জনপ্রিয়তার কারণেই আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে: এরশাদুলের বাবা

নিজস্ব সংবাদদাতা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ইউনিয়ন শাখা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এরশাদুল হক ও তার সহযোগী বাদল সরকারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি তার পরিবারের।

নিহত এরশাদুলের বাবা নাটঘর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল কাশেম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'মোটরসাইকেলে আসা লোকজন খুব কাছ থেকে তাঁদেরকে গুলি করে। এই কারণেই গুলি মিস হয়নি। এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'র বেশ কয়েকজন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী আছে। আমরা কারো সঙ্গে বিরোধ না করলেও আমার ছেলের জনপ্রিয়তার কারণে প্রার্থীদের কেউ-না-কেউ তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলো। জনপ্রিয়তার কারণেই আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।'

এরশাদুলের ছোট ভাই ও মামলার বাদী মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, 'এরশাদুলকে বহনকারী মোটরসাইকেলের পিছনে আরেকটি মোটরসাইকেলে ছিলাম আমি। ঘটনার এক মিনিট পরে এসে আমি সেই মোটরসাইকেলের আলোয় হামলাকারীদের কয়েকজনকে চিনতে পেরেছি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা এ ধরণের ঘটনা ঘটিয়েছে।'

এরশাদুলের চাচাতো ভাই মো. ইসমাইল বলেন, 'আমাদের চাচাতো ভাই মো. সাইফুল্লাহকে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বাদী ছিলেন এরশাদুল। ২০ জনের নামে দায়ের করা মামলার কয়েকজন পলাতক আসামি সম্প্রতি গ্রামে ফিরলে তাদের আটক করে পুলিশ। নির্বাচনের পাশাপাশি পূর্বের এই বিরোধের জেরে এরশাদুল ও তার সহযোগী বাদল খুনের শিকার হয়েছেন।'

নান্দুরা গ্রামের বাসিন্দা মো. নূরুল ইসলাম বলেন, 'এরশাদ খুব ভালো ছেলে ছিলো, অনেক মিশুক ছিলো। সবাইকে সাহায্য করতো। নির্বাচন করলে নিশ্চিত পাশ করতো। আমরার ইউনিয়নের ১১টা গ্রামের মানুষ তার পক্ষে ছিলো।'

নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুর রশীদ জানান, এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ১ জনকে আটক করেছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির চারটি খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার রাত সোয়া ১২টার দিকে নিহত এরশাদুলের ছোট ভাই আক্তারুজ্জামান বাদী হয়ে ১৫ জনের নামে ও অজ্ঞাত আরও ৩-৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এলাকায় এখনও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। 

ওসি আরও জানান, মামলার এজাহারভুক্ত আসামির মধ্যে ২ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী আছেন। এরা হলেন- সজীব চৌধুরী (শামীম আব্দুল্লাহ) ও রফিকুল ইসলাম রতন। তারা ঘটনার পর থেকেই পলাতক। এছাড়াও এই ঘটনার পর থেকে আরো চারজন চেয়ারম্যান প্রার্থী এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। নিহত এরশাদুলও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, 'আসামীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। মাঠে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। সামগ্রিক বিষয়ে যেহেতু তদন্ত চলছে, তদন্তের স্বার্থে এখন কিছু বলা ঠিক হবে না।'

সৌদি যাওয়া হলো না বাদলের

নিহত বাদল সরকারের বোন রিতু সরকার বলেন, 'আমার ভাই সৌদি আরব যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ভিসার প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ। বাড়িতে থেকে তিনি এরশাদ ভাইয়ের বিভিন্ন কাজ দেখাশুনা করতেন। এরশাদ ভাইয়ের শত্রুরা আমার ভাইকে মাইরা ফালাইছে। ভাইয়ের সৌদি যাওয়ার স্বপ্ন শেষ কইরা দিছে।'

এর আগে, নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর বাজার এলাকায় গত শুক্রবার রাত পৌনে ১০টার দিকে দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে নান্দুয়া গ্রামের এরশাদুল হক (৩৫) ও তার সহযোগী বাদল সরকারকে (২৩) লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ বাদল নিহত হন। পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান এরশাদুল। নান্দুয়া গ্রামের সন্তোষ সরকারের ছেলে বাদল সরকার এরশাদুলের প্রতিবেশীও ছিলেন। নিহত বাদল ঠিকাদারী ব্যবসাসহ ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজে এরশাদুলকে সহায়তা করতেন।

জানা গেছে, ষষ্ঠধাপে নবীনগরের এই ইউনিয়নে নির্বাচন হওয়ার কথা আছে। কিন্তু, এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ৬ জন ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এলাকা থেকে গা-ঢাকা দিয়েছেন। 

এদিকে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী এরশাদুল ও তার সহযোগী খুন হওয়ার পর থেকে এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আকস্মিক এই হত্যাকাণ্ড এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। গ্রামে মানুষের চলাচল কমে যাওয়ার পাশাপাশি নাটঘর বাজারের বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ আছে।