‘এমএন লারমার জীবন ও দর্শন এখনো প্রাসঙ্গিক’

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

সাবেক সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণ সভায় বক্তারা বলেছেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সামগ্রিক গঠন, গড়ন ও সামগ্রিক রূপান্তরের জন্য এমএন লারমার জীবন ও দর্শন এখনো প্রাসঙ্গিক।

এমএন লারমার মৃত্যুবার্ষিকীতে আজ বিকেলে ঢাকার সেগুন বাগিচায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন অডিটোরিয়ামে শ্রদ্ধাঞ্জলি, স্মরণসভা, প্রতিবাদী গান ও প্রদীপ প্রজ্বলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মানবাধিকার কর্মী ও এমএন লারমার ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক খুশি কবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় স্মরণসভায় আরও বক্তব্য রাখেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি ঊষাতন তালুকদার, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির, প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং প্রমুখ।

শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নাতিদীর্ঘ কিন্তু এক জীবন কাটিয়েছেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কেন প্রাসঙ্গিক জাতীয় কমিটি আজ এই প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সামগ্রিক গঠন, গড়ন ও সামগ্রিক রূপান্তরের জন্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জীবন ও দর্শন এখনো প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ কেন্দ্রিক একজাতি একদেশ তত্ত্বকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সবসময় প্রশ্ন করেছেন।

ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, 'এটা আমাদের বেদনার একটি দিন, দুঃখের দিন। এই দিনে জাতীর সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। জুম্ম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কঠিন কাজটিও তিনি সম্পাদন করেছেন। জনসংহতি সমিতির ছাত্র-যুব-নারী শাখাকে সংগঠিত করেছেন। জুম্ম জনগণের স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতেও তাকে অনেক শ্রম দিতে হয়েছে। তার সহপাঠী, জেলমেট হিসাবে আমি গর্বিত।'

এমএন লারমার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনার দূতিয়ালির কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমাকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু বাঙালি উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ধর্মান্ধ নেতৃবৃন্দের দাপটে তখন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে অপমান করা হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পরবর্তীতে ভুল ভেঙেছিল। তাই আবার মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে ডেকে পাহাড়ে বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাস দিলেন। সেই বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের সংক্ষিপ্ত রূপই পার্বত্য চুক্তি।

সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম বলেন, মানুষের প্রতি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বিরাট সহমর্মিতা ছিল এবং গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিল তার। আমাদের খুব সৌভাগ্য 'ইন্টিগ্রেটেড বাংলাদেশ' যেখানে বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি ও বহু জাতির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠান জন্য তাদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও আমরা একই চিন্তায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার চিন্তাগুলো নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার যিনি শোষণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ বলেন, 'ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশ খুবই বৈচিত্র্যময়। ঋতুর মধ্যে যেমন বৈচিত্র্য তেমনি জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যেও বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদী প্লাবন যেমন দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছিল তেমনি এখন ধর্মীয় প্লাবন পুরো বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংসদে বলা কথাগুলো আজও অক্ষরে অক্ষরে সত্য।'

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি ঊষাতন তালুকদার বলেন, 'মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তার জীবন ও যৌবন সবকিছু এদেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষের জন্য দিয়ে গেছেন। তার সবচেয়ে বড় অবদান হলো রাজনৈতিকভাবে ঘুমিয়ে থাকা জুম্মদের জাগিয়ে তোলে নিদ্রামগ্ন জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করেছেন।'