‘যাদের মদদে ক্ষমতায় ছিলেন তারাও আপনাদের দিকে তাকাবে না’
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ করার বিকল্প বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
নির্বাচন কমিশন নয়, জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার উল্লেখ করে রিজভী বলেন, আপনাদের সঙ্গে জনগণ নেই। যাদের মদদে ক্ষমতায় ছিলেন তারাও আর আপনাদের দিকে তাকাবে না। এখন বিদায় নিতেই হবে।
তিনি বলেন, সরকারকে বলবো এই মুহূর্তে পদত্যাগ করুন। দেশকে ভয়ানক গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবেন না। ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের ব্যবস্থা করুন। তা না হলে কোনো কিছু করে লাভ হবে না। আপনাদের সঙ্গে জনগণ নেই। যাদের মদদে ক্ষমতায় ছিলেন তারাও আর আপনাদের দিকে তাকাবে না। এখন বিদায় নিতেই হবে।
রিজভী বলেন, কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, এটি ক্ষমতাসীন অপশক্তির বিনা ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখার পরিণাম-পরিণতি ছাড়া আর কিছুই নয়। সম্প্রতি একটি উদ্বেগজনক খবর দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। খবরটি হলো, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বর্তমান ও সাবেক ৭ কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার পর নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে পোশাক খাতে। যুক্তরাজ্যের ক্রেতারা নিষেধাজ্ঞার কারণ দেখিয়ে আমদানি-রপ্তানিতে ব্যবহার হওয়া ঋণপত্রে (এলসি) বিশেষ একটি ধারা যুক্ত করে দিচ্ছেন। এই কারণে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে অর্থ আদান-প্রদানে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
তিনি বলেন, এতদিন যারা ক্ষমতাসীন সরকারের নানা অপকর্ম নানাভাবে সমর্থন দিয়ে আসছিলেন, তারাও পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। আমরা মনে করি, দেশের স্বার্থে এসব সংবাদকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। শুধুমাত্র বিএনপির বিরুদ্ধে রং চড়িয়ে ব্লেইম-গেইমে লিপ্ত হয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়। তাই নিশিরাতের সরকারের কাছে জনগণ সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি প্রশ্নের জবাব জানতে চায়—২০০৪ সালে শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় কেন যুক্ত্ররাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছিল; শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তার সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি জোগাড় করতেও না কি কষ্ট হয়েছিল। তাহলে লবিস্ট নিয়োগের জন্য বিপুল পরিমাণ ডলারের যোগান দিলো কে; ওই সব ডলারের উৎস কী; রাষ্ট্রের শত কোটি টাকা খরচ করে ২০১৪ সাল থেকে কী কারণে, কী উদ্দেশ্যে বিনা ভোটের সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করতে হয়েছে; লবিস্ট নিয়োগ করতে রাষ্ট্রের এ পর্যন্ত কত কোটি টাকা খরচ হয়েছে; কোন খাত থেকে কীভাবে লবিস্টদের টাকা দেওয়া হয়েছে; এতো বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগের কথা জনগণকে কেন জানানো হয়নি?
ক্ষমতার লোভে নিজেদের অপকর্ম ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে নিশিরাতের সরকার এখন প্রতিদিন বিএনপির বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। অথচ সম্প্রতি নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রভাবশালী মার্কিন কংগ্রেসম্যান এবং হাউস কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সের চেয়ারম্যান গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস এর বক্তব্য নিয়েও তারা মিথ্যাচার করেছিল। মি. মিকস স্পষ্ট করেই বলেছেন, বাংলাদেশে যে ৭ জনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এটি কারো সুপারিশের কারণে নয়, বরং যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই স্যাংশন আরোপ করেছে। সুতরাং অন্য কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই বরং বিনা ভোটে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য একজন মাত্র ব্যক্তির ক্ষমতালিপ্সার নির্মম পরিণতিতেই আজ বাংলাদেশকে অপবাদ বহন করতে হচ্ছে। এর দায়-দায়িত্ব নিশিরাতের সরকারকেই নিতে হবে—বলেন বিএনপির এই নেতা।
রিজভী আরও বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি সার্চ কমিটি করেছেন। যার ভিত্তি হচ্ছে সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া তথাকথিত 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ আইন ২০২২'। এই আইন জনগণকে ঠকানোর কৌশল মাত্র। গত ২৩ জানুয়ারি আমরা বলেছিলাম, আওয়ামী বাকশালী চেতনার দ্বারা উদ্বুদ্ধ মুজিবকোট পরা লোকেরাই সরকারের সার্চ কমিটিতে থাকবেন। সেই সার্চ কমিটি হারিকেন দিয়ে খুঁজে খুঁজে মুজিবকোট পরা লোকদের বের করে আনবে।' নবগঠিত এই সার্চ কমিটি সেই অনুমানেরই নিরেট বাস্তবতা। এটাকে 'সার্চ কমিটি' না বলে বরং 'আওয়ামী খাস কমিটি' বলাটাই যুক্তিযুক্ত মনে করি। এরা ভুপেন হাজারিকার সেই গানের মতো 'মোরা যাত্রী একই তরণীর'। এরা একই ঝাঁকের কৈ। এরা কে আওয়ামী লীগের কোন পজিশনে ছিলেন এবং আছেন তা নিয়ে দেশের সচেতন জনগণের মধ্যে চলছে যে আলোচনা চলছে তা এখন 'টক অব দ্য কান্ট্রি'তে পরিণত হয়েছে। পরীক্ষিত আওয়ামী লীগ পরিবার দ্বারা আরেকটি নীল নকশার ভোট ডাকাতির নির্বাচন কমিশন গঠন করতে নিখাদ আওয়ামী লীগের চেতনার মানুষদের অনুসন্ধান করাই এই সার্চ কমিটির অভীষ্ট লক্ষ্য।
এ প্রসঙ্গে রিজভী আরও বলেন, বর্তমান সার্চ কমিটির প্রধান আগের দুটি সার্চ কমিটিরও সদস্য ছিলেন। সার্চ কমিটির প্রধান ওবায়দুল হাসান ও তার পরিবার পরীক্ষিত আওয়ামী লীগার। তিনিও আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী ছিলেন। তার পরিচয় তিনি বাকশাল ছাত্রলীগের বড় নেতা ছিলেন। এদের সুপারিশেই নিয়োগ পেয়েছিলেন রকিব ও হুদা কমিশন। এরা নজীরবিহীন ভোট ডাকাতির নির্বাচন জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আরেক বিশেষজ্ঞ, এই সার্চ কমিটির সদস্য হয়েছেন সাবেক বহু বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনার মো. ছহুল হোসাইন। ২০১৮ সালে সিলেট-১ (সিলেট সদর ও সিটি করপোরেশন) আসন থেকে নৌকার প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন। রাজবাড়ী শহরের ভবানীপুর এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম হামিজ উদ্দিন শেখের পুত্র কুদ্দুস জামান। এই কুদ্দুস জামান এই সার্চ কমিটির সদস্য। তার ভাই স্থানীয় আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। আরেক সদস্য অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হক জন্মান্ধ আওয়ামী লীগার হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের একান্ত অনুরাগী ও দৃঢ় সমর্থক প্রয়াত লেখক সৈয়দ শামসুল হকের স্ত্রী তিনি। তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের পুরোটা সময় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মেডিকেল সেন্টারে চাকরি করেছেন।
জনগণ ঘৃণাভরে আওয়ামী সার্চ কমিটির নামে এই খাস কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলেও এ সময় মন্তব্য করেন রিজভী।