গ্রিস-ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে মৃত্যুফাঁদ, ভূমধ্যসাগর পাড়িতে শীর্ষে বাংলাদেশিরা

মোহাম্মদ জামিল খান ও তৌসিফ কাইয়ুম

সুনামগঞ্জ সদরের শাকিল আহমেদের এক বছরেরও বেশি সময় ধরে লিবিয়ায় দিন কেটেছে আধপেটা খেয়ে। তার সারা দিনের খাবার বলতে ছিল এক টুকরো শক্ত বাসি রুটি, সামান্য সবজি আর আধা লিটার পানি।

ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর কলেজছাত্র শাকিল ২০২৩ সালে এক দালালের ফাঁদে পা দেন। তাকে গ্রিস পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে দালাল নেন ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তিনি দুবাই হয়ে মিসরে যান, সেখান থেকে সড়কপথে লিবিয়ায়।

তবে ২১ বছরের শাকিলের আর ইউরোপ যাওয়া হয়নি। আরও ১৪৭ জনের সঙ্গে লিবিয়ায় আটকা পড়েন তিনি। অবশেষে ২০২৪ সালের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

শাকিলের বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। তার মা ও বোন আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে দালালকে ওই ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। শাকিল বলেন, ‘দালালকে দেওয়া টাকা আর ফেরত পাইনি। আমার পরিবার এখনো সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

শাকিলের এই দুঃসহ অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। মৃত্যুঝুঁকি, শারীরিক নির্যাতন ও নিঃস্ব হওয়ার ভয়—কোনো কিছুই বাংলাদেশিদের লিবিয়া থেকে ইউরোপের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার পথ থেকে ফেরাতে পারছে না।

ইউরোপ যাত্রায় শীর্ষে বাংলাদেশিরা

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করা মানুষের তালিকায় সবার ওপরে ছিল বাংলাদেশ। ওই বছর অন্তত ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছান, যা ওই পথে ইউরোপে যাওয়া মোট মানুষের ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ। এই তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে থাকা মিসর ও ইরিত্রিয়া থেকে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন যথাক্রমে ৯ হাজার ১১৫ ও ৭ হাজার ৫৮৩ জন। এরপরের স্থানে থাকা পাকিস্তান ও সুদান থেকে গেছেন যথাক্রমে ৪ হাজার ৩৯৭ ও ৪ হাজার ২২৩ জন।

২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেও এই ধারা অব্যাহত আছে। এই সময়ে ১ হাজার ৩৫৮ জন বাংলাদেশি বিপজ্জনক পথে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন, যা অন্যান্য দেশ যেমন সোমালিয়া (৫৫৭), পাকিস্তান (৩৮৩) ও মিসরের (৩১৭) তুলনায় অনেক বেশি।

প্রায়শই লিবিয়ার ক্যাম্পগুলো থেকে বাংলাদেশিদের আটক রাখা, শারীরিক নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের খবর আসে। ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন বহু মানুষ। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ গ্রিসে একটি নৌকা পৌঁছানোর পর জানা যায়, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত এক দশকে সমুদ্রপথে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ ইউরোপে গেছেন। তাদের বেশির ভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এসব মানুষের বড় একটি অংশ মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার। এসব এলাকায় দালাল চক্রগুলো ইউরোপে চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের ফাঁদে ফেলছে।

সম্প্রতি ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপে যেতে ইচ্ছুক ২ হাজার জনের মধ্যে ৬০ শতাংশকে ভালো চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের ৮৯ শতাংশই কোনো কাজ পাননি। পথিমধ্যে অন্তত ৬৩ শতাংশ মানুষকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ৯৩ শতাংশকে ক্যাম্পে আটকে রাখা হয় এবং ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন।

গবেষণা অনুযায়ী, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ৬৮ শতাংশ অভিবাসন প্রত্যাশীকে চলাচলে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। ৫৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা কখনোই তিন বেলা খাবার পেতেন না এবং ২২ শতাংশ দিনে মাত্র এক বেলা খেতে পেতেন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশিদের গন্তব্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আগে যারা ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করতেন, তারা এখন লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের উদ্বেগের জায়গা হলো, আরও হাজার হাজার মানুষ একই বিপজ্জনক যাত্রার জন্য লিবিয়ায় অপেক্ষা করছেন।’

শরিফুল হাসান জানান, মানবপাচার চক্রটি একসময় ত্রিপোলি ও জুয়ারা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এই চক্র এখন লিবিয়ার উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্বে তোব্রুকসহ নতুন পয়েন্টগুলো থেকে গ্রিসের উদ্দেশে নৌকা পাঠানো হচ্ছে। তিনি ইউরোপ যাওয়ার মরিয়া চেষ্টাকে সম্পর্কে বলেন, ‘সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়ার পরও অনেক বাংলাদেশি দেশে ফিরতে চান না।’

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ভূমধ্যসাগর দিয়ে মানবপাচারের সঙ্গে একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক জড়িত। তাই কোনো একটি দেশের পক্ষে একা এটি মোকাবিলা করা কঠিন।

তিনি বলেন, ‘এই রুটের সঙ্গে যুক্ত সব দেশের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।’ পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিবাসন আইন কঠোর করার ওপর জোর দেন তিনি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর বলেন, যেসব এলাকা থেকে বেশি মানুষ ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, সেখানে সরকার সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, এই বিপজ্জনক যাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার পাশাপাশি বোঝানো হচ্ছে যে, অবৈধ অভিবাসন বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। তবে অবৈধ পথে যাওয়ায় এক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস ও আইওএমের সহায়তায় মানবপাচারের শিকার হয়ে দেশে ফেরা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। গত বছর লিবিয়া থেকে ৩ হাজার ৪৬৩ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৮ জন। এর আগে ২০২৩ সালে ৬৪৬ জন এবং ২০২২ সালে মাত্র ১৪৩ জনকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বদরুল আলম মোল্লা বলেন, ‘গত বছর অনিয়মিত পথে সর্বোচ্চসংখ্যক বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছে। দুবাই হয়ে ইতালিতে পৌঁছাতে বিভিন্ন রুট ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতারক চক্রের ফাঁদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে আমরা জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছি।’