শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যাদের হারাল ইরান

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। দুই দেশই ইরানে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যে এই অভিযান চালিয়েছে বলে জানানো হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েল জানিয়েছে, বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলায় ইরানের একাধিক শীর্ষ নেতাও নিহত হয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম এবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ইসরায়েল নাম দিয়েছে ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’। বিপরীতে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ফোর’ নামে পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।

নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরানের জনগণের জন্য নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধারের এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ।’

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন। ইরান আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, আবদুল রহিম মুসাভি, আজিজ নাসিরজাদেহ, আলি শামখানি ও মোহাম্মদ পাকপুরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি

ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি জানিয়েছে, হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।

খামেনি ছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে ‘ইতিহাসের অন্যতম অশুভ শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

১৯৩৯ সালে মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া খামেনি একজন ধর্মীয় আলেমের সন্তান ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) গঠনে ভূমিকা রাখেন।

১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর ধর্মীয় পরিষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে, যদিও তখন তিনি সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ধর্মীয় মর্যাদায় পৌঁছাননি। পরে সংবিধান সংশোধন করে তাকে নির্বাচনের পথ তৈরি করা হয়।

ক্ষমতায় এসে খামেনি ইরানের রাজনীতি ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতাসহ বৈদেশিক নীতিতে কঠোর অবস্থান নেন।

আবদুল রহিম মুসাভি

আবদুল রহিম মুসাভি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর (আরটেস) নেতৃত্বে ছিলেন।

২০১৭ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তাকে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন।

তিনি স্থল, নৌ ও বিমান—এই তিন বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম তদারকি করতেন।

ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সামরিক প্রস্তুতিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

আজিজ নাসিরজাদেহ

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ ছিলেন দেশটির বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এবং শীর্ষ সামরিক কৌশলবিদদের একজন।

দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা নাসিরজাদেহ প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক আধুনিকায়ন তদারকি করতেন।

আলি শামখানি

৭০ বছর বয়সী আলি শামখানি ছিলেন ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের সচিব।

২০২৩ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই তিনি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি আইআরজিসি নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান ছিলেন এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

গত বছরের যুদ্ধে ইসরায়েল তাকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল এবং প্রথমে তাকে নিহত মনে করা হয়েছিল।

মোহাম্মদ শিরাজি

মোহাম্মদ শিরাজি ছিলেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সামরিক ব্যুরোর প্রধান।

১৯৮৯ সাল থেকে তিনি খামেনির সামরিক দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতার সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতেন।

মোহাম্মদ পাকপুর

মোহাম্মদ পাকপুর ছিলেন আইআরজিসি কমান্ডার।

ইসরায়েলের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ধ্বংসের ইরানি পরিকল্পনার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি।

তিনি ইরানের প্রধান সামরিক বাহিনী পরিচালনা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন ব্যবস্থার তদারকি করতেন। বিদেশে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিও তার সমর্থন ছিল।

গত মাসের বিক্ষোভ দমনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

হোসেইন জাবাল আমেলিয়ান

হোসেইন জাবাল আমেলিয়ান ছিলেন ডিফেন্সিভ ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (এসপিএনডি) প্রধান।

তিনি ইরানের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও অস্ত্র উন্নয়নের দায়িত্বে ছিলেন বলে বর্ণনা করা হয়েছে, যার মধ্যে পারমাণবিক, জৈব ও রাসায়নিক প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল।

রেজা মোজাফফারি-নিয়া

রেজা মোজাফফারি-নিয়া ছিলেন এসপিএনডির সাবেক প্রধান।

পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন প্রচেষ্টায় তার ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়।

সালেহ আসাদি

সালেহ আসাদি ছিলেন ইরানের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

জরুরি কমান্ড কাঠামোর গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে তিনি জেনারেল স্টাফের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ইরানের পররাষ্ট্র কৌশল নির্ধারণে যুক্ত ছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।

গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে চলা ১২ দিনের যুদ্ধে দেশটির শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ২০১ জন নিহত এবং ৭৪৭ জন আহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় টিভিতে জানানো হয়েছে।