‘আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানির অফিসে বসে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা রচনা করেছিলেন’
ইন্সুরেন্স কোম্পানির প্রতি সব সময় আলাদা অনুভূতি রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানির অফিসে বসে শেখ মুজিব ৬ দফা রচনা করেছিলেন। যে ৬ দফা আসলে আমাদের বাঙালির মুক্তির সনদ, আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি।
জাতীয় বীমা দিবস-২০২২ উদযাপন উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কন্দ্রে (বিআইসিসি) আয়োজিত অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২৭ ডিসেম্বর মুক্তি পাওয়ার বঙ্গবন্ধু '৬০ সালের ১ মার্চ ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি নেন। আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানির তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে শাখা প্রধান হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রাজনৈতিক নেতা, তার রাজনীতি যেমন নিষিদ্ধ ছিল আবার ঢাকার বাইরে যেতে পারবেন না। ঢাকার বাইরে যেতে গেলে পুলিশের পারমিশন লাগতো। তার যাতায়াতও নিয়ন্ত্রিত ছিল। ইন্সুরেন্স কোম্পানির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সেখানে যখন তিনি চাকরি শুরু করেন, তাজউদ্দিন আহমেদ তখন রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটা চাকরি নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে এসে আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি দেন। আমাদের সাবেক মেয়র হানিফ, ছোটবেলা থেকে আমাদের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ট ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকেও নিয়ে এসেছিলেন পিএ হিসেবে।
তিনি বলেন, আমার বাবা জেলে এবং বাইরে থাকলে রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। বোধ হয় এই সময়টা, সেটাও বেশি দিন না ৬০ সাল থেকে ৬২ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারের বাইরে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। আমাদের জীবনে বোধ হয় সব থেকে ভালো সময় বাবাকে কাছে পাওয়ার। আমার মা-ও বলতেন ইন্সুরেন্সে কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন, ভালো বেতন পাচ্ছেন, সচ্ছলভাবে সংসার চালাতে পারছেন, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া চালাতে পারছেন- সে জন্য আমার মা খুব খুশি ছিলেন।
তবে রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা পছন্দ করতেন না কিন্তু মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে বলতেন, আইয়ুব খানকে আমি ধন্যবাদ জানাই আমাকে অন্তত দুটো বছর সংসার করার সুযোগ দিয়েছিল। আমাদের জীবনের সঙ্গে এ জন্য ইন্সুরেন্স কোম্পানি যথেষ্ট জড়িত। সে সময় ধানমন্ডির বাড়ির জায়গাটা মাত্র ২ হাজার টাকা দিয়ে নেওয়া ছিল। সেখানে দুটি কামরা তৈরি করেন, আমাদের কখনো কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চাইতো না। এ নিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়, মাত্র ৩ দিনের নোটিশ দিয়ে মার্শাল ল' হওয়ার পর যে বাসায় আমরা ছিলাম সেগুন বাগিচায়, সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। সিদ্ধেশ্বরীতে যেখানে রাস্তা-ঘাট কিছু ছিল না সেখানে দুটি কামরায় আমরা উঠি। এরপর সেগুন বাগিচার আড়াই কামরার একটা ফ্ল্যাটে আমরা উঠি। আমার বাবা সেখানেই আমাদের সঙ্গে ছিলেন, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করার সময় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রস্তুতি নিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি বসে থাকেননি, যদিও নিষেধাজ্ঞা ছিল কিন্তু ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার ফলে একটা সুযোগ হয়েছে তখনকার পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় বড় জেলায় ইন্সুরেন্স কোম্পানির কাজে তিনি যেতেন। পারমিশন নিয়ে যেতে হতো, কিন্তু যাওয়ার সুযোগটা সৃষ্টি হয়। এই সুযোগে তিনি যে কাজগুলো করেছেন সেটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে তিনি স্বাধীন করবেন, মুক্ত করবেন এই চিন্তা-চেতনা তার সব সময় ছিল। সারা বাংলাদেশের ছাত্র সমাজকে সুসংহত করা এবং স্বাধীনতার জন্য প্রতিটি জেলায় একটি করে নিউক্লিয়াস ফর্ম করেন। লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার জন্য যে সংগ্রাম হবে বা আগামীতে যদি যুদ্ধ হয় তার জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া।
বেতনের টাকাটা আমার মায়ের হাতে তুলে দিতেন, তা ছাড়া বাকি যা সবই খরচ করতেন দলের জন্য। যেহেতু রাজনৈতিক দল ছিল না। ধীরে ধীরে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে সব প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অনেকে প্রশ্ন করে ৬ দফা কে লিখলো, কীভাবে লিখলো, কারা কারা ছিল, হয়তো অনেক বেশি যোগ্য ছিল—বিষয়টা তা না। এই আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানির অফিসে বসে শেখ মুজিব এটা রচনা করতেন। এটা টাইপ করেছিল মোহাম্মদ হানিফ। দিনের পর দিন বসে বসে তিনি এই ৬ দফা প্রণয়ন করেন। হানিফ অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন, কোনো দিন তার কাছ থেকে একটি শব্দও বের করতে পারেনি। যে ৬ দফা আসলে আমাদের বাঙালির মুক্তির সনদ, আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি। সেই ভিত্তিটাই তিনি সেখানে বসে তৈরি করেন। ইন্সুরেন্স কোম্পানি চাকরি নিয়ে সুন্দর একটা পরিবেশ পেয়েছিলেন বলেই তার পক্ষে বোধ হয় এটা প্রণয়ন করা সহজ হয়েছিল। এ জন্য ইন্সুরেন্স কোম্পানির প্রতি সব সময় আমাদের একটা আলাদা অনুভূতি রয়েছে, এটা বাস্তব—বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু মানুষের জীবন, প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় নজর দেন এবং বীমা শিল্পকে সুসংগঠিত করার নানা উদ্যোগ নেন। আমাদের এখানে তখন যত ইন্ডাস্ট্রি, যত ব্যাংক, যত বীমা তার মূল মালিক ছিল পাকিস্তানিরা। স্বাধীনতার পর বলতে গেলে সেগুলো অনেকটা এতিমের মতো হয়ে যায়। যে কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বীমা শিল্পকে জাতীয়করণ করেন। তিনি বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স জাতীয়করণ আদেশ, ১৯৭২ জারি করে ৪৯টি দেশি-বিদেশি বীমা কোম্পানিকে জাতীয়করণ করে সুরমা, রূপসা, তিস্তা এবং কর্ণফুলী নামে ৪টি বীমা করপোরেশন গঠন করেছিলেন। তিনি যদি এই পদক্ষেপগুলো না নিতেন তাহলে বীমা কোম্পানিগুলো সব নষ্ট হয়ে যেত। পরবর্তীতে ইন্সুরেন্স কোম্পানি আইন, ১৯৭৩ তিনি প্রণয়ন করেন। এই ৫টি করপোরেশনকে ভেঙে তিনি জীবন বীমা করপোরেশন নামে এবং নন-লাইন বীমা সেবা প্রদানের জন্য সাধারণ বীমা করপোরেশন নামে দুটি পৃথক বীমা করপোরেশন গঠন করেন। বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ভালোভাবে তত্ত্বাবধান করা হয় সে জন্য তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বীমা অধিদপ্তর গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স একাডেমিও প্রতিষ্ঠা করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর এই ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলোর দিকে বিশেষভাবে নজর দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোনো অ্যাকচুয়ারি ছিল না। এই সাবজেক্টে যারা পড়াশোনা করে বিদেশে তারা এত দ্রুত চাকরি পেয়ে যায় যে কেউ আর দেশে ফিরে আসে না। আমাদের লক্ষ্য ছিল আমরা ভালো দক্ষ কাউকে নিয়ে আসবো। আমাদের যারা আছেন, তারাও ভালো কাজ করছেন। একটু সুযোগ পেলে ভালো করতে পারেন সেটাও প্রমাণ হয়েছে। আমরা যেহেতু জনগণের সরকার, জনগণের জীবন মান উন্নত করতে চাই এবং আর্থিক খাতে নানা ধরনের প্রণোদনা দিতে চাই, সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই সে জন্য আমরা মানুষের নিরাপত্তা দিকে দৃষ্টি রেখে এই খাতটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেই। আমরা দ্বিতীয়বার যখন সরকার গঠন করি, বিদেশ থেকে অ্যাকচুয়ারি নিয়ে এসে ইন্সুরেন্স কোম্পানিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে এর সেবা যেন মানুষ পায় আর দক্ষভাবে যাতে এই সেক্টরটা গড়ে ওঠে তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিই। আমরা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করি। সেই সঙ্গে জাতীয় বীমানীতি, ২০১৪ প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিই।
এ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের চালু করা বিভিন্ন বীমার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই শিক্ষা বীমার ব্যবস্থা আছে। আমাদের অভিভাবকদের অকাল মৃত্যু বা শারীরিক অক্ষমতায় শিক্ষার্থীরা অনেক সময় পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে পারে না, কাজ পায় না। সে কারণে বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বীমা চালু করা হয়েছে।
বীমা খাতকে ডিজিটালাইজড করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি, বীমা খাতটা সম্পূর্ণভাবে অটোমোশনে আনতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বীমা খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে এর ব্যাপক প্রচার হওয়া দরকার। যেন মানুষ বীমা করে। বীমা নিয়ে মানুষের আস্থা বাড়াতে কাজ করতে হবে, গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সেবা দিতে হবে। এই সেবাটা যদি মানুষ হাতের কাছে পায়, অনেকের জীবন নিশ্চিত হতে পারে। সে জন্য সরকারি-বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোকে কাজ করতে হবে।
আমার নিজের পর্যবেক্ষণ, ছোটবেলা থেকে দেখেছি হঠাৎ পাটের গুদামে আগুন লেগে যেত। আর আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে সব পাট পুড়ে গেছে, বীমা থেকে বিশাল অংকের টাকা নিত। একবার খোঁজ করে দেখা গেল, মালিকরা পাট বিক্রি করে আগুন লাগিয়ে দিত। এরপর একটা বিশাল অংকের টাকা দাবি করে বসতো। একই ঘটনা আমি পেয়েছি গার্মেন্টস সেক্টরে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেল ঘন ঘন শুধু আগুন লাগে। আমার সন্দেহ হলো, আমি নাম বলে কাউকে বিব্রত করবো না। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমি নজরদারি শুরু করলাম। ঠিক দেখা গেল, ঘটনা তাই। পয়সা দিয়ে একটা লোক ঠিক করে আগুন লাগিয়ে বিরাট প্রচার করে, পত্র-পত্রিকায় লিখে বিশাল অংকের টাকা দাবি করে। সেটা আমি এক পর্যায়ে আটকালাম। ভালোভাবে তথ্য নিলাম। এ ধরনের ঘটনা ঘটে। যারা দুই নম্বরি করে টাকা নিতে চায় সেগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। বীমা মানে হলো আমানত, সেটা যেন যথাযথভাবে মানুষ পেতে পারে। এটা পেতে যেয়ে যেন ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে, বলেন শেখ হাসিনা।