কামরাঙ্গীরচরে স্ত্রী-মেয়েকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি
রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের নয়াগাঁও এলাকায় স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার ঘটনায় দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মুখেন্দ্র চন্দ্র দাস। আজ সোমবার তিনি জবানবন্দি দেন।
কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, মুখেন্দ্র তার স্ত্রী ফুলবাসি রানী ও ১২ বছর বয়সী মেয়ে সুমি রানীকে শ্বাসরোধ করে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। এছাড়া স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হত্যার পর তিনি নিজেও আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন বলেও জবানবন্দিতে জানিয়েছেন মুখেন্দ্র।
গত শনিবার সকালে পুলিশ কামরাঙ্গীরচরের একটি বাসা থেকে ফুলবাসি রানী (৩৫) ও সুমি রানীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। নিহতদের গলায় কালো দাগ ছিল।
এ ঘটনায় নিহত সুমির খালা বাদী হয়ে কামরাঙ্গীরচর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ ফুলবাসির স্বামী মুখেন্দ্র ও বড় মেয়ে ঝুমা রানীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। তারা দুজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
আজ সোমবার ঝুমাকে তার খালার জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে উল্লেখ করে ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ঘটনা আগের দিন হত্যার পরিকল্পনা করেন মুখেন্দ্র। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফুটপাত থেকে ছারপোকা মারার ওষুধ কেনেন। ঘটনার সময় তিনি প্রথমে স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর নিজে ছারপোকা মারার ওষুধ পান করেন। দুই মেয়েকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রথমে ছোট মেয়েকে হত্যার পর বড় মেয়েকে হত্যা করার চেষ্টা করলে তার ঘুম ভেঙে গেলে চিৎকার দেয়। পরে এলাকাবাসী তার ঘরে উপস্থিত হয়।
ওসি আরও জানান, মুখেন্দ্রর সংসারে অভাব-অনটন লেগেছিল। গত দুই বছর আগে মুখেন্দ্র তার স্ত্রীর সামান্য কিছু স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার জন্য তার মামাকে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু, সেই টাকা ফেরত পাননি।
সেটা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না। এরমধ্যে কিছুদিন আগে কর্মহীন হয়ে পড়ায় ঠিকমতো সংসার চালাতে পারছিলেন না। বাসাভাড়া বাকিসহ কিছু পরিমাণে ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েন মুখেন্দ্র।
এরমধ্যে তার স্ত্রীর জমানো এক হাজার টাকা দুই দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়ার কথা বলে ধার নিলেও সেটা পরিশোধ করতে পারেননি। ঘটনার আগের দিন এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয়। এরপর তার স্ত্রী টাকার জন্য চাপ দেন এবং বলেন তুমি কী করো, কেন টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করতে পারও না। টাকা দিতে না পারলে আমাকে মেরে ফেলো।
মুখেন্দ্র তখন পরিকল্পনা করেন, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করবেন। তবে, ছারপোকা মারার ওষুধে বিষক্রিয়া না হওয়ায় তিনি বেঁচে যান। তারপরও আমরা তাকে শনিবার আটকের পর ছারপোকা মারার ওষুধ খাওয়ার কথা শুনে একদিন হাসপাতালে চিকিৎসা রেখে সুস্থ করে তারপর জিজ্ঞাসা করি। আজ সোমবার তাকে আদালতে পাঠানো হয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি জন্য। গতকাল রোববার কামরাঙ্গীরচর নয়াগাঁও ঘটনাস্থলে ওই বাড়ির প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করি এবং ঘটনাস্থল দেখি। একটি একতলা টিনশেড বাড়ির একটি সিঙ্গেল রুমে তারা বসবাস করতেন। এছাড়া তিনি এলাকায় কালু চন্দ্র নামে পরিচিত ছিলেন বলেও জানান ওসি।
মুখেন্দ্রর পাশের ঘরের বাসিন্দা বিবি ফাতেমা বলেন, 'শুক্রবার রাত ১০টার দিকে দুই মেয়ে ও স্ত্রীসহ কালু চন্দ্র ঘরে শুয়ে ছিলেন। শনিবার ভোরে আনুমানিক ফজরের আজানের দুই মিনিট পর বড় মেয়ে জোসনা তার ছোটবোন সুমির নাম ধরে খুব জোরে চিৎকার দেয়। তখন আমিসহ আশেপাশের লোকজন দৌড়ে তাদের ঘরের সামনে গেলে দেখি দরজা খোলা। বিছানার ওপর সুমি ও ফুলবাসি শুয়ে আছেন। তাদের গলায় কালো দাগ। সুমির মাথার পাশে কালু চন্দ্র ও পায়ের কাছে ঝুমা বসে কাঁদছেন। ওই সময় উপস্থিত লোকজন কালু ও ঝুমাকে জিজ্ঞাসা করে, কী হয়েছে। ঝুমা তার মা ও ছোট বোনের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছিল। তবে কালু কোনো কথা বলছিলেন না। পরে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে এবং কালু ও ঝুমাকে নিয়ে যায়।'
ওই বাড়ির মালিক শাহনাজ আক্তার জানান, পাশে তার আরেকটি বাড়ি আছে। সেখানেই তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। গত ১২ বছর আগে টিনশেড বাড়ি তৈরি করার সময় কালু তার স্ত্রী এবং ছোট দুই সন্তান নিয়ে এই বাসায় ওঠেন। বর্তমানে এক রুমের ওই ঘরটি ভাড়া ছিল দুই হাজার ৪০০ টাকা।
তিনি বলেন, 'কালু অনেক কষ্টে সংসার চালাতেন। তার বড় মেয়ে স্থানীয় স্কুলের সপ্তম শ্রেণি এবং ছোট মেয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তারা সবাই শান্তিপ্রিয় ছিল, কোনো ঝামেলার মধ্যে ছিল না। নিয়মিত বাসাভাড়া দিয়ে আসছিল।'
শাহনাজ আক্তার আরও বলেন, 'গত বছরের লকডাউনের পর কালুর অনেকদিন কাজ ছিল না। মাঝেমধ্যে কিছু কাজ করলেও ঠিকমতো সংসারের ভরণপোষণ করতে পারছিলেন না। তাই বাসাভাড়া বকেয়া হচ্ছিল। বর্তমানে চার মাসের বাসাভাড়া বাকি আছে।'