ইসি আইন ‘বাকশালের মতোই’ ৭ দিনে সংসদে পাস: মির্জা ফখরুল
সংসদে পাস হওয়া নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইনের প্রক্রিয়াকে 'বাকশালের মতোই' বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন-২০২২ এর প্রসঙ্গে রোববার বিকালে এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, 'আজ ১৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে যে কাজটা ১৯৭৫ সালে করতে পারে নি, সেই কাজ করার জন্য তারা (সরকার) ধীরে ধীরে পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে গেছে। একটা মোড়ক রেখেছে সামনে, একটা ছদ্মবেশ-অবয়ব-লেবাস যে বহুদলীয় গণতন্ত্র এখানে আছে। আসলে এখানে কোনো বহুদলীয় গণতন্ত্র নেই।'
তিনি বলেন, 'একটা নির্বাচনের লেবাস, যে নির্বাচন তারা দুটি ইতিমধ্যে করেছে যেখানে সত্যিকার অর্থে জনগণ তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার পর্যন্ত পায়নি এবং আবার একটা আইনও তৈরি করল কয়েকদিন আগে। ঠিক সেই বাকশালের মতোই। যেটা ১১ মিনিটে ছিল, এটা ৭ দিনের মধ্যে করে তারা একটা আইনও পাস করে নিলো সংসদে।'
গত ২৭ জানুয়ারি সংসদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২ পাসের পর রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেওয়ার পর ২৯ জানুয়ারি রাতে গেজেট প্রকাশ করে সরকার।
সভায় মির্জা ফখরুল বলেন, 'বাকশাল একটি গালিতে পরিণত হয়েছে। কেন? এই বাকশালের মধ্য দিয়ে সেদিন দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল, রাজনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল, স্বপ্নকে ধ্বংস করা হয়েছিল। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে তারা দেশ ও জাতিকে গভীর অন্ধকারের ভেতরে নিয়ে গিয়েছিলে।'
'আমরা আজকে ঠিক একইভাবে দেখছি আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দেশের অর্থনীতিকে দলীয়করণ করেছে, লুটতরাজের অর্থনীতিতে পরিণত করেছে। আমরা দেখছি যে সব রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর হাতে দমন করে বিশেষ করে যারা স্বাধীনচেতা গণতান্ত্রিক মানুষ তাদের হত্যা-গুমের মধ্য দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে, প্রতিবাদের ভাষা বন্ধ করা হচ্ছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো আইন তৈরি করে যারা কথা বলতে চান, তাদের কথা বলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে,' যোগ করেন তিনি।
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, 'আজকে ৪৭ বছর পরে আবার বাকশাল প্রতিষ্ঠার যে নীলনকশা শুরু হয়েছে, এই নীলনকশাকে আমাদের প্রতিহত করতে হবে এবং সেটা আমাদের জনগণকে সঙ্গে নিয়েই। আমাদের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে, বিএনপির নেতৃত্বে আমাদের এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'একটা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, একটা উন্নত বাংলাদেশ, একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখবার যে স্বপ্ন আমরা প্রতি মুহূর্তে দেখি, সেই স্বপ্নকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আজকে আমাদের সবাইকে ত্যাগ স্বীকার করে দৃঢ় ঐক্যবদ্ধতার মধ্য দিয়ে সব রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রে নিয়ে সব রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একখানে নিয়ে এসে সব গণতন্ত্রকামী মানুষকে একখানে নিয়ে এসে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। এই ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী বাকশালের নব্য প্রেতাত্মার সরকার সরিয়ে সত্যিকারের জনগণের সরকার, জনপ্রতিনিধির পার্লামেন্ট গঠন করতে হবে।'
তিনি বলেন, 'আমরা পরিষ্কার করে বলেছি যে এই সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত এবং নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ দেশে আবার নতুন করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন-সোপান আমরা নির্মাণ করতে পারি আমাদের নেতা তারেক রহমান সাহেবের নেতৃত্বে।'
সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, 'আওয়ামী লীগ আর গণতন্ত্র এক সঙ্গে যায় না। ১৯৭২ থেকে ৭৫, ৭৫ এ বাকশাল প্রতিষ্ঠা এবং গত ১৪ বছর আওয়ামী লীগের এই শাসন, বিনা ভোটে নির্বাচিত সরকার, রাতের অন্ধকারে ভোট ডাকাতির সরকার আজকে গায়ের জোরে বাংলাদেশ পরিচালনা করছে। সেজন্য বাংলাদেশেও আজকে বাকশালের চিন্তাচেতনা অলিখিতভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এই আওয়ামী লীগ তথা এই সরকার আর গণতন্ত্র পাশাপাশি যেতে পারে না। তারা স্বৈরাচারী, তারা গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি। গণতন্ত্র নেই বলেই দেশ একটা অন্ধকারের গহ্বরের কিনারায় পৌঁছেছে। এ থেকে দেশকে রক্ষা করতে জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। এখন সময় এসেছে দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে এই সরকারকে সরানোর।'
ভার্চুয়াল এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান '১৯৭৫: বাকশাল' বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন এবং বইটি দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহবান জানান।
বইটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশন সেন্টারের পরিচালক সাবেক সাংসদ জহির উদ্দিন স্বপন।
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনে দলের জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আবদুস সালামের পরিচালনায় এই ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বক্তব্য রাখেন।