সংবিধান ‘সংশোধন’ বনাম ‘সংস্কার’: কতদূর বিতর্ক গড়াল সংসদে
সংবিধান সংস্কার বনাম সংশোধন নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু দেশের সর্বোচ্চ আইন ‘সংবিধান’। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সংসদে প্রশ্ন উঠেছে, সংবিধান কি কেবল সংশোধন হবে নাকি আমূল সংস্কার?
একদিকে সরকারে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন দলগুলো বলছে, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো বলছে, এটা জনগণের অভ্যুত্থানের ফল, এটাকে মানতে হবে।
সংসদে সরকারি দল চাইছে বর্তমান সংবিধানের কাঠামো ঠিক রেখে প্রয়োজনীয় ‘সংশোধন’ আনতে। অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি—কেবল সংশোধনী দিয়ে হবে না, দরকার আমূল ‘সংস্কার’।
বিতর্কের মূলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ ও ‘গণভোট অধ্যাদেশ’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। এতে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব আছে। তার মধ্যে ৪৮টি সরাসরি সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত। বাকি ৩৬টি আইন প্রণয়ন বা পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য।
সনদ বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। এতে ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ডাকার এবং ১৮০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বলা হয়।
গণভোটে চারটি প্রশ্ন একত্রে একটি ‘হ্যাঁ/না’ উত্তরে ভোট হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। বিএনপি দলীয় সিদ্ধান্তে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে অতিরিক্ত শপথ গ্রহণ করেননি। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। তবে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্যরা দুটি শপথই নিয়েছেন।
গত ২৯ মার্চ বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান’ করার দাবিতে একটি মুলতবি প্রস্তাব আনেন। ৩১ মার্চ এই প্রস্তাবের ওপর দুই ঘণ্টার উত্তপ্ত বিতর্ক চললেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
সরকারি দলের অবস্থান
গত ৩১ মার্চের আলোচনায় সরকারি দলের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়। সরকারি দল বিএনপি এই সংস্কার পরিষদ বা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দলটি বলছে, 'জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ (সংবিধান সংস্কার) কোনো বৈধ আইন বা অধ্যাদেশ নয়। তাদের ভাষ্য, গণভোটে যে চারটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন ছিল, তার একটিতেও সরাসরি 'সংস্কার কাউন্সিল' বা পরিষদ গঠনের কথা উল্লেখ ছিল না। পরিষদের বিষয়টি কেবল আদেশের প্রস্তাবনার একটি অংশ হিসেবে ছিল।
দলটির মতে, সংবিধান সংস্কারের জন্য আলাদা পরিষদের প্রয়োজন নেই, আলোচনার মাধ্যমেই এটি ঠিক করা সম্ভব। এছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ ছাড়াই সংস্কারের বিষয়গুলো সরাসরি আরপিও-তে যুক্ত করা যেতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৩১ মার্চের আলোচনায় বলেন, এই আদেশ আসলে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল’। তার যুক্তি, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি এমন আদেশ জারি করতে পারতেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ গঠনের পর রাষ্ট্রপতির এমন একক আদেশ জারির কোনো এখতিয়ার নেই।
তিনি একে “রাজহংসকে (রাষ্ট্রপতিকে) জোরপূর্বক স্বর্ণের ডিম পাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনা” হিসেবে অভিহিত করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ১৩৩টা অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আনা হয়নি। কারণ এটা না অধ্যাদেশ, না আইন।
তার মতে, কোনো আদেশের মাধ্যমে এই সার্বভৌম সংসদকে ১৮০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে বাধ্য করা যায় না। পরবর্তী সংসদকে বাধ্য করার মতো নজির পৃথিবীতে নেই।
বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর মানে, কিন্তু গণভোটে একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সবকিছু চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। সালাহউদ্দিন আহমদ প্রশ্ন তোলেন, কেন চারটি ভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে নেওয়া হলো। এটি জনরায়ের সঠিক প্রতিফলন নয়।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের বিধান পরিবর্তন হয় এমন কোনো অধ্যাদেশ রাষ্ট্রপতি জারি করতে পারেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ অবৈধ, এখতিয়ারবহির্ভূত। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ পড়ানোর মাধ্যমে সিইসি শপথ ভঙ্গ করেছেন, সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সবকিছু সংবিধানের পথ ধরে চলবে। জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো সংশোধন সাপেক্ষে বাস্তবায়ন হবে।
এদিকে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ বিএনপি সংসদে উত্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাবে। দলটি বলেছে, গণভোট হয়ে যাওয়ায় অধ্যাদেশটি আর সংসদে তোলার প্রয়োজন নেই।
বিরোধী দলের অবস্থান
জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের দাবি, জুলাই সনদের ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর জনগণ গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট দিয়ে রায় দিয়েছে। জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, এই আদেশ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফল। গণভোটে ৭০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এসেছে, এটাকে অস্বীকার করলে সংসদ নিজেকে অসম্মান করবে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে ১৯৭৭, এরশাদ আমল আর ১৯৯১-এও গণভোট হয়েছে, সংবিধানে না থাকলেও কার্যকর হয়েছে। বিএনপি নিজেরাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ছিল, নির্বাচন আর গণভোট একদিনে করার দাবি করেছিল। এখন অসাংবিধানিক বললে স্ববিরোধিতা হয়।
জামায়াতের এমপি নাজিবুর রহমান যোগ করেন, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির আদেশ আইনের মর্যাদা পায়। মৌলিক কাঠামো বদলাতে সাধারণ সংশোধন যথেষ্ট নয়—সংস্কার পরিষদ দরকার।
আরেক বিরোধী দলের নেতা এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৮ আগস্ট দেশে সরকারই ছিল না, সংবিধান তখন কতটা কাজ করেছে? এই প্রশ্ন তুলে এই সংসদের নৈতিক ভিত্তিকে 'জনগণের অভিপ্রায়' হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
বিশেষ কমিটির প্রস্তাব ও বিরোধ
৩১ মার্চ সরকারি দল সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলের ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব দেয়। এই কমিটির মাধ্যমেই আলোচনার ভিত্তিতে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান 'সংশোধন' বিল আনা হবে।
বিরোধী নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সংস্কার নিয়ে আলোচনা হলে কমিটি বিবেচনা করা যায়। তবে সরকার ও বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য (৫০-৫০) রাখতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে হলে সরকারি দল সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি স্পিকারকে বলেন, ‘এখন সিদ্ধান্ত আপনার।’
এদিকে আইনমন্ত্রী এই দাবির সমালোচনা করে বলেন, ২১৯ জন এমপির প্রতিনিধিরা ৫০ শতাংশ আর ৭৭ জনের প্রতিনিধিরা ৫০ শতাংশ—এটা বৈষম্য।
বিরোধী দলের ওয়াকআউট
১ এপ্রিল সংসদে বিরোধী দল বেঁকে বসে। জামায়াত আমির শফিকুর রহমান পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকার সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না। তাদের মূল দাবির কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিকার হয়নি। এরপর তারা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন (ওয়াকআউট)। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সংসদে সমাধান না পেলে রাজপথে আন্দোলনে যাবেন।
প্রতিনিধিত্ব ও সরকারি দল সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের জন্য 'বিশেষ সংসদীয় কমিটি' গঠনের প্রশ্নে অনড় থাকায় তারা ওয়াকআউট করে। স্পিকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর রুলিং বা প্রতিকার না পাওয়াও তাদের ক্ষুব্ধ করেছে বলে জানায় তারা।
ত্রয়োদশ সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে বিতর্ক বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সংবিধান সংশোধন নাকি সংস্কার—এর ফয়সালা নির্ভর করছে দুই পক্ষের রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।