একটি মুক্ত গণমাধ্যম সমাজ, দেশ ও সভ্যতার জন্য: মাহফুজ আনাম

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

‘গত ৩৫ বছরে এ দেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার একটি কারণ হলো ক্ষমতাসীনদের মুক্ত গণমাধ্যমের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পারা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করলে তারা যেসব ভুল করেছে, সেগুলো করতো না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করলে তারা আরও বেশি সচেতন থাকতো।’

দ্য ডেইলি স্টারের ৩৫তম বর্ষপূর্তিতে আজ শুক্রবার বিকেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কথাগুলো বলেছেন পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম।

তিনি বলেন, ‘যখন আপনার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে, ঠিক তখন আপনি সবচেয়ে গভীরভাবে আপনার বন্ধু ও সেই মানুষগুলোর প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করেন, যারা আপনার মূল্যবোধ ধারণ করে এবং আপনার প্রয়োজনে পাশে থাকে। আমরা দ্য ডেইলি স্টারের ৩৫ বছর পূর্তি উদযাপন করছি। এই দিনে আপনাদের বলতে চাই, একটি মুক্ত গণমাধ্যম কেবলমাত্র গণমাধ্যমের জন্য নয়, এটি সমাজের জন্য, দেশের জন্য, আমাদের সভ্যতার জন্য। আজ আমার কলামে লিখেছি, “মুক্ত গণমাধ্যমে আগুন দিলে পুড়ে যায় গণতন্ত্রও”। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল গণমাধ্যমের জন্য নয়, এটা আমাদের সবার জন্য। এটি মূল্যবোধ ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। এটিকে অবশ্যই সবার লালন করতে হবে।’

এ সময় তিনি ডেইলি স্টারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এসএম আলী, মিডিয়া ওয়ার্ল্ডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আজিমুর রহমান, প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস মাহমুদ, লতিফুর রহমান, আব্দুর রউফ চৌধুরী ও রোকিয়া আফজাল রহমানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

মাহফুজ আনাম বলেন, ‘জেনারেল এএইচএম এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনকালে দ্য ডেইলি স্টারের জন্ম। গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের সময় আমাদের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং এখনো চলছে। দ্য ডেইলি স্টারের একজন প্রথম সারির কর্মী হিসেবে আমি ৩৫ বছর প্রত্যক্ষ করেছি, কোথায় আমরা ভালো করেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি। আমার গভীর উপলব্ধি, আমরা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা চেষ্টা করেছি, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভালো নির্বাচন হয়েছে। এরপর হঠাৎ আমাদের মানসিকতায় পরিবর্ত এলো; তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে নির্বাচনকে ব্যবহার করা হলো। আমরা এখন আবার সঠিক পথে ফিরেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের নির্বাচন হয়েছে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সংসদ কার্যকর হয়েছে, সংসদে অনেক নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে, অনেক তরুণ প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েছে। এটি আমাদের আশান্বিত করছে। আমাদের প্রত্যাশা, সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংসদের যাত্রা শুরু হবে। আমাদের একটি সমস্যা হলো, যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তাদের দুটি পক্ষের প্রতি অনুগত থাকতে হয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তাদের জনগণের প্রতি অনুগত থাকা উচিত, আবার তারা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নও নিয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের কোন পক্ষের প্রতি অনুগত থাকা উচিত, ভোটার নাকি দলের? দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের ইতিহাস হলো, আমাদের সংসদ সদস্যরা দলের প্রতি অনেক বেশি অনুগত, অনেক বেশি সম্পৃক্ত থাকে।’

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ‘এই নতুন সংসদ ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করবে। তারা অবশ্যই দলের প্রতিনিধিত্ব করবে, তবে দলগুলোকে এই উপলব্ধি করতে হবে যে জনগণের ভোটের কারণেই তারা ক্ষমতায় আসতে পেরেছে।’

নতুন সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমরা আশা করি—ভোটারদের বিশ্বাস, আস্থা ও আশার প্রতি আপনারা সচেতন থাকবেন।

দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘একটি নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে অবশ্যই জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে হবে। এই সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে, ইতিহাস কত অসাধারণ সুযোগ আপনাদের দিয়েছে। আমরা অতীতে নির্বাচিত সরকার পেয়েছি। কিন্তু এই সরকারের নির্বাচিত হওয়া গতানুগতিক না। কারণ, এই সরকার এসেছে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সরকার এসেছে। এর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থানের মূল্যবোধ ও স্বপ্নকে খাটো করে দেখবেন না। আপনাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে, তবে এটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের জনগণ আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ—এই উপলব্ধি আমাদের আশার আলো। একজন মানুষ ভিক্ষার হাতও বাড়াতে পারে, আবার উৎপাদনও করতে পারে। এই হাত উৎপাদনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারলে প্রত্যেকে উদ্বৃত্ত উৎপাদন করতে পারে। আমাদের জনসংখ্যা ১৮ কোটি। সঠিক শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে এই জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। এটা আমাদের স্বপ্ন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের ডমিনেট করতে পারে, আবার আমাদের সেবাও করতে পারে। এটি সেবা করতে পারে তখনই, যখন বিষয়টি নীতি-নির্ধারকরা উপলব্ধি করবে।’

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট ও সকল প্রযুক্তি আমাদের শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে—আমাদের গ্রামগুলোর প্রতিটি বিদ্যালয়কে সংযুক্ত করতে পারে, আমাদের পাঠ্যসূচি সর্বাধুনিক হতে পারে, সবচেয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মাধ্যমে তারা পাঠ নিতে পারে।’

সরকার, সংসদ সদস্য ও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হলো পরিবেশ ধ্বংস করা। অথচ, এই পরিবেশ আমাদের সম্পদ হতে পারে। আমরা এমন একটি দেশ, যেখানে প্রায় সর্বোচ্চ সংখ্যক নদী আছে এবং এই নদীগুলো স্বাদু পানির। এটি সম্পদ। বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা খাবার পানির মারাত্মক সংকটে রয়েছে। আর আমরা নদী দূষিত করি। সারা দেশে যত নদী প্রবাহিত হচ্ছে, তার সবগুলো দূষিত। আমাদের শত্রুরা এটা করেনি, আমরাই করেছি। কীভাবে আমরা খাবার পানি দূষিত করতে পারি! দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো, আমরা ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছি। ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন মানে হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পানি চুরি করা। কিন্তু আমরা সেটা করছি। ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর সাংঘাতিকভাবে নিচে নেমে গেছে।’

‘আমাদের যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমন আছে গুরুতর চ্যালেঞ্জ’, যোগ করেন তিনি।

মাহফুজ আনাম বলেন, ‘দ্য ডেইলি স্টারের পক্ষ থেকে আমাদের বার্তা হলো—গত ৩৫ বছরে এ দেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার একটি কারণ হলো ক্ষমতাসীনদের মুক্ত গণমাধ্যমের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পারা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করলে তারা যেসব ভুল করেছেন, সেগুলো করতেন না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করলে তারা আরও বেশি সচেতন থাকতেন। আমি আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের বলতে চাই, মালিকপক্ষকে সার্ভ করা আপনার কাজ না। অনেক সময় ভুলে যান, আপনার কাজ পাঠক, শ্রোতা, জনগণকে সার্ভ করা। আমি আপনাদেরই একজন। আমি অনুরোধ করছি, পেশার অসাধারণ আদর্শ উপলব্ধি করুন। একদিকে আমি আবেদন করব সরকার, সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণকে সাড়া দিতে। অন্যদিকে আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের প্রতি আবেদন জানাবো, সাংবাদিকতার জায়গা থেকে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি সচেতন হবেন। আমরা যদি এটি পূরণ করতে পারি, কেবলমাত্র তাহলেই যে সম্মান আমাদের প্রাপ্য, সেটা অর্জন করতে পারবো।’

সবশেষে তিনি বলেন, ‘বিনয়ের সঙ্গে বলছি, দ্য ডেইলি স্টার সেই প্রতিজ্ঞা পূরণের চেষ্টা করে। সেই স্বপ্ন পূরণে আমাদের পাশে থাকুন, সহযোগিতা করুন।’