভেতরে আরও বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে।’

তার মতে, প্রজাপতির বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে— জলবায়ু পরিবর্তন, খাবারের স্বল্পতা, নির্দিষ্ট পোষক গাছ বা লার্ভা হোস্ট প্লান্টের অভাব, পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা, চরম আবহাওয়া ও দুর্যোগ।

জলবায়ু পরিবর্তন

ড. মনোয়ার হোসেন জানান, জলবায়ুর বড় বা মাঝারি ধরনের পরিবর্তন প্রজাপতিদের স্থান পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটলে তারা তাদের অনুকূল পরিবেশের খোঁজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যায়।

খাবারের স্বল্পতা

যে অঞ্চলে তারা বসবাস করছে, সেখানে যদি খাবারের তীব্র অভাব বা স্বল্পতা দেখা দেয়, তবে বেঁচে থাকার জন্য তারা নতুন খাদ্য উৎসের সন্ধানে যাত্রা করে।

নির্দিষ্ট পোষক গাছের অভাব

অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন জানান, প্রজাপতিরা যেকোনো গাছে ডিম পাড়ে না। প্রতিটি প্রজাতির ডিম পাড়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু গাছ বা ‘লার্ভাল হোস্ট প্ল্যান্ট’ প্রয়োজন হয়। যেমন: টাউনি কোস্টার কেবল ঝুমকোলতা বা প্যাসিফ্লোরা জাতীয় গাছে ডিম পাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে যদি সেই গাছগুলো হারিয়ে যায়, তবে তারা বংশবৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত গাছের খোঁজে অন্যত্র চলে যায়।

ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হওয়ার প্রক্রিয়া। ছবি: সংগৃহীত
পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা

গবেষকদের মতে, প্রজাপতির শারীরিক ও বিপাকীয় কার্যকারিতা বাইরের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। শীতকালে বা খুব কম তাপমাত্রায় তাদের এনজাইম ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে প্রজনন ব্যাহত হয়। তাই তারা অনেক সময় উষ্ণ বা আরামদায়ক অঞ্চলের দিকে চলে যায়।

চরম আবহাওয়া ও দুর্যোগ এড়ানো

গবেষণায় জানা যায়, অতিবৃষ্টি বা ঝড়ের কারণে প্রজাপতির পাখা ভেঙে যেতে পারে। আবার খরার সময় গাছের পাতা শুকিয়ে গেলে প্রজাপতির ডিম পাতা থেকে নিচে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। এই চরম প্রতিকূল আবহাওয়া এড়াতে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে স্থান পরিবর্তন করে।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচারের (আইইউসিএন) ২০১৫ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৩০৫টি প্রজাতির মধ্যে ১৮৮টিই হুমকির মুখে, যদিও এখনো কোনো প্রজাতিকে জাতীয় পর্যায়ে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়নি।

স্ট্রাইপ টাইগার। ছবি: সমীর সাহা

তার মানে বাংলাদেশে এখনো ব্যাপক স্থানীয় বিলুপ্তি না ঘটলেও, প্রজাতির বড় অংশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

প্রশ্ন হলো—বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবাসস্থল সরে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রজাপতির ওপর এর প্রভাব কেমন হতে পারে?

‘ঢাকার নগর সবুজ উদ্যানগুলোতে দেশের প্রজাপতি বৈচিত্র্যের প্রায় অর্ধেক বাস করে’ শিরোনামে ২০২১ সালে জার্নাল অব আরবান ইকোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকা শহরের তিনটি প্রধান নগর উদ্যান বা সবুজ অঞ্চলে ৩ বছরে (জানুয়ারি ২০১৪ থেকে ডিসেম্বর ২০১৬ সাল পর্যন্ত) মোট ১৩৭ প্রজাতির প্রজাপতি রেকর্ড করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশে পাওয়া মোট ৩০৫টি প্রজাপতি প্রজাতির প্রায় ৪৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক।

তবে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, রেকর্ডকৃত প্রজাপতিগুলোর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বা ৫৩টি প্রজাতি জাতীয়ভাবে লাল তালিকাভুক্ত বা বিপন্ন।

গবেষণায় ৩টি সবুজ অঞ্চলে প্রজাপতির প্রজাতিগত যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তাহলো—

• বোটানিক্যাল গার্ডেন বা জাতীয় উদ্যান: সবচেয়ে বেশি ১৩০টি প্রজাতি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৫০টি বিপন্ন।
• ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস: ১০৮টি প্রজাতি রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬টি বিপন্ন।
• রমনা পার্ক: সবচেয়ে কম ৮৯টি প্রজাতি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২৫টি বিপন্ন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, তিন বছরে তিনটি এলাকাতেই প্রজাপতির প্রজাতি সংখ্যা দ্রুত ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং এই হ্রাসের হার সাধারণ প্রজাপতির তুলনায় বিপন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে বেশি মারাত্মক ছিল।

গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, ঢাকার দূষিত ও ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে প্রজাপতির বিপুল বৈচিত্র্য থাকলেও তা দ্রুত কমে যাচ্ছে। প্রজাপতি টিকিয়ে রাখার জন্য উদ্যানগুলোতে তাদের লার্ভার উপযোগী গাছ বাড়ানো, ফুলের গাছের সংখ্যা বাড়ানো এবং ঢাকার বিভিন্ন উদ্যানগুলোর মধ্যে সবুজ করিডোর তৈরি করা প্রয়োজন।

ছবি: এআইয়ের সহায়তায় তৈরি

তবে ন্যাচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভ্যুলিউশন পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশ নিয়ে উঠে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি ছিল—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া প্রজাপতির ছবি ও তথ্য, আন্তর্জাতিক অনলাইন ডেটাবেস ‘গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ইনফরমেশন ফ্যাসিলিটি’ (জিবিআইএফ)-এর চেয়ে বেশি।

এ বছর বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আন্তর্জাতিক একাডেমিক জার্নাল ‘কনজারভেশন বায়োলজি’তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া প্রজাপতির রেকর্ডের সংখ্যা জিবিআইএফের তুলনায় ২২ দশমিক ৪ গুণ বেশি।

শুধু জিবিআইএফ থেকে চার হাজার ২০৬টি প্রজাপতির তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে ফেসবুক ও অনলাইন ফটো আর্কাইভ ফ্লিকার থেকে পাওয়া গেছে আরও দুই হাজার ২৫৩টি প্রজাপতির তথ্য।

হোয়াইট টাইগার। সুন্দরবনে পাওয়া গেছে। ছবি: সমীর সাহা

সবমিলিয়ে রেকর্ড প্রজাপতির সংখ্যা ৩৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ছয় হাজারের ৪৫৯টিতে।

গবেষকরা জানান, কোনো বনপথে, গ্রামের বাগানে কিংবা শহরের পার্কে একজন প্রকৃতিপ্রেমীর তোলা একটি ছবি এখন জীববৈচিত্র্য গবেষণায় মূল্যবান উপাত্ত হয়ে উঠেছে।

টাউনি কোস্টারের আবাস পরিবর্তন। ছবি: এআইয়ের সহায়তায় তৈরি

গবেষকরা বলছেন, টাউনি কোস্টারের অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে যাওয়ার গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ বা কেবল একটি প্রজাতির গল্প নয়। এটি এমন এক পৃথিবীর গল্প, যেখানে জলবায়ু বদলাচ্ছে, প্রাণীরাও নতুন ঠিকানা খুঁজছে।

তবে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা একটি স্মার্টফোনও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের জন্য এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় বার্তা—প্রজাপতিকে রক্ষা করতে হলে তথ্যও সংরক্ষণ করতে হবে।