রাবিতে যুদ্ধাপরাধীদের ছবিসংবলিত বিতর্কিত বিলবোর্ড, প্রতিবাদের মুখে সরাল প্রশাসন

নিজস্ব সংবাদদাতা, রাবি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্যারিস রোডে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবিসংবলিত একটি বিলবোর্ড স্থাপনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের টানা ছয় ঘণ্টার বিক্ষোভের মুখে অবশেষে বিতর্কিত বিলবোর্ডটি সরিয়ে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। 

আজ সোমবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, 'জুডিশিয়াল কিলিং' (বিচারিক হত্যা) শিরোনামের মূল বিলবোর্ডটি সরিয়ে সেখানে একটি পরিবর্তিত সংস্করণ বসানো হয়েছে। নতুন এই বিলবোর্ডে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ছয় ব্যক্তির ছবি বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে স্থান পেয়েছে সুখরঞ্জন বালী ও বজলুল হুদার ছবি।

এর আগে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামে বিতর্কিত বিলবোর্ডটি স্থাপন করেছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সামাজিক সংগঠন ‘নভো-কালচার’। সংগঠনটির পরিচালক হিসেবে আছেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার।

বিলবোর্ডটিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি প্রদর্শন করা হয়। এদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং সাঈদীর দণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়ার পর ২০২৩ সালের আগস্টে তিনি কারাগারে মারা যান। 

বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার নামে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্যাম্পাসে এর প্রতিবাদ জানায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও কয়েকটি সংগঠন। 

গত শনিবার দিনভর সমালোচনা বাড়ার পর সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতারাসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে বিলবোর্ডটি অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু প্রশাসনের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আশ্বাস না পেয়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে ৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তারা।

পরে রাত ১০টার দিকে প্রক্টর অফিসে এক বৈঠকে যোগ দেন নভো-কালচারের পরিচালক ও রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার। বৈঠক শেষে প্রক্টর অফিস থেকে বের হওয়ার সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে তিনি অশালীন অঙ্গভঙ্গি করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

বৈঠক শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আম্মার বিলবোর্ডটি সরাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমরাই এই বিতর্কিত বিলবোর্ড সরিয়ে নেব কিংবা যে মুখগুলো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেগুলো ঢেকে দেব।

এর আগে রাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ জানান, এই উদ্যোগের সঙ্গে রাকসুর সাংগঠনিক বা আর্থিক কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি বলেন, আমার ধারণা, তথাকথিত বিচারিক হত্যার বিষয়টি তুলে ধরতেই তারা বিলবোর্ডটি দিয়েছিল। তবে রাকসুর এতে কোনো আর্থিক বা সাংগঠনিক ভূমিকা নেই।

বিতর্কিত প্রদর্শনীটির পক্ষে যুক্তি দিয়ে সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, বিলবোর্ডটির মূল বিষয়বস্তু ছিল ‘জুডিশিয়াল কিলিং’। শেখ হাসিনার শাসনামলে হওয়া কিছু বিচার ও মৃত্যুদণ্ড রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল কি না—সে প্রশ্ন তোলাই এর উদ্দেশ্য ছিল।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। সেই পটভূমিতেই এই বিলবোর্ড। কাউকেও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না, বরং তাদের বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবিত ছিল কি না—সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তবে এই উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করেছে ক্যাম্পাসের একাধিক ছাত্রসংগঠন।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট রাবি শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, এই উদ্যোগের পেছনে যে-ই থাকুক না কেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা বাংলাদেশের কোথাও স্বাধীনতাবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনের কোনো চেষ্টা আমরা মেনে নেব না। যুদ্ধাপরাধের বিচার একটি মৌলিক জাতীয় বিষয়।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন বা শেখ হাসিনার শাসনবিরোধী অবস্থানের সুযোগ নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের আদর্শের পুনর্বাসন বা তাদের জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। 

তবে ফুয়াদ আরেকটি বিষয়েও তার প্রতিবাদ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ক্ষমতাশীলদের প্রতিক্রিয়াকেই প্রশাসন সমীহ করে। আমাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা তাদের বিবেচনায় ছিল না। 

তিনি জানান, আলোচনার সময় প্রক্টরিয়াল বডির এক সদস্য মন্তব্য করেছিলেন যে 'তোমাদের সংখ্যা তো অনেক কম', যা থেকে বোঝায় বড় ধরনের জনসমাগম হলেই কেবল দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হতো। প্রশাসনের এ ধরনের আচরণ অতীতের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের তোষণ করার মানসিকতারই প্রতিফলন বলে দাবি করেন তিনি।

ছাত্র অধিকার পরিষদ রাবি শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের চিহ্নিত আলবদর ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের আমরা ঘৃণা করি। ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের ছবি টাঙিয়ে বিতর্কিত বয়ান তৈরি করার কোনো সুযোগ নেই।

পাশাপাশি, নভো-কালচারের প্রতিষ্ঠাতা যেহেতু রাকসুর জিএস, তাই এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয় উঠে আসছে উল্লেখ করে এটি তদন্তের দাবি জানান মারুফ।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল রাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু অভিযোগ করেন, দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে অতীতের সম্পর্কহীন রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে জুড়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা আমরা দেখি না। এটা বিভাজন ও উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। যুদ্ধাপরাধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মেলানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলিম জানিয়েছিলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তাকে আগে জানানো হয়নি, তবে প্রশাসন খোঁজখবর নিচ্ছে।