এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন রপ্তানিমুখী শিল্পের সম্প্রসারণ

By স্টার অনলাইন রিপোর্ট

সত্তর দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার এলডিসি উত্তরণ সময়ে দেশটি অধিক হারে রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর মনোনিবেশ করায় আজ পৃথিবীজুড়ে ইলেকট্রনিক্স, কেমিক্যাল, অটোমোবাইল, মেশিনারীজ প্রভৃতি পণ্য রপ্তানিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। তাদের অনুসরণ করে এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে রপ্তানিমুখী শিল্পের শিল্পায়ন সম্প্রসারণের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।

আজ মঙ্গলবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত 'বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা; প্রেক্ষিত এলডিসি উত্তরণ' শীর্ষক ভার্চুয়াল সংলাপে বক্তারা এই মন্তব্য করেন।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, '২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দশম বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য বাংলাদেশ।'

তিনি উল্লেখ করেন, কোরিয়ায় রপ্তানিকৃত বাংলাদেশি পণ্যের প্রায় ৯৫ ভাগই শুল্ক ও কোটা মুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে এবং এলডিসি থেকে উত্তরণ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ এ সুযোগ হারাবে। এমতাবস্থায় এলডিসি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিতকরণের প্রস্তাব করেন ডিসিসিআই সভাপতি। একইসঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের অধিকতর সম্প্রসারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সইয়ে জোরারোপ করেন তিনি।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্যোক্তাবৃন্দ ইতোমধ্যে টেক্সটাইল, চামড়া, অবকাঠামো, জ্বালানি, মোবাইল ফোন ম্যানুফ্যাকচারিং এবং তথ্য-প্রযুক্তির মতো খাতে বিনিয়োগ করেছেন। পাশাপাশি কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক, পাট ও পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও অটোমোবাইল প্রভৃতি খাতে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার জন্য তিনি আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে আগামীতেও দেশটির সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, 'করোনা পরবর্তী সময়ের বৈশ্বিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সকলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এ ছাড়াও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে যে সংকটের তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় আমাদেরকে আরও সচেতন থাকতে হবে।'

পররাষ্ট্রসচিব ২ দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে পুরনো বাণিজ্য চুক্তিগুলোর যুগোপযোগীকরণ, দ্রুততম সময়ের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সই, ঢাকা-সিউল সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচল, কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় খাতে কোরিয়ান বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপের আহ্বান জানান।

দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম দেলোয়ার হোসেন বলেন, 'বাংলাদেশে প্রায় ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সরাসরি বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া ৫ম স্থানে রয়েছে এবং প্রায় ১৫০টি কোরিয়ান কোম্পানি বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিক্স, সফটওয়্যার প্রভৃতি খাতে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।'

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে তিনি বাংলাদেশকে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, শ্রমঘন শিল্প এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন। এ ছাড়াও বাংলাদেশে 'স্যামসাং গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র' স্থাপনের আহ্বান জানান।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে কোরিয়ান ইপিজেড করপোরেশন (বিডি) লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিহাক সাং বলেন, তার প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং আগামী ৫ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক খাতের পণ্য বাংলাদেশ রপ্তানিতে সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের বিষয়ে উভয়পক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তবে এ ক্ষেত্রে ২ পক্ষের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশে হাইটেক শিল্পখাতে কোরিয়ার বিনিয়োগ প্রাপ্তিতে মানসম্মত টেকসই জ্বালানি সরবরাহ একান্ত অপরিহার্য বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'পাশাপাশি কাস্টমস ও কর কাঠামোর সহজীকরণ, বন্দর সুবিধার আধুনিকায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নদীপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।'

তিনি দেশের মানব সম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে পরামর্শ প্রদান করেন, যার মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

কিহাক সাং উল্লেখ করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সামুদ্রিক ভোগ্য পণ্যের বাজার বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং এ খাতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসতে পারেন।

সামনের দিনগুলোতে তথ্য-প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা খুবই বেশি এবং ইতোমধ্যে ইয়াংওয়ান করপোরেশন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে 'হাইটেক পার্ক' স্থাপন করেছে, যেখানে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সংলাপে নির্ধারিত আলোচনায় কোরিয়া ট্রেড ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সির (কোটরা) গ্রিন গ্রোথ বিভাগের মহাপরিচালক জন উন কিম বলেন, 'এলডিসি পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। সেই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পের শিল্পায়নের ওপর বাংলাদেশকে অধিক হারে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।'

তিনি আরও বলেন, 'সত্তর দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার এলডিসি উত্তরণ সময়ে দেশটি অধিক হারে রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর মনোনিবেশ করে, যার ফলশ্রুতিতে দেশটি ইলেকট্রনিক্স, কেমিক্যাল, অটোমোবাইল, মেশিনারীজ প্রভৃতি পণ্য সারা পৃথিবীতে রপ্তানিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।' কেবিসিসিআই উপদেষ্টা শাহাব উদ্দিন খান বলেন, 'গত বছর বাংলাদেশ-কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আমাদের রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ নির্ভর করে তৈরি পোশাক খাতের পণ্যের উপর। তবে বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রাপ্তিতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিরসন করা সম্ভব হলে আরও বেশি হারে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ প্রাপ্তি সম্ভব।'