ব্যাংকসির ‘অন্ধ জাতীয়তাবাদ’: প্রতিবাদের নতুন ভাষা
আপনারা অনেকেই হয়তো একটি দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতি দেখেছেন, যেখানে একটি ছোট মেয়েকে লাল হৃদপিণ্ড আকৃতির বেলুনের দিকে হাত বাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ‘গার্ল উইথ বেলুন’ নামে পরিচিত সেই বিখ্যাত স্টেনসিল গ্রাফিতিটি এঁকেছিলেন যুক্তরাজ্যের রহস্যময় শিল্পী ব্যাংকসি।
সম্প্রতি লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে ব্যাংকসির তৈরি নতুন একটি ভাস্কর্য ঘিরে বেশ আলোচনা হচ্ছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করলেও এই শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় আজও অজানা।
তবে তার শিল্পকর্ম বিশ্বজুড়ে বারবার আলোচনায় এসেছে—কখনো এর নান্দনিকতার জন্য, কখনোবা তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তার কারণে।
অনেকের হয়তো এটুকু পড়ে ঢাকার দেয়ালে ‘সুবোধ’ সিরিজের গ্রাফিতির কথা মনে পড়ে যেতে পারে। ব্যাংকসির মতো এই ‘সুবোধ’-এর আঁকিয়ের পরিচয়ও অজানা।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স সম্প্রতি দাবি করেছে, তারা ব্যাংকসির কয়েক দশকের লুকানো পরিচয় খুঁজে পেয়েছে।
ব্যাংকসির সাম্প্রতিক ভাস্কর্য ও তার পরিচয় ঘিরে নতুন করে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা নিয়েই এই লেখা।
লন্ডনের রাস্তায় ‘অন্ধ জাতীয়তাবাদ’
লন্ডনের ওয়াটারলু প্লেস এলাকায় গত ২৯ এপ্রিল ভোর থেকে একটি নতুন শিল্পকর্ম দেখতে পান স্থানীয়রা। এতে দেখা যায়, স্যুট পরা একজন মানুষ সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, যেন মার্চ করছেন। তার ডান হাতে একটি পতাকা উঁচিয়ে ধরা, যা তার পুরো মুখ ঢেকে রেখেছে।
পতাকাটি এমনভাবে তার দৃষ্টি আড়াল করেছে যে, তিনি সামনে কী আছে দেখতে পাচ্ছেন না। ফলে তিনি এখনই সামনে থাকা বেদী থেকে পড়ে যাবেন—এমনটাই মনে হচ্ছে।
শিল্পকর্মটি ২৯ এপ্রিল প্রকাশ্যে আসার পরদিন ব্যাংকসি নিজেই তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে নিশ্চিত করেন—এ কাজটা তারই।
লন্ডনের এই এলাকাটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সামরিক আধিপত্যের ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত। সেখানে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ও রাজা সপ্তম অ্যাডওয়ার্ডের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের মূর্তি রয়েছে। সেগুলোর পাশে ব্যাংকসির এই শিল্পকর্ম শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন শিল্পবোদ্ধারা।
তাদের মতে, এটি মূলত 'অন্ধ জাতীয়তাবাদ' বা 'অন্ধ দেশপ্রেমের' বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ। মানুষ ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে এভাবেই নিজের পতন ডেকে আনে।
কে এই ব্যাংকসি?
ব্যাংকসি যখন তার নতুন শিল্পকর্ম নিয়ে ব্যস্ত, তখন রয়টার্স তাকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। সংস্থাটি দাবি, এই বিশ্বখ্যাত শিল্পীর আসল নাম রবিন গানিংহাম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তিনি একটি ভবনের ছাদে থাকা ‘মার্ক জেকবস’-এর বিশাল বিলবোর্ড গ্রাফিতি এঁকে বিকৃত করছিলেন। সেই পুলিশি নথিতে রবিন গানিংহামের নাম ও স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, সে সময় গানিংহাম নিউইয়র্কের কার্লটন আর্মস হোটেলে অবস্থান করছিলেন। এই হোটেলটি ব্যাংকসির ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তিনি এখানকার একটি রুম নিজের আঁকা ছবি দিয়ে সাজিয়েছিলেন এবং সেখানে ‘রবিন ব্যাংকস’ নামে স্বাক্ষর করেছিলেন।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে আরও একটি বড় মোড় আসে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে ব্যাংকসির ম্যুরালগুলো যখন দেখা যেতে শুরু করে, তখন দেখা যায় রবার্ট ডেল নাজা (ম্যাসিভ অ্যাটাক ব্যান্ডের সদস্য) ও ডেভিড জোন্স নামের এক ব্যক্তি একসঙ্গে সীমান্ত পার হয়েছিলেন।
রয়টার্সের অনুমান, পরিচয় গোপন রাখতে তিনি পরে নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘ডেভিড জোন্স’ রেখেছেন। এই নাম পরিবর্তন করার পেছনে তার সাবেক ম্যানেজার স্টিভ লাজারিডেসের হাত ছিল। ডেভিড জোন্সের পাসপোর্টে যে জন্ম তারিখ ব্যবহার করা হয়েছে, তা রবিন গানিংহামের জন্ম তারিখের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
তবে ব্যাংকসির আইনজীবী মার্ক স্টিফেনস ও সাবেক ম্যানেজার লাজারিডেস এই দাবি অস্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, রয়টার্স একটি 'ভূতের পেছনে' ছুটছে। তাকে (ব্যাংকসি) কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কেন ব্যাংকসি ও তার শিল্পকর্ম বার বার আলোচনায়?
ব্যাংকসির কাজের মূল আকর্ষণ হলো এর ভেতরের চমক, রহস্য এবং তীব্র সামাজিক-রাজনৈতিক বার্তা। গত তিন দশক ধরে তিনি বিশ্বজুড়ে কাজ করছেন, কিন্তু তিনি কে জানা যাচ্ছে না। তিনি কি রবিন গানিংহাম নাকি ডেভিড জোন্স, নাকি রবার্ট ডেল নাজা—তা আজও অমীমাংসিত।
তার ‘গার্ল উইথ বেলুন’, ‘ফ্লাওয়ার থ্রোওয়ার’, ‘লাফ নাউ’, ‘ডেভলভড পার্লামেন্ট’সহ আরও অনেক কাজ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচিত।
ব্যাংকসি তার প্রতিটি কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন বার্তাও তুলে ধরেন। এই যেমন লন্ডনের ওয়াটারলু প্লেসে তার সাম্প্রতিক ভাস্কর্যটি 'অন্ধ জাতীয়তাবাদ' বা ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যাওয়া নেতাদের দিকে আঙুল তোলে।
ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপে বা ফিলিস্তিনের দেয়ালে তার কাজগুলো যুদ্ধের বিরুদ্ধে মানবতার জয়গান গায়। তিনি পুঁজিবাদ, পুলিশি দমন-পীড়ন ও সামাজিক বৈষম্যকে তীব্র আক্রমণ করেন তার কাজের মধ্য দিয়ে।
২০১৮ সালে লন্ডনের একটি নিলাম কেন্দ্রে ব্যাংকসির 'গার্ল উইথ বেলুন' ছবিটি এক মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি হওয়ার মুহূর্তেই ছিঁড়ে টুকরো হয়ে যাওয়া ছিল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আর্ট-স্ট্যান্ট।
এর মাধ্যমে তিনি দেখান, শিল্প কোনো বড়লোকের শো-পিস নয়, বরং এটি জীবন্ত প্রতিবাদও হতে পারে। তার এই প্রথা ভাঙার স্বভাবই তাকে খবরের শিরোনামে রাখে।
সাধারণত দামি শিল্পকর্ম দেখার জন্য বড় মিউজিয়ামে যেতে হয়। কিন্তু ব্যাংকসি মনে করেন, শিল্প হওয়া উচিত সবার জন্য। তার আর্ট গ্যালারি হয়ে ওঠে রাস্তার সাধারণ দেয়াল। ফলে সাধারণ পথচারীরাও তার শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
কেন পরিচয় আড়াল করা?
ব্যাংকসি মনে করেন, পরিচয় প্রকাশ হয়ে গেলে শিল্পের চেয়ে শিল্পীর ব্যক্তিজীবন নিয়ে মানুষ বেশি মাথা ঘামাবে। তাছাড়া তার অনেক কাজই আইনের চোখে 'ক্রিমিনাল ড্যামেজ' বা সম্পত্তি নষ্ট করার শামিল। এই কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার এবং পরিচয় আড়াল করে রাখা তার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকসির সাম্প্রতিক শিল্পকর্মটি মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা যখন সত্যকে আড়াল করতে চায়, মানুষকে অন্ধ করে দেয়, তখন শিল্পই হয়ে ওঠে সত্যের দর্পণ।