মাটির মানুষ, রকের রাজা: ফিরে দেখা আজম খান

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

মাহবুবুল হক খান নামটা বললে অনেকেই হয়ত চিনবেন না। তবে যদি বলা হয় ‘আজম খান’, চিনতে পারবেন অনায়াসে। আজম খানকে সাধারণভাবে বলা হয় পপ সম্রাট। কিন্তু সত্যটা হলো—সম্রাট তিনি ছিলেন রকের, তাই রক সম্রাট বলাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত। বাংলা রক তার শিকড় বিস্তার করেছিল আজম  খানের ছায়ায়।

একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খান। ছিলেন খালেদ মোশাররফের অধীনে ২ নং সেক্টরের গেরিলা যোদ্ধা। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে গাইতে শুরু করলেন গান। তখন বাংলাদেশে পপ ধাঁচের সংগীত ডানা মেলতে শুরু করেছে। জিংগা শিল্পী গোষ্ঠী কিংবা সুরেলা (পরবর্তীতে সোলস) তখন চমৎকারভাবে গান করে যাচ্ছে।

এর ভেতরই পপের বাইরে রকেও ঝড় তুললেন আজম খান। শুরুটা অবশ্য করেছিলেন পপ দিয়েই। ঢাকা রেকর্ডস থেকে ১৯৭৩ সালে আলম খানের সংগীতে তার দুটো গান বের হলো। ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’ আর ‘হাইকোর্টের মাজারে।’ প্রথমটা ফাংক-পপ আর দ্বিতীয়টা পপ-রক।

গান প্রকাশ হতেই তুমুল জনপ্রিয়তা। গানের ব্যাকরণ নয়, আজম খান তার কণ্ঠে ধারণ করলেন তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নয়ন মুন্সী, ফোয়াদ নাসের বাবু, পিয়ারু খান, কাজী হাবলুর মতো যন্ত্রশিল্পীদের মেধা ও শ্রম।

আজম খানের আরো অনেক শ্রোতাপ্রিয় গান আছে। এর ভেতর সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে (বাংলাদেশ)’। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় এই গানটি বিটিভিতে গেয়ে দেশব্যাপী আলোড়ন ফেলে দেন আজম খান। রক সংগীতের প্রকৃত বক্তব্যধর্মী স্বাদও দেন শ্রোতাদের। তবে এর পরিণামে বিটিভি থেকে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ হন তিনি। ১৯৭৬ সালের আগে বিটিভিতে তাকে আর দেখা যায়নি।

তবে এরপর আজম খান আবারো গান করতে থাকেন। বিভিন্ন সময়ে শ্রোতাপ্রিয় গান করেছেন তিনি। ‘চুপ চুপ চুপ অনামিকা চুপের’ মতো পপ-রক গান আছে, তেমনি আছে ‘পাপড়ি কেন বোঝেনার’ মতো চমৎকার মেলো রক গান। আশির দশকে ‘পাপড়ি’ কিংবা ‘আলাল ও দুলালের’ মতো গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়৷ তবে আশির দশকের একেবারে শুরুর দিকে বিটিভিতে আজম খানের ‘জীবনে কিছু পাবো না রে’ গানটি প্রচারিত হলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। নয়ন মুন্সীর অনবদ্য গিটার বাদনে সমৃদ্ধ এই গানটি ছিল হার্ড রক। আজম খানের উদাত্ত হাহাকার যেন তরুণদের ভেতরে পুষে রাখা চিৎকারকেই ছড়িয়ে দেয় পুরো দেশে। বাংলা ভাষার প্রথম হার্ড রক ধরা হয় এই গানটিকে৷

একইসঙ্গে এ সময়ে তিনি রকের উন্মাদনায় শ্রোতাদের ভাসিয়ে দেন ‘এত সুন্দর দুনিয়ায়’ গানটিতে। সুফি ধাঁচের গান, কাওয়ালী বা ফোক গানে যে মাদকতা ও উন্মাদনা থাকে, আজম খান রকে নিয়ে আসেন সেই উন্মাদনা। এই গানে শেষ এক মিনিটে রকেট মণ্ডলের অনবদ্য গিটার বাদন আর আজম খানের সেই উদাত্ত গলা শুনলে শ্রোতারাও তার ভেতর হারিয়ে যান। এমন উন্মাতাল রক গান বাংলায় বলতে গেলে নেই। এছাড়াও উল্লেখ করা যায় ‘আমি যারে চাই রে’ গানটির কথা। গানটিতে সফট রকের সঙ্গে আজম খানের গায়কীতে পাওয়া পায় বাউলিয়ানা ও সুফি গানের ছাপ।

আবার নব্বই দশকে মেলো রক গান ‘হারিয়ে গেছে খুঁজে পাবো না’ বা ‘এই গান শেষ গান’-এ আমরা শুনি তার আকুলতাপূর্ণ দরদী কণ্ঠ। ‘হারিয়ে গেছে’ গানটির স্থায়ী অংশটি ছিল মাত্র এক লাইনের। বাংলা গানে এই ব্যাপারটি একমাত্র এই গানেই আছে। শূন্য দশকের পর ‘সময় এখন বর্ষাকালের’ মতো ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যধর্মী গান করেছেন। পপ-রকের চমৎকার মিশ্রণ আমরা দেখতে পাই গানটিতে।

আজম খান গানে একজন শিল্পী ছিলেন তা নয়, তিনি শিল্পী ছিলেন তার সমগ্র যাপনে। বাজার ব্যবস্থার গড়ে তোলা ‘তারকা’ নন, তিনি ছিলেন ‘নক্ষত্র’। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন, মাছের বাজারে গিয়ে দরদাম করে মাছ কিনতেন, চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে মহল্লার লোকদের সঙ্গে আড্ডা মারতেন। এক কথায়, মাটির মানুষ ছিলেন আজম খান। সে সময়ের কোনো কোনো শিল্পীদের প্রবণতা ছিল বাংলাকে বাদ দিয়ে ইংরেজিতে গান করার। আজম খান সবসময়ই এই ধারণার বিপরীতে ছিলেন। তিনি অনুজ শিল্পীদের বাংলায় রক-পপ গাইতে উৎসাহ দিতেন। নিজের ব্যান্ডের নামও রেখেছিলেন ‘উচ্চারণ’।

১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জন্ম নেওয়া আজম খান ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান ২০১১ সালের ৫ জুন। আজ তার ৭৬ তম জন্মবার্ষিকী। বাংলা রক গানে তিনি এনেছিলেন স্বকীয়তা। এদেশের ফোক গান ও মাজার-দরগাহের গানের সঙ্গে মিশিয়েছিলেন রক ও পপ গানকে।

আর এর মাধ্যমে বাংলা রক গানকে আজম খান দিয়েছিলেন নিজস্ব ভাষা। যার উত্তরাধিকার এদেশের সংগীতজগত বহন করে চলেছে আজও।