পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি থেকে যেভাবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্ম

আহমাদ ইশতিয়াক
আহমাদ ইশতিয়াক

একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত সরকার নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি মুক্তিবাহিনীকে ব্যবহারের জন্য দেয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘাঁটিটি ছিল প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী।

১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সেই পরিত্যক্ত ঘাঁটিতেই মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এ কে খন্দকারের নেতৃত্বে ৯ জন পাইলট ও ৪৭ জন গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে যাত্রা শুরু করে মুক্তিবাহিনীর ‘এয়ার উইং’। এই দিনটিকেই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসেবে পালন করা হয়।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের এক বীরত্বগাথা। এর অন্যতম উদাহরণ হলো ‘অপারেশন কিলোফ্লাইট’। অপারেশন কিলোফ্লাইট ছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অপারেশনগুলোর সমন্বিত সাংকেতিক নাম। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে এই অপারেশন পাকিস্তানি বাহিনী নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিল। এতে ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ সুযোগও হারায় হানাদার বাহিনী।

যেভাবে বিমানবাহিনীর যাত্রা শুরু

১৯৭১ সালের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বেশ কয়েকজন বাঙালি অফিসার সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় চলে যান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া। এই অফিসারদের মধ্যে ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার, উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার, স্কোয়াড্রন লিডার এম সদর উদ্দিন এবং ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলম।

আগরতলায় পৌঁছানোর পর তাদেরকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০ মে দিল্লিতে ভারতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তারা কলকাতায় আসেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। তিনি বিমান উইং গঠনের জন্য তাজউদ্দীনের কাছে উড়োজাহাজের বন্দোবস্ত করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে থাকা বাঙালি পাইলটরা বিমান-যুদ্ধে সক্ষম।

অ্যালুয়েট থ্রি হেলিকপ্টার, ডি.এইচ.সি-৩ টুইন অটার ও ডাকোটা ডিসি থ্রি  বিমান।  মুক্তিযুদ্ধে এই তিনটি বিমান ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে কিলোফ্লাইটের অপারেশনগুলো চালিয়েছিলেন দুঃসাহসিক বৈমানিকেরা।

ফ্লাইং অফিসার (পরবর্তীতে স্কোয়াড্রন লিডার) বদরুল আলম বীর উত্তম ওই বৈঠকে ছিলেন। চার বছর আগে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বৈঠকে এ কে খন্দকার তাজউদ্দীন আহমদকে বিমান উইং গঠনের জন্য বিমান জোগাড় করার অনুরোধ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ বুঝতে পারেন যুদ্ধে বিমান অত্যন্ত জরুরি। তাই তিনি এবং খন্দকার সাহেব দুজনেই ভারত সরকারের কাছে বিমান সহায়তা চাইতে থাকেন। প্রাথমিকভাবে যখন বোঝা গেল যে বিমান উইং গঠন করতে দেরি হবে, তখন বিমানবাহিনীর অফিসারদের বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধে পাঠানো হয়। আমাকে দেওয়া হলো স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব। আর এ কে খন্দকার হলেন মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ।’

বিমানবাহিনী গঠনের সঙ্গে শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার বীর প্রতীক। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘অফিসাররা ফিরে আসার পরপরই কয়েকজন বেসামরিক পাইলটকে আগরতলা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমি ছাড়াও ক্যাপ্টেন সাহাব, আকরাম, শরফুদ্দীন, ক্যাপ্টেন খালেকসহ বেশ কয়েকজন পাইলট ছিলেন। আমাদের কাছে তখন ফ্লাইং লাইসেন্স ও জরুরি কাগজপত্র না থাকায় ওরা নজরবন্দী করে রেখেছিল। পরে যখন পরিচয় নিশ্চিত হলো, তখন ওরা আমাদের চাহিদা সম্পর্কে জানতে চাইল।’

তিনি আরও বলেন, ‘পত্রিকার মাধ্যমে আমরা বায়াফ্রার যুদ্ধে সুইডিশ পাইলট গুস্তাভ রজেনের বীরত্বের কথা জেনেছিলাম। তিনি ছোট একটি বিমানে রকেট জুড়ে রাতের অন্ধকারে নাইজেরিয়ার বিমানঘাঁটিতে থাকা ৯টি মিগ-১৭ ধ্বংস করেছিলেন। আমরা বললাম, আমাদেরও যদি এমন বিমান দেওয়া হয়, তবে আমরাও এমন বীরত্ব দেখাতে পারব। তারা ভেবে দেখবেন বলে জানালেন।’

অপারেশন কিলো ফ্লাইটের অন্যতম সদস্য ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার, বীর প্রতীক। ছবি: সংগৃহীত

আলমগীর সাত্তারের লেখা ‘কিলোফ্লাইট’ গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, জুলাই মাসের শেষের দিকে তাজউদ্দীন আহমদের আহ্বানে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সচিব কে বি লাল, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল পিসি লালসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এ কে খন্দকার। সেখানে তিনি পুনরায় বিমানের জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নানা নিয়মনীতির কথা বলে ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীকে সরাসরি বিমান সহায়তা দিতে অপারগতা জানায়।

অবশেষে সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ভারত সরকার প্রবাসী সরকারকে তিনটি বেসামরিক বিমান দেওয়ার কথা জানায়। এগুলোর মধ্যে ছিল যোধপুরের মহারাজার দেওয়া একটি ডাকোটা ডিসি থ্রি পরিবহন বিমান, একটি ডিএইচসি-৩ টুইন অটার পর্যবেক্ষণ বিমান এবং শস্যখেতে ওষুধ ছিটানোর কাজে ব্যবহৃত একটি অ্যালুয়েট থ্রি হেলিকপ্টার।

স্কোয়াড্রন লিডার বদরুল আলম বীর উত্তম সেই স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, ‘খন্দকার সাহেব এক দিন খুব উত্তেজিত হয়ে আমাকে ডেকে বললেন, আমরা তিনটি এয়ারক্রাফট পেয়েছি। আমি ভেবেছিলাম যুদ্ধবিমান হবে। বললাম, কী কী? তিনি জানালেন, একটি অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার, একটি অটার এবং একটি ডিসি থ্রি। এগুলো সবই সিভিলিয়ান এয়ারক্রাফট। এগুলোকেই ফাইটার এয়ারক্রাফটে রূপান্তর করতে হবে।’

বদরুল আলম আরও বলেন, ‘খন্দকার সাহেব আমাকে বললেন, বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ করা এয়ারফোর্সের বাঙালি অফিসারদের ডেকে নিতে। আমি তখন প্রস্তাব দিলাম যে আমাদের অনেক বেসামরিক পাইলট আছেন। তাদেরকে কাজে লাগানো যাবে।’

পরিত্যক্ত ঘাঁটিতে পথচলা

নিরাপত্তার স্বার্থেই নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে অবস্থিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই পরিত্যক্ত ঘাঁটিটি মুক্তিবাহিনীকে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল। অপারেশন কিলোফ্লাইটের সঙ্গে যুক্ত বৈমানিকেরা এমনটাই মনে করেন।

অপারেশন কিলোফ্লাইট ও বিমানবাহিনী গঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন ক্যাপ্টেন সাহাবউদ্দিন আহমেদ বীর উত্তম। তিনি কিলোফ্লাইটের ৮৫টি অপারেশনের মধ্যে ১২টিতে অংশ নেন। ডিমাপুরকে বেছে নেওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল নিজস্ব কোনো জায়গা না থাকা। বিমানবাহিনী গঠন করতে হলে বড় এবং নিরাপদ জায়গা প্রয়োজন, যাতে পাকিস্তানিরা কোনোভাবেই জানতে না পারে আমরা কী করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতি তখন প্রতিকূলে ছিল। ভারত আমাদের সহযোগিতা করছে, তা গোপন রাখতেই ডিমাপুরের ওই পরিত্যক্ত ঘাঁটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ভারত তখন বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিল। এটি কোনো ছোট বা আঞ্চলিক যুদ্ধ ছিল না, সিরিয়াস যুদ্ধ। তাই ভারত নিজেদের প্রস্তুতির জন্য সময় নিয়েছিল। আমরা বলতে গেলে সেমি-কন্ট্রোলড ছিলাম ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের দ্বারা।’

স্কোয়াড্রন লিডার বদরুল আলম ডিমাপুরের ঘাঁটি সম্পর্কে বলেন, ‘ডিমাপুরের ওই জায়গায় কেউ থাকত না। স্থানীয়রাও অনেক দূরে থাকত। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি এয়ারফিল্ড। আমরা আগরতলা থেকে ৪৪ জন এয়ারম্যান এবং ১০ জন পাইলট গিয়েছিলাম। পরে কলকাতা থেকে শামসুল আলমসহ আরও কয়েকজন আসেন। গিয়ে দেখি চারদিক জঙ্গলে ভরা। এয়ারফিল্ড পরিষ্কার করার কাজ চলছিল। কয়েকটি তাঁবু খাটানো ছিল। অফিসার ও পাইলটদের থাকার জন্য একটি ভাঙা ভবন দেওয়া হলো। আমরা সেখানেই উঠলাম।’

সামরিক বিমানে রূপান্তর

ভারত সরকারের দেওয়া বেসামরিক বিমানগুলোকে সামরিক বিমানে রূপান্তর করা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। অপারেশন কিলোফ্লাইটের অধিনায়ক ছিলেন সাবেক বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) সুলতান মাহমুদ বীর উত্তম।

এই রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অটার প্লেন এবং অ্যালুয়েট হেলিকপ্টারের পাখার নিচে আমরা দুটি করে রকেট পড লাগাই। প্রতিটিতে ৭টি করে মোট ১৪টি রকেট বহন করা যেত। দুটি বিমান ও হেলিকপ্টারে ভারী মেশিনগান বসানো হয়। অটার বিমানের নিচের দিকে ২০ পাউন্ড ওজনের ২০টি বোমা এবং ডাকোটা বিমানে ১ হাজার পাউন্ডের ৫টি বোমা বহনের ব্যবস্থা করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিটি বিমানে তিনজন করে পাইলট থাকবেন। একজন স্ট্যান্ডবাই থাকবেন, যেন কেউ আহত বা অসুস্থ হলে তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মেশিনগান নিয়ন্ত্রণের জন্য একজন গানার থাকবেন।’

আলমগীর সাত্তার (বীর প্রতীক) বলেন, ‘বুলেট থেকে রক্ষার জন্য এয়ারক্রাফটগুলোর নিচে ১ ইঞ্চি স্টিল প্লেট লাগালে দেখা যায় অটারের সেন্টার অব গ্র্যাভিটি নষ্ট হয়ে গেছে। পরে তা ঠিক করা হয়। এটি যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’

এই বেসামরিক বিমানগুলো সম্পর্কে বৈমানিকদের তেমন ধারণা ছিল না। ভারতীয় প্রশিক্ষক স্কোয়াড্রন লিডার সঞ্জয় কুমার চৌধুরী ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ঘোষালের তত্ত্বাবধানে তাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ শুরু হয়।

প্রশিক্ষণের বিষয়ে বদরুল আলম বলেন, ‘এ ধরনের প্রশিক্ষণে কমপক্ষে চার মাস সময় লাগে, অথচ আমাদের তা ১৫ দিনেই শেষ করতে হবে। প্রথম ১০ দিনে বিমান আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। যেহেতু রাতে অপারেশনের সিদ্ধান্ত ছিল, তাই রাতে ফ্লাইং প্র্যাকটিস হতো। ২৫ মাইল দূরে পাহাড়ের চূড়ায় প্যারাসুট ফেলে রাখা হতো এবং আমরা সেই প্যারাসুট লক্ষ্য করে টার্গেট ছুড়তাম।’

অপারেশন কিলো ফ্লাইটের ভারতীয় প্রশিক্ষক ও টেকনেশিয়ানরা। ছবি: সংগৃহীত

কিলোফ্লাইটের অপারেশন রাতে চালানোর প্রধান কারণ ছিল নিরাপত্তা। দিনে আক্রমণ চালালে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান ও মিসাইল ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতো। তাই মধ্যরাতে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৩০ অক্টোবর বিমান উইংয়ের প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার পুরো অপারেশন সম্পর্কে বৈমানিকদের জানান। সিদ্ধান্ত হয়, ২ নভেম্বর রাতে ডাকোটা বিমান দিয়ে ঢাকা বিমানবন্দরে আক্রমণ চালানো হবে। আক্রমণের দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার, আবদুল খালেক ও আবদুল মুকিত।

ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার বলেন, ‘খন্দকার সাহেব আমাকে ও ক্যাপ্টেন মুকিতকে আলাদা করে ডেকে বললেন, তোমরাই ঢাকা এয়ারপোর্টে আক্রমণ করবে। তোমাদের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি। যদি যেতে না চাও বলতে পার। তবে এয়ারপোর্ট ছাড়া অন্য কোথাও বোমা ফেলতে পারবে না। এটি যে কতটা বিপজ্জনক ছিল, তা ভাবনারও বাইরে, কারণ সেখানে তিন স্তরের অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট ব্যবস্থা ছিল।’

কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ব সফরে থাকায় শেষ মুহূর্তে অপারেশনটি স্থগিত করা হয়।

আলমগীর সাত্তার বলেন, ‘অপারেশনের দিন সকাল ১০টার দিকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিংয়ের বিমানে করে আমাদের অপারেশনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১০টা পেরিয়ে গেলেও তাদের খবর নেই। এক ঘণ্টা পর এসে তারা খন্দকার সাহেবের হাতে দিল্লি থেকে পাঠানো একটি টেলেক্স তুলে দেন। সেখানে লেখা ছিল মিশন বাতিল। আমাদের তিন পাইলটকে ব্যারাকপুরে যেতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তখন অপারেশন বাতিলের কারণ জানানো হয়নি। পরে জেনেছি, ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ব সফরে ছিলেন বলে এই সিদ্ধান্ত। পরে একদিন এয়ার মার্শাল ধাওয়ানের সঙ্গে আমার দেখা হলে তিনি বলেছিলেন, “ভাবতে পারেন সেদিন আপনারা ঢাকা এয়ারপোর্টে ৫ হাজার পাউন্ড বোমা ফেললে কী ভয়াবহ অবস্থা হতো! পাকিস্তানিদের সব ফাইটার প্লেন ধ্বংস হতো এবং তারা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিত। ভারত তখন যুদ্ধে জড়াতে চায়নি।”’

সুলতান মাহমুদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের এয়ারক্রাফটগুলো দিয়ে ডিমাপুর থেকে রওনা হয়ে চট্টগ্রামে আক্রমণ করা সম্ভব ছিল না, কারণ আগেই জ্বালানি ফুরিয়ে যেত। আমাদের কাছাকাছি দূরত্বে ত্রিপুরার মাঝে একটি বিকল্প ফিল্ড দরকার ছিল।’

এরপর সিদ্ধান্ত হয়, ত্রিপুরা থেকে গিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে হামলা চালানো হবে। কিন্তু পরে সেটিও বাতিল করা হয়।

আবারও স্থগিত অপারেশন

২৮ নভেম্বর আবার আক্রমণের দিন ধার্য করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, দুই ভাগে ভাগ হয়ে আক্রমণ চালানো হবে। অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার দিয়ে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলের ইউএসএসওর তেলের ডিপোতে এবং অটার বিমান দিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেদিনের অপারেশনও পেছানো হয়।

অবশেষে অপারেশন কিলোফ্লাইট

৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের ৭টি ঘাঁটিতে একযোগে বিমান হামলা চালালে, ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীর এয়ার উইংকে অপারেশন শুরুর নির্দেশ দেয় এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলের ইউএসএসও তেলের ডিপোতে প্রথম অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ এবং ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলমকে। দ্বিতীয় অপারেশনে পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে হামলা চালাতে বলা হয় ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলমকে।

বদরুল আলম বলেন, ‘আমরা নির্দেশের অপেক্ষায় প্রস্তুত ছিলাম। আমি ও সুলতান মাহমুদ হেলিকপ্টার নিয়ে ডিমাপুর থেকে কৈলাসহরে যাই। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সেখানে থামতে হয়েছিল। এরপর ম্যাপ ফলো করে এগোতে থাকি। সে রাতে জ্যোৎস্না ছিল। পাকিস্তানিদের রাডারে ধরা পড়ার ভয়ে বেশি উঁচুতে উঠতে পারছিলাম না, আবার বেশি নিচ দিয়ে গেলেও দুর্ঘটনার ভয় ছিল।’

বিমান হামলার পর চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি। ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ তোলা ছবি।

সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘সীমান্ত অতিক্রম করার পরই পাকিস্তানি সেনারা হেলিকপ্টার দেখে গুলি ছুড়তে শুরু করে, তবে আমাদের গায়ে লাগেনি। ডেমরার কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখলাম পাকিস্তানি সেনারা বৈদ্যুতিক লাইন এবং ব্রিজ তৈরি করছে।’

গোদনাইলের ডিপোর কাছে এসে আক্রমণ শুরু করেন এই দুই বৈমানিক। বদরুল আলম বলেন, ‘আমাদের হেলিকপ্টারে ৭টি করে মোট ১৪টি রকেট ছিল। ইউএসএসও তেলের ডিপোতে প্রথমে দুটি ফায়ার করি। ফায়ার করার সময় আড়াআড়িভাবে এসে কিছুটা নিচু হয়ে ফায়ার করে তৎক্ষণাৎ বাঁক নিতে হয়। আমরা ফায়ার করে হেলিকপ্টার ঘুরিয়ে আবার একসঙ্গে ফায়ার করি। সব মিলিয়ে ৭-৮ মিনিট সময় লাগে। প্রথম বিস্ফোরণ এত বড় হয়েছিল যে পুরো এলাকা আলোকিত হয়ে যায়।’

কীভাবে ফিরে এলেন জানতে চাইলে বদরুল আলম বলেন, ‘যেখানে ল্যান্ড করব, সেটি ছিল একটি টিলার চূড়া। কোনো নেভিগেশন লাইট ছিল না। টিলার শেষ মাথায় পৌঁছাতেই দেখি নিচ থেকে কেউ টর্চের আলো ফেলছে। ল্যান্ডিং লাইট জ্বালাতেই দেখলাম হেলিপ্যাড। আমরা নামতেই ভারতীয়রা বলল, তারা ভাবতেই পারেনি আমরা এভাবে সফল অপারেশন শেষে জীবিত ফিরে আসতে পারব।’

৩ ডিসেম্বর রাতের দ্বিতীয় অপারেশনে অটার বিমান নিয়ে পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে হামলা চালান ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ বীর উত্তম ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম বীর উত্তম।

কিলোফ্লাইটের এই দুটি অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর বেশির ভাগ জ্বালানি তেল ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে জ্বালানির অভাবে উড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে পাকিস্তানি বাহিনী। অনেকাংশেই মুক্ত হয়ে যায় বাংলার আকাশ।

প্রথম দিকে মুক্তিবাহিনীর বিমান উইংয়ের ঘাঁটি নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে থাকলেও পরে তা শমসেরনগরে স্থানান্তর করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী ১৩ দিনে মুক্তিবাহিনীর বিমান উইং অপারেশন কিলোফ্লাইটের অধীনে অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার ও অটার বিমান নিয়ে মোট ৭০টি সফল অপারেশন চালিয়েছিলেন দুঃসাহসিক এই মুক্তিযোদ্ধারা।