শিখন ঘাটতির বিষয়ে অন্ধকারে সরকার

By মহিউদ্দিন আলমগীর

শিখন ঘাটতির বিষয়ে গত মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারিতে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে প্রায় ৮০ লাখ শিক্ষার্থী শিখন ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই বাস্তবতা সম্পর্কে সরকার এখন পর্যন্ত অন্ধকারে আছে।

সরকার সম্প্রতি কোভিড মহামারির কারণে শিখন ঘাটতি মূল্যায়নের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটকে (বিইডিইউ) দায়িত্ব দেয়। একই সঙ্গে তাদের এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার উপায়গুলোও বের করতে বলে।

এই দুই সংস্থার কর্মকর্তারা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হারানো প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি নিয়ে নিজস্ব গবেষণার পরিকল্পনা করেছে এনসিটিবি। আর মূলত মাধ্যমিক স্তরের মূল্যায়ন নিয়ে কাজ করা বিইডিইউর এই সংক্রান্ত মূল্যায়ন আগামী মাসের শেষ দিকে শেষ হতে পারে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, 'আমরা শিক্ষা খাতে শিখন ঘাটতি বিশ্লেষণের জন্য কাজ করছি। এটা শেষ হতে সময় লাগবে।'

'ফলাফল পাওয়ার পর আমরা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করব।'

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (ইউকেএফআইইটি) বলছে, বিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হলে শিক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হয়।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বেশ কয়েক জন শিক্ষাবিদ বলেন, আগেই সরকারের শিখন ঘাটতি মূল্যায়নের কাজ শেষ করা উচিত ছিল এবং সে অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ শুরু করা উচিত ছিল।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী পরিচালক হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, 'শিখন ঘাটতি নিরূপণের জন্য সরকারের কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই মূল্যায়ন করা দরকার। এটা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।'

শিখন ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের দক্ষতা হারায়। এতে করে তাদের পক্ষে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে।

কোভিড সংক্রমণ রোধে গত বছরের ১৭ মার্চ সরকার স্কুলসহ সারা দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানগুলোতে পুনরায় আংশিকভাবে সশরীরে ক্লাস শুরু হয়।

গত ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত পিপিআরসি ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথভাবে করা এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জরিপ অনুসারে প্রাথমিক ২২ শতাংশ ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী শিখন ঘাটতির ঝুঁকিতে আছে।

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, 'এর মানে হচ্ছে প্রাথমিকের ৩৯ লাখ ৬ হাজার ও মাধ্যমিকের ৩৯ লাখ- সব মিলিয়ে মোট ৭৮ লাখ ৬ হাজার শিক্ষার্থী শিখন ঘাটতির ঝুঁকিতে আছে।'

অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর আরও বলেন, 'এর ফলে ঝরে পড়ার হার আরও বাড়তে পারে…স্কুলগুলো পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ও সময়োপযোগী। কিন্তু কেবল এই সিদ্ধান্ত শিখন ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে না।'

এ জন্য দুই স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেই পরিপূরক প্রতিকারমূলক কর্মসূচি অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে করা ওই সমীক্ষায় বলা হয়, গত ৬ মাসে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

এর আগে গত মার্চ মাসে পিপিআরসি ও বিআইজিডির আরেক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে সে সময় প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৫৯ লাখ ২ হাজার শিক্ষার্থী শিখন ঘাটতির ঝুঁকিতে ছিল। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিকের ও ২৫ শতাংশ মাধ্যমিক স্তরের।

গবেষণার জন্য সাম্প্রতিক জরিপটি ৪ হাজার ৮৭২টি পরিবারের প্রধান ব্যক্তিদের টেলিফোন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে করা হয়েছে। মার্চ মাসে এ জন্য ৬ হাজার ৯৯টি পরিবারের প্রধানদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। দুই সমীক্ষাতেই গ্রামীণ ও শহুরে বস্তির পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যে পরিবারগুলোতে স্কুলগামী শিশুরা আছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশের ১ লাখ ৩৩ হাজার ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ কোটি ১৬ লাখ। অন্যদিকে ২০ হাজার ৮৪৯ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ২ হাজার।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদে স্কুল বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার সংকট তৈরি হচ্ছে। যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ ও অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই প্রতিবেদনের ব্যাপারে সে সময় বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, 'স্কুল থেকে ঝরে গেলে একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকার মতো হারাতে পারে। এটি একটি মারাত্মক ক্ষতি। যা দারিদ্র্য বাড়াতে পারে।'

স্কুল বন্ধের কারণে শিক্ষার্থীরা যাতে শিখন ঘাটতির ঝুঁকিতে না পড়ে, তার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল।

মহামারির ভেতর দুই মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে টিভি শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে। পরে তারা সব স্কুলকে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার নির্দেশ দেয়।

এতে শহর এলাকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ইন্টারনেটের মাধ্যমে শেখার সুযোগ পেলেও এখন পর্যন্ত ডিজিটাল বিভাজনের বিষয়টি সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় অসুবিধা বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রধানত ডিভাইসের অভাব ও ইন্টারনেটের সুব্যবস্থা না থাকার জন্য।

গত বছরের শেষ দিকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দিতে শুরু করার নির্দেশ দেয়।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের প্রধান রবিউল কবির চৌধুরী জানান, শিখন ঘাটতি সম্পর্কে জানতে ও এটি মোকাবিলার উপায় বের করার জন্য শিখন ঘাটতির একটি মূল্যায়ন দরকার।

তিনি বলেন, 'আমরা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একটি বিশেষ পরীক্ষার পরিকল্পনা করছি। প্রায় ৪২ হাজার শিক্ষার্থী ওই পরীক্ষায় বসবে। এভাবে আমরা শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির মূল্যায়ন করব।

`আমরা আশা করছি ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ হবে।'

রবিউল কবির চৌধুরী জানান, টিভি, অনলাইন ক্লাস ও অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে, সে বষয়টি মাথায় রেখে তারা এখন প্রশ্ন তৈরির কাজ করছেন। তিনি আরও বলেন, 'শিখন ঘাটতি পূরণের জন্য আমরা কিছু সুপারিশও করব।'

এনিসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা জানান, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির বাস্তব অবস্থা জানতে তারা একটি গবেষণা শুরুর পরিকল্পনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমরা শিখন ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার উপায়ও খুঁজে বের করব।'

অনুবাদ করেছেন মামুনুর রশীদ