নিজের ব্যবস্থা নিজেকে করতে হবে, সব সরকার করে দিতে পারবে না: শেখ হাসিনা
মিতব্যয়ী ও উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নিজের ব্যবস্থা নিজেকে করতে হবে।
ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সকালে আয়োজিত আলোচনা সভায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পরে দেশে স্থিতিশীলতা এসেছে। আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। জেল-জুলুম যা-ই আমরা ভোগ করি কিন্তু বাংলাদেশে একটু স্থিতিশীলতা আমরাই আনতে পেরেছি। তারপরও প্রচেষ্টা বারবার, আমাদের সরকারকে উৎখাতই করতে হবে। ২০০৮-এ নির্বাচনে এসেছিলাম বলে ২০২২ পর্যন্ত আমাদের ধারাবাহিকতা ছিল।বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ইতিহাসে এই প্রথম একটা দীর্ঘ সময় একটা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে বলেই আজকে দেশের উন্নতিটা হয়েছে।
দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান যে অবস্থাটা এক দিকে করোনাভাইরাসে অর্থনৈতিক মন্দা বিশ্বব্যাপী, তারপর ওপর ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কারণে আজকে অর্থনৈতিক যে অবস্থায় উন্নত দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে ইংল্যান্ডে মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশে উঠে গেছে। আমেরিকায় ১ শতাংশের বেশি থাকতে না সেখানেও ১০ শতাংশের বেশি তাদের মুদ্রাস্ফীতি রেট। প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। ইংল্যান্ডের মানুষ যারা ৩ বেলা খেত তারা ১ বেলার খাবার বাদ দিয়েছে। তাদের বলা হয়েছে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবে না, সীমিত আকারে ব্যবহার করো। ভোজ্য তেল ১ লিটারের বেশি কেউ কিনতে পারবে না সুপার মার্কেট থেকে, রেস্ট্রিকশন দেওয়া আছে। ইউরোপে কোনো কোনো দেশে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি রেট। দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে।
আমরা ভর্তুকি দিয়ে দিয়ে দ্রব্যমূল্য অন্তত নিয়ন্ত্রণে যতটুকু পারি রাখছি। আমরা প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছি। আমাদের যে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়নে আমরা তুলে ছিলাম। সেই টাকা ভেঙে ভেঙে আমরা বিদ্যুতের জন্য, গ্যাসের জন্য, কৃষি, স্বাস্থ্যের জন্য ভর্তুকি এবং সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। এভাবে কোনো দেশ কিন্তু করেনি। আমরা ভ্যাকসিন নিজের পয়সায় কিনে বিনা পয়সায় সবাইকে দিয়েছি। আমরা টেস্ট কিট নিজের পয়সায় কিনে বিনা পয়সায় সবাইকে দিচ্ছি। তার পরেও যদি কেউ গোলমাল করার চেষ্টা করে তাহলে এ দেশটা যদি একেবারে স্থবির হয়ে যায় তো সাধারণ মানুষ কী অবস্থাটা হবে, বলেন প্রধানমন্ত্রী
তিনি আরও বলেন, একটা কথা বলতে পারি, আমাদের গ্রামের মানুষের অবস্থা এখনো অনেক ভালো আছে। সেটা যাতে ভালো থাকে সেদিকে আমরা বিশেষ দৃষ্টি দিচ্ছি। আমি আহ্বান করেছি ১ ইঞ্চি জমি যাতে অনাবাদি না থাকে। কারণ বিশ্বব্যাপী যেখানে খাদ্যের অভাব, খাদ্য মন্দা সেখানে আমাদের নিজের মাটি আছে, মানুষ আছে; আমাদের ফসল ফলাতে হবে। নিজের খাবারের ব্যবস্থাটা অন্তত আমরা নিজেরা করবো। এটাই হলো বাস্তব।
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে আমরা গার্মেন্টসসহ পণ্য যেগুলো রপ্তানি করি, আমি দেখতে পাচ্ছি কয়েকদিন আগে গার্মেন্টস শ্রমিকরা আন্দোলন করছে। আন্দোলন করবেন ঠিক আছে কিন্তু অন্যান্য দেশ যারা আমাদের গার্মেন্টস কিনবে—আমরা এখন ভালো একটা সুযোগ পাচ্ছি, উৎপাদন বাড়ছে এবং এ সমস্ত শ্রমিকদের বেতন তো বন্ধ হয়নি। আমরা তো সেখানে নিজেরা প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছি, টাকা দিয়েছি। ভর্তুকি দিয়ে বেতনটা সরাসরি যাতে গার্মেন্টেসর কর্মী-শ্রমিকরা যাতে পায় সেই ব্যবস্থাটা করেছি। আমরা সরাসরি ফোনের মাধ্যমে এই শ্রমিকদের টাকা দিয়েছি। মালিকদের হাতে তো দেইনি।
আজকে বেতন বাড়ানো; নানা ধরনের আন্দোলন যদি করতে যায় আর এই রপ্তানি যদি বন্ধ হয় গার্মেন্টসসহ সব কারখানা তো বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আমও যাবে ছালাও যাবে। বেতন আর বাড়বে না তখন চাকরিই চলে যাবে। তখন ঘরে ফিরে যেতে হবে, তখন কী করবেন? যে নেতারা উসকানি দিচ্ছে তারা কাদের প্ররোচনায় উসকানি দিচ্ছে সেটাও একটু ভেবে দেখতে হবে। যারা কিনবে তাদের ক্রয় ক্ষমতাই তো নেই। যে দেশে আমরা রপ্তানি করি তাদের ক্রয় ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাচ্ছে এবং দিনে দিনে আরও খারাপ হচ্ছে। আমরা আমেরিকায়-ইউরোপে পাঠাই, সব জায়গায় জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। সেখানে মানুষ কত দুরাবস্থা আছে, কত মানুষ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে এখনো আমরা অন্ততপক্ষে সবার খাদ্য, ওষুধ, ভ্যাকসিন সব কিছু আমরা অন্তত দিয়ে যেতে পারছি। সেখানে যদি কেউ কোনো রকম অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে যায় তাহলে আমি বলবো শেষে এ-কূল, ও-কূল দুকূল সব হারাতে হবে। এটাও যেন সবাই মনে রাখে। আমাদের সবাইকে মিতব্যয়ী হতে হবে। কোনো রকম কোনো খাদ্য যেন নষ্ট না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। প্রত্যেকে যার যার নিজের সঞ্চয় করা, নিজের ব্যবস্থা করা নিজেকে করতে হবে। সব তো আর সরকার করে দিতে পারবে না। কাজে নিজেদের করতে হবে। এটা আমাদের নেতা-কর্মীদের বলবো এবং সাধারণ জনগণকেও আমি বলবো। এই যুদ্ধ এত তাড়াতাড়ি থামবে বলে তো মনে হচ্ছে না। জাহাজে করে আমরা পন্য পরিবহন করি যেটা ৮০০ ডলারে হতো সেটা এখন আড়াই হাজার ৩ হাজার ডলার হয়ে গেছে। কাজে জিনিসের দাম তো বাড়বেই, বলেন তিনি।
কেউ যদি এখন আন্দোলন করে এই কারখানা বন্ধ, ওই কাজ বন্ধ করে, কারখানা বন্ধ হলে তো চাকরিও চলে যাবে। সেটা কিন্তু মাথায় রাখতে হবে। তখন আর বেতন বাড়া না, বেতনহীন হয়ে যেতে হবে। সেটা যদি না বোঝে আমাদের কিচ্ছু করার নেই। বেসরকারি খাতে আমরা কত দেবো! আমরা তো ভর্তুকি দিয়েই যাচ্ছি। সব ধরনের প্রণোদনা দিয়েছি। এর বেশি দেওয়া তো সম্ভব না। সেটা তো মাথায় রেখে চলতে হবে। তাও তো করোনা সময় আমরা কারখানা বন্ধ হতে দেইনি। চালু রাখার সব রকম সুযোগ করে দিয়েছিলাম। এখন সুবিধা পাচ্ছি রপ্তানি বাড়ছে আমাদের। আমাদের ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আসছে। বিনিয়োগের সুযোগ আসছে আমরা সেগুলো কাজে লাগাচ্ছি। কারো কথায় অশান্তি সৃষ্টি করলে দেশের ক্ষতি, নিজেরও ক্ষতি। নেতাদের তো কোনো অসুবিধা নেই, তারা যেখানে থেকে উসকানি পাচ্ছে সেখান থেকে ভালো অংকের টাকা পাবে কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্যে কী হবে? এদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে ক্ষতিই তো করা হবে। আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন আমরা কত দফা বাড়িয়েছি, যারা ১ হাজার ৬০০ টাকা পেত তারা ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার তাছাড়া ওভারটাইম, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যথেষ্ট বেশি পাচ্ছে। হ্যাঁ, জিনিসের দাম কিছু বেড়েছে এটা ঠিক। এটা যে আরও কত বাড়বে তারও কোনো ঠিক নেই। বাংলাদেশ বলে না এটা তো বিশ্বব্যাপী। বরং আমাদের দেশে তাও আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি, বলেন শেখ হাসিনা।
ঐতিহাসিক ৬ দফার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অঞ্চলে আসলে জনগণের অধিকার ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্র হওয়ার পরে কোনো শাসনতন্ত্র, সংবিধান দিতে পারেনি। সব সময় বঞ্চনার শিকার হতে হতো। জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানে জনসংখ্যা বেশি। পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল আমাদের থেকে অনেক কম। তারপরও দেখা গেল রাজধানী নিয়ে যাওয়া হলো করাচিতে। সেই মরুভূমি করাচিতে ফুল ফোটানো হলে বাংলাদেশের অর্থ দিয়ে। শোষণ-বঞ্চণা এবং আমাদের ওপর বারবার যে আঘাত, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি বলেন, ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে সোহওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে তখনই প্রথম শাসনতন্ত্র তৈরি হয়। যদিও মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো তিনি আওয়ামী লীগ ভেঙে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি করতে চলে যান। তখন সংগঠন গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে তিনি সংগঠনের দায়িত্ব নেন। কারণ সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক সাহেব যখন আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, সেখানেই তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে যান। কাজে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। কাজে মওলানা ভাসানী সাহেব পার্টি ভাঙার পর তাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করে দলের দয়িত্ব নেন। সব সময় তার আকাঙ্ক্ষা ছিল, বাঙালি জাতির জন্য কিছু করা। স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং ভূ-খণ্ড দেওয়া।
তিনি কিন্তু হঠাৎ করে এ দেশের স্বাধীনতার কথা বলেন। আগে মানুষকে প্রস্তুত করেছেন। ৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় এবং ৫৬ সালে আওয়ামী সরকারের থাকার সময় আমাদের যে বৈষম্যের বিষয় তিনি ব্যাপকভাবে তুলে ধরেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে লাহোর রক্ষা করে বেঙ্গল রেজিমেন্ট। তারা লাহোর রক্ষা না করলে ভারত অনেক আগেই দখল করে নিত। পূর্ববঙ্গ রক্ষার কোনো প্রস্তুতি ছিল না। ওই অবস্থা থেকে জাতির পিতা ৬ দফা প্রণয়ন করেন। আলফা ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে বসে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা তিনি নিজেই প্রণয়ন করেন। এটা একমাত্র মোহাম্মদ হানিফ জানতো কারণ সে এটা ইংরেজি এবং বাংলা টাইপ করে সেটা উনার হাতে দেন। তিনি করাচিতে যখন ৬ দফা পেশ করতে যান বিরোধী দলের সম্মেলনে, সেটা ছিল ৫ ফেব্রুয়ারি তাকে তীব্র বাধা দেওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের পক্ষ থেকে। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের পূর্ববঙ্গের যারা ছিল; কিছু বাঙালির সব সময় দালালি করার অভ্যাস থাকে। তারাও এটা দিতে দেয়নি। তখন ৬ দফার কিছু দফা তিনি ওখানে প্রেসে প্রকাশ করে দেন যার ফলে তার জীবনের ওপর হুমকি আসে, বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমার মনে হয় পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম কোথাও পাওয়া যাবে না যে, কোনো একটা দাবি এত অল্প সময়ে এত জনপ্রিয়তা পেতে পারে। ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ফিরে এলেন, ১১ ফেব্রুয়ারি প্রেস কনফারেন্স করে ব্যাখ্যা দিলেন সম্পূর্ণ। তারপর কেন ৬ দফা তার ওপর একটা লেখা লিখে; যেহেতু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কারণ আওয়ামী লীগ রিভাইভ করেছিল ৬৪ সালে। ৬৪ সালের সম্মেলনে প্রথমে তর্কবাগিস সভাপতি ছিলেন, পরবর্তী সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সভাপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পোস্টার-লিফরলেট করে কেন ৬ দফা তার ব্যাপক প্রচার করা হয়।
তিনি বলেন, ৬১ সালে বঙ্গবন্ধু ছাত্র নেতাদের ডেকে তাদের দিয়ে একটি নিউক্লিয়াস ফর্ম করা এবং স্বাধীনতার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, এমনভাবে যেন মানুষ ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নেয়। ছাত্রলীগকে দিয়েই তিনি এটা শুরু করেছিলেন। শেখ ফজলুল হক মনি বিএম কলেজ থেকে পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তাকে দিয়েই এটা শুরু। আরেকজন ছিল সে এখন আমাদের পার্টিতে নেই অন্য পার্টিতে চলে গেছে কাজে ওর নামও আমি নিতে চাই না আর। ওগুলো ভুলে গেছে তারা। মনি ভাইকে দিয়েই নিউক্লিয়াস ফর্ম করার কথা হয়। আমু ভাই একমাত্র আছেন, লতিফ সিদ্দিকী আছেন—কয়েকজন আছে আর যেগুলো বিএনপিতে গেছে ওই দুর্বৃত্তদের নাম আমি নিতে চাই না। ওইগুলো সব বেঈমানি করেছে।