সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে কেন মুখোমুখি সরকার ও বিরোধী দলগুলো?
সংবিধানে কোনো অস্তিত্ব না থাকায় রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে পারেন না। গতকাল রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এমন মন্তব্যে গরম হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র মেরামতের অন্যতম বড় অঙ্গীকার ছিল সংবিধানের আমূল পরিবর্তন। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণীত হয়। সেই সনদের বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন নিয়ে এই তীব্র বিতর্কের জেরে একদিকে জামায়াতসহ কয়েকটি দল রাজপথের আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে সরকার আইনি সীমাবদ্ধতাকে যুক্তি হিসেবে হাজির করছে।
জুলাই সনদ থেকে গণভোট: বির্তকের পেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন খাতের সংস্কারে হাত দেয়। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে হওয়া সংবিধানের বিতর্কিত সংশোধনীগুলো (যেমন ৭০ অনুচ্ছেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল) পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহ কয়েকটি দল।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। এই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি ছিল সরাসরি সংবিধান সংক্রান্ত। এর মধ্যে ৩০টি প্রস্তাবের বিষয়ে একমত হয়েছিল বিএনপি।
সনদটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত বছরের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। এর পরপরই জনগণের সম্মতি যাচাইয়ের জন্য ২৫ নভেম্বর জারি হয় গণভোট অধ্যাদেশ। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়।
সনদের শর্ত অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির এই পরিষদের অধিবেশন ডাকার কথা ছিল, যার শেষ সময়সীমা ছিল গতকাল ১৫ মার্চ। সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।
আইনি বিতর্ক: আদেশ বনাম সংবিধান
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত এমপিদের জন্য পৃথকভাবে ‘পরিষদ সদস্য’ হিসেবে শপথ নেওয়ার বিধান রাখা নিয়ে বড় ধরনের আপত্তি উঠেছিল।
ওইদিন বিদ্যমান সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বিএনপি ও তাদের শরিকরা। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতি যে আদেশ জারি করেছেন, তার কোনো আইনি বা সাংবিধানিক ভিত্তি নেই বলে মনে করে দলগুলো। সালাহউদ্দিন আহমদ সেদিন যুক্তি দিয়েছিলেন, তারা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি।
অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে থাকায় একইদিনে দুটি শপথই নেয় জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য।
সংকট আরও ঘনীভূত হয় ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি নিয়ে। গতকাল রোববার সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে পরিষদ অধিবেশন ডাকার বিষয়টি উত্থাপন করেন।
এর জবাবে সরকারের সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, বর্তমান সংবিধানে এ ধরনের কোনো পরিষদের উল্লেখ নেই। তাই সংসদের বাইরে বা সমান্তরাল কোনো পরিষদকে সংবিধান সংস্কারের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া যাবে না।
সরকারের যুক্তি হলো, রাষ্ট্রপতি চাইলেই সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো পরিষদের অধিবেশন ডাকতে পারেন না। কোনো নতুন পরিষদ করতে হলে আগে বর্তমান সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই আদেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, যখন সংসদ থাকে না, রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। সংবিধানের ৯৩ (১)(ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংবিধান পরিবর্তন হবে—এমন কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। সংবিধান সংশোধনের কোনো বিধান রাষ্ট্রপতি করতে পারেন না। কিন্তু এই আদেশটি না অধ্যাদেশ, না আদেশ। মাঝামাঝি কী জিনিস! সে জন্য আমি বলেছিলাম হয়তো ‘নিউটার জেন্ডার’ হতে পারে।
তবে সংস্কার প্রশ্নে বিএনপি বলেছিল, জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতসহ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবে তারা বাস্তবায়ন করবে।
দলগুলোর বিপরীত অবস্থানের নেপথ্যে
এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বর্তমান সংসদের দলগুলো প্রধানত দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে থাকা বিএনপি মনে করে, সংস্কার যা হওয়ার তা সংসদের ভেতরেই হতে হবে। সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে বা বিল আকারে এনে আলোচনা করা যেতে পারে।
বিএনপি জুলাই সনদের কিছু মৌলিক বিষয়েও দ্বিমত পোষণ করে। বিশেষ করে উচ্চকক্ষ গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলা নিয়ে তাদের আপত্তি আছে। এছাড়া, বিএনপি তাদের দীর্ঘদিনের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে সংসদকে কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছে।
অন্যদিকে অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ১১-দলীয় ঐক্য। বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত জুলাই সনদের পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন চায়। তাদের দাবি, যেহেতু গণভোটে জনগণ এই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে, তাই এটি এখন জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। তারা বলেছে, ১৫ মার্চের মধ্যে অধিবেশন না ডাকা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গঠিত দল এনসিপি সংবিধানের মৌলিক খোলনলচে বদলে ফেলতে চায়। তারা 'নাগরিকতন্ত্র' এবং 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ' নাম পরিবর্তনের মতো রাষ্ট্রকাঠামোর বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি থেকে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার কথাও বলেছে দলটি।
এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এখনো বেশ চাপে আছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দলটির শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে থাকায় সংসদে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। তবে বিভিন্ন সময় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বা সামাজিক মাধ্যমে তারা পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াকেই 'অবৈধ' ও 'অসাংবিধানিক' বলে দাবি করেছে।
সংস্কারের উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব ও বিতর্কিত বিষয়
প্রস্তাবিত সংস্কারের কয়েকটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক আছে। এর মধ্যে একটি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কেমন হবে। ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে একই ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। কিছুক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো, ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার অধিকার। আরও আছে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন ও উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নির্ধারণ, রাষ্ট্রধর্ম ও জাতীয় পরিচয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়।
জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে পানি এখন অনেক দূর গড়িয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে আদালতের দরবারেও ঝুলে আছে। হাইকোর্ট এরই মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, নতুন সংসদ সদস্যদের 'সংবিধান সংস্কার পরিষদের' সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া এবং গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিলের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে না—এমন কোনো কথা এখন পর্যন্ত বলেনি। এমনকি তারা বিরোধী দল থেকে একজনকে ডেপুটি স্পিকার করার কথাও বলেছে, যা সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে যায়। যদিও সেই প্রেস্তাবে সাড়া মেলেনি।
ঈদের ছুটির পর আগামী ২৯ মার্চ সংসদ আবার বসবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পরিষদের সভা আহ্বানের বিষয়টি সংসদে কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
সরকার যদি শেষ পর্যন্ত এই পরিষদ গঠন না করে, তবে বিরোধী দলগুলো রাজপথের বড় কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবে বলে এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, সংসদের ভেতরেও সংবিধান সংশোধন নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, জুলাই জাতীয় সনদের ভবিষ্যৎ এখন সরকার ও বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে। সংবিধান সংস্কারের এই উদ্যোগ কি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক আলোচনার খোরাক হয়েই থাকবে—তা সময়ই বলে দেবে।