ফরিদপুরে আ. লীগের নতুন কমিটি ‘হাইব্রিড’ প্রভাবমুক্ত রাখার প্রত্যয়

নিজস্ব সংবাদদাতা, ফরিদপুর

ফরিদপুরের জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি হবে বিএনপি, জামায়াত ও হাইব্রিড প্রভাবমুক্ত। বিগত দিনে ফরিদপুরে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে তাদের কাউকে নতুন কমিটিতে রাখা হবে না বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে নির্বাচিত শামীম হক।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি পদে শামীম হক ও সাধারণ সম্পাদক পদে সম্পাদক শাহ মো. ইশতিয়াক হোসেন আরিফের নাম ঘোষণা করেন সম্মেলনের প্রধান অতিথি কাজী জাফরউল্যা।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আগের কমিটির সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহা। 

শহরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এদিন দুপুর ১২টার দিকে ভার্চুয়ালি এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

কার্যত এর মাধ্যমে ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের যুগের অবসান হলো।

সম্মেলনে নবনির্বাচিত জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম হক বলেন, 'বিগত ১০-১২ বছরে ফরিদপুরে যে বলয় তৈরি হয়েছিল, সে জাতীয় বলয় আর করতে দেওয়া হবে না জেলা আওয়ামী লীগে। ওই সময় বিএনপি-জামায়াত বলয় থেকে হাইব্রিড হিসেবে অনেকে আওয়ামী লীগে ঢুকে গিয়েছিল। তাদের বাদ দিয়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগের নবীন ও প্রবীণ সদস্যদের মিলিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন তথা স্বচ্ছ কমিটি গঠন করা হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'শুদ্ধি অভিযানে যারা গ্রেপ্তার হয়েছে বা যাদের নাম এসেছে তাদের কাউকেই কমিটিতে পদ দেওয়া হবে না।' 

শামীম হক ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী রাজনীতি করে আসছেন। বিদেশে থাকাকালীন তিনি ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী লীগ বাদ দিয়ে তাকে কখনও অন্য কোনো দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত দেখা যায়নি।

অন্যদিকে সম্মেলনে নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক শাহ্ মো. ইশতিয়াক হোসেন আরিফ সদ্যবিলুপ্ত কমিটির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলির সদস্য এসএম নূরুন্নবীর ছেলে ইশতিয়াক হোসেন।

shamim_arif_final.jpg
নবনির্বাচিত সভাপতি শামীম হক ও সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. ইশতিয়াক হোসেন আরিফ। ছবি: সংগৃহীত

মোশাররফ যুগের অবসান

এর আগে ফরিদপুরে ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালে। ওই সময় তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফের ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন ওরফে বাবর সাধারণ সম্পাদক পদে জোরালো প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি।

গতকালের সম্মেলনে খন্দকার মোশাররফের কোনো অনুসারীকে দেখা যায়নি।

২০২০ সালের ১৬ মে রাতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে দুই দফা হামলার ঘটনার পর পালটাতে থাকে ফরিদপুরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। অভিযোগ আছে সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফের সমর্থকরা এ হামলা চালায়। বাড়িতে হামলার ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় মামলা করেন সুবল সাহা।

ওই মামলার সূত্র ধরে ওই বছর ৭ জুন রাতে পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে মোশাররফের বাড়ি থেকে দুই সহোদর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ইমতিয়াজ হাসান রুবেলসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে।

এরপর মানিলন্ডারিং মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছোট ভাই ফরিদপুর সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার মোহশেতাম হোসেন বাবর, এপিএস এ এইচ এম ফোয়াদসহ মোশাররফ হোসেনের কাছের নেতারা।

গতকাল সম্মেলনের উদ্বোধন করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, 'ফরিদপুরে কয়েক বছরে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সুখকর ছিল না। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, রক্তপাত হয়েছে।' 

তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগ কারা ধ্বংস করেছিল তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চিহ্নিত চাঁদাবাজ, চিহ্নিত ভূমিদস্যুদের কোনো পদ দেওয়া যাবে না। যারা নৌকার বিরোধিতা করে নির্বাচন করেছে তাদের কোনো পদে রাখা যাবে না। আওয়ামী লীগ চলবে প্রকৃত আওয়ামী লীগারের নেতৃত্বে, হাইব্রিডদের নেতৃত্বে নয়।'

নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে আগামী এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে প্রস্তাব কেন্দ্রে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম।