গাজীপুরের শ্রীপুরে ৬ দিনে ৩ হত্যাকাণ্ড, আহত জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিক

নিজস্ব সংবাদদাতা, গাজীপুর

জমি নিয়ে বিরোধ, বাড়িতে দুর্বৃত্তের হামলা ও গ্যাস সিলিন্ডার কেনা নিয়ে বাক বিতণ্ডার জেরে গাজীপুরের শ্রীপুরে গত ২১  জুলাই থেকে ২৬ জুলাই ছয় দিনে তিনটি হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকও আহত হয়েছেন।
নিহতরা হলেন, গাজিয়ারন গ্রামের কৃষক অব্দুল আজিজ (৫৫), শ্রীপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সদস্য বেড়াইদেরচালা গ্রামের সৈয়দ মাহবুব হোসেন মাসুম আহমেদ (২২) ও তেলিহাটী উদয়খালী গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন।
প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শফিউল্লাহ শফিক।
জমি নিয়ে বিরোধ

শ্রীপুরের গাজিয়ারন গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধে গত ২৩ জুলাই কৃষক আব্দুল আজিজের সঙ্গে প্রতিপক্ষদের বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। এক পর্যায়ে তা বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ঘটনায় আব্দুল আজিজসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। আহতদের প্রথমে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে গুরুতর আহত দুজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আব্দুল আজিজের অবস্থার অবনতি হলে তাকে রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার বেলা ১১টার দিকে তিনি মারা যান।
শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সজীব হাসান বলেন, 'এ ঘটনায় আব্দুল আজিজের ছেলে বাদী হয়ে শ্রীপুর থানায় মামলা করেছেন। সোমবার রাতেই দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।'

বাড়িতে দুর্বৃত্তের হামলা
শ্রীপুর পৌরসভার বেড়াইদেরচালা গ্রামের আবুল হাসেমের ছেলে সৈয়দ মাহবুব হোসেন মাসুম আহমেদ (২৫) ঈদের দিন রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাসায় ফেরেন। তিনি তার কক্ষের দরজা খোলা দেখে কিছু বুঝে উঠার আগেই চারপাশ থেকে সাত-আট জন দুর্বৃত্ত তাকে ঘিরে মারপিট শুরু করে। পরে তাকে বাড়ির বাইরে বরে করে লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে আহত করে পালিয়ে যায়। হামলাকারীরা আগে থেকেই বাড়ির অন্যান্য ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকিয়ে দেওয়ায় তার চিৎকার শুনে বাড়ির লোকজন তাকে উদ্ধার করতে পারেননি। পরে তিনি নিজেই আহত অবস্থায় বাইরে থেকে আটকে দেওয়া একটি ঘরের দরজা খুলে দিয়ে অচেতন হয়ে পড়েন।
শ্রীপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ ইমতিয়াজ ভূঁইয়া বলেন, 'মুমূর্ষু অবস্থায় মাসুম আহমেদকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসাইয়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি মারা যান। মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে।

গ্যাস সিলিন্ডার কেনা নিয়ে বিতণ্ডা
শ্রীপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ ইমতিয়াজ ভূঁইয়া বলেন, 'অভিযোগ আছে গত ২২ জুলাই বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় তেলিহাটী চৌরাস্তার ভাই ভাই ট্রেডার্স থেকে একটি গ্যাস সিলিন্ডার কেনা নিয়ে দোকান মালিক মোজাম্মেলের সঙ্গে স্থানীয় তোফাজ্জলের বাক-বিতন্ডা হয়। এক পর্যায়ে তারা মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। খবর পেয়ে তোফাজ্জলের ভাই মোফাজ্জল সরকার ও তাইজু সরকার এসে দোকানে হামলা চালায়। তারা দোকানের ক্যাশবাক্সসহ আসবাব ভাঙচুর করে। এক পর্যায়ে ক্যাশবাক্সের ড্রয়ার ভেঙে নগদ টাকা লুট ও পেট্রোল ঢেলে দোকানে অগ্নিসংযোগ করে। এতে দোকান মালিক ও তার তিন ভাই দগ্ধ হয়। এ ঘটনায় দোকান মালিক মোজাম্মেল হোসেনের ভাই তোফাজ্জল হোসেন বাদী হয়ে তিন জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১০-১২ জনকে অভিযুক্ত করে ২৩ জুলাই শুক্রবার সকালে শ্রীপুর থানায় মামলা করেন। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার দিবাগত রাতে আরিফ মৃত্যুবরণ করেন।'

gazipur.jpg
অগ্নিদগ্ধ হয়ে চারদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর আরিফ হোসেন মারা যান। ছবি: সংগৃহীত

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শ্রীপুর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. শাহজাহান মন্ডলের ছেলে তাজিম মন্ডলের সঙ্গে রোববার সন্ধ্যায় শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি মোটর পার্টসের দোকানে পণ্য কেনা-বেচা নিয়ে বাক বিতণ্ডা হয়।
এ সময় সাবেক ওই কাউন্সিলর খবর পেয়ে এগিয়ে এলে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের স্থানীয় প্রতিনিধি ও কাউন্সিলরের বোনের ছেলে আল-আমীন ভিডিও ধারণকালে তিনিও হামলার শিকার হন।
আহতদের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় দুটি মামলা পৃথক হয়েছে বলে জানান, শ্রীপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ ইমতিয়াজ ভূঁইয়া।

গত কয়েকদিনে শ্রীপুরে পিটিয়ে ও অগ্নিসংযোগে তিনটি হত্যা এবং একাধিক হামলায় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক আহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শ্রীপুরের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহ শফিক সাংবাদিকদের বলেন, 'সবগুলো হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মামলা হয়েছে। পুলিশ একটি হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। মাসুম আহমেদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে। অন্যসব ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।'