বায়ুদূষণে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট: রোগীর চাপে নাস্তানাবুদ বক্ষব্যাধি হাসপাতাল
রাজধানীর মহাখালীতে দেশের প্রধান বক্ষব্যাধি হাসপাতালের বহির্বিভাগ রোগীদের ভিড়ে ঠাসা। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্মীদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাসপাতালে বসার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেককেই দেখা গেল হাতে মেডিকেল টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
দুপুর ১টায় বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা বন্ধ হওয়ার আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। লাইনে অপেক্ষারত অনেকের চোখেমুখেই দুশ্চিন্তার ছাপ। আজ চিকিৎসকের দেখা পাবেন কি না, তা নিয়ে তারা সন্দিহান। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইডিসিএইচ) গিয়ে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক গোলাম সারওয়ার লিয়াকত হোসেন ভূঁইয়া জানান, শুষ্ক মৌসুমে রোগজীবাণু বাতাসে ভেসে বেড়ায় ও মানুষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে তা গ্রহণ করে। মূলত এ কারণেই এই সময়ে শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
হাসপাতালের কর্মীরা বলছেন, ৮৭০ শয্যার এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে এখন এটিই প্রাত্যহিক চিত্র। হাসপাতালের বার্ষিক তথ্যও রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ার প্রমাণ দেয়।
শ্বাসকষ্টজনিত রোগী বাড়ার পেছনে বায়ুদূষণকে দায়ী করে পরিচালক গোলাম সারওয়ার লিয়াকত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া ও ইটভাটার নির্গমনের মতো বিভিন্ন ধরনের বায়ুদূষণ বেড়েছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা। ফলে আমরা অ্যাজমা (হাঁপানি) এবং সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ) আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি দেখছি।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে অ্যাজমা রোগীরা কাশি, শ্বাসকষ্ট ও বুকে ঘড়ঘড় শব্দের মতো সমস্যায় ভোগেন। তারা এমনিতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারলেও যখনই বায়ুদূষণের সংস্পর্শে আসেন, তখনই তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে ও রোগটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তিনি আরও জানান, অনেক রোগী বহির্বিভাগে দীর্ঘমেয়াদী কাশি নিয়ে আসেন যা সহজে সারছে না। যেহেতু অধিকাংশ মানুষ জীবিকার তাগিদে বাইরে বের হন ও কর্মস্থলে যাওয়ার পথে বারবার দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে আসেন, তাই বহির্বিভাগে এই ধরনের রোগীর ভিড় দিন দিন বাড়ছে।
ঢাকা ও অন্যান্য প্রধান শহরে বায়ুদূষণ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দেশের শীর্ষ এই রেফারেল হাসপাতালের রোগীর সংখ্যাও। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৫ হাজারে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১ লাখ ৯২ হাজার। এর আগে ২০২৩ সালে ১ লাখ ৭৫ হাজার, ২০২২ সালে ১ লাখ ৬২ হাজার ও ২০২১ সালে ১ লাখ ২৮ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
গত বছরের ১ লাখ ৯৫ হাজার রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া জরুরি বিভাগে ১৯ হাজার ৪৬১ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৫ হাজার ৮৮৬ জন।
নবজাতক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষই হাসপাতালে আসছেন। তবে ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যাদের ফুসফুস আগে থেকেই কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
এনআইডিসিএইচের সহযোগী অধ্যাপক শফিউল ইসলাম বলেন, যাদের যক্ষ্মা-পরবর্তী জটিলতা, নিউমোনিয়া বা জন্মগত ফুসফুসের সমস্যা আছে, তাদের জন্য বায়ুদূষণ অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমরা হাসপাতালে এমন রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখছি।
এমনই একজন রোগী ৫০ বছর বয়সী আবদুর রাজ্জাক। তিনি ২৩ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালে এসেছিলেন। প্রায় তিন বছর আগে তার ফুসফুসে পানি জমার কারণে চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জের ভুলতার এই হকার জানান, তিনি শিল্প এলাকায় বসবাস ও কাজ করার কারণে সবসময়ই দূষিত বাতাসের মধ্যে থাকেন। গত কয়েকদিন ধরে তিনি তীব্র কাশিতে ভোগায় স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি এই হাসপাতালে এসেছেন।
মতিঝিলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শিহাব উদ্দিন বলেন, আমার মেয়ে সাইনোসাইটিসে ভুগছে। ও প্রায়ই বায়ুদূষণের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে দূষণ কমে যায়, তখন ওর অবস্থা একটু ভালো থাকে।
অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বাতাস
শুষ্ক মৌসুম চলায় ঢাকা শহরের বাতাসের মান এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) ৩০০ ছাড়িয়ে যায়, যা 'বিপজ্জনক' হিসেবে গণ্য করা হয়।
সাভারে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ২৬ ফেব্রুয়ারি একিউআই পৌঁছেছিল ৪৪৩-এ ও তার আগের দিন ছিল ৪১৮। ৩০০-এর ওপরের মানকে অধিদপ্তর 'বিপজ্জনক' বলে চিহ্নিত করে।
ওই দিনগুলোতে বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার বাতাসের মান ছিল সবচেয়ে খারাপ, যেখানে গড় একিউআই ছিল ১৭৭ ও ১৭২। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বেইজিং ও কাঠমান্ডু।
গত বছরের অক্টোবরে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত 'এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স' অনুযায়ী, ১৯৯৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে পিএম২ দশমিক ৫ (২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে ছোট সূক্ষ্ম ধূলিকণা) দূষণ ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
গত বছর ঢাকায় পিএম২ দশমিক ৫-এর বার্ষিক গড় মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৯০ দশমিক ৩৫ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত ৫ মাইক্রোগ্রাম সীমার চেয়ে প্রায় ১৮ গুণ বেশি। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
শুষ্ক মৌসুমে পিএম২ দশমিক ৫-এর মাত্রা অন্যান্য সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যায়। গত মাসে ঢাকায় এর গড় ঘনত্ব ছিল ১৯৩ মাইক্রোগ্রাম, যা ডব্লিউএইচও’র মানদণ্ডের চেয়ে ৩৮ গুণ বেশি।
এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুদূষণ বাংলাদেশিদের গড় আয়ু ৫ দশমিক ৫ বছর কমিয়ে দিচ্ছে। এটি দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী বাহ্যিক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা তামাক সেবন বা অপুষ্টির চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। ধূমপান যেখানে আয়ু কমায় প্রায় ২ বছর, অপুষ্টি কমায় ১ দশমিক ৪ বছর, সেখানে বায়ুদূষণ কেড়ে নিচ্ছে ৫ বছরেরও বেশি সময়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, রাজধানীতে বায়ুদূষণ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। মাতুয়াইল, আমিনবাজার ও আরও কয়েকটি এলাকায় বর্জ্য পোড়ানো এই দূষণ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাভারকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে ১০৬টি ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে গত মাসে ৩০ থেকে ৪০টি ইটভাটার মালিক উচ্চ আদালত থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রের খবর, ঢাকা শহরের মোট বায়ুদূষণের প্রায় ৫৮ শতাংশ আসে ইটভাটা থেকে। বাকি দূষণের জন্য দায়ী যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণ কাজ ও অন্যান্য উৎস।