মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না মজুরি, কমছে প্রকৃত আয়
সারা দিন জাল টেনে রফিক মাঝির আয় হয় ৫০০ টাকার মতো। গত কয়েক বছরে তার আয়ে তেমন কোনো হেরফের হয়নি। কিন্তু করোনা মহামারির পর যখন চাল-ডালের দাম বাড়তে শুরু করে, তখন তাকে বাধ্য হয়ে খাবারের তালিকা ছোট করতে হয়।
পটুয়াখালীর মহিপুরের এই জেলের পরিবারের থালায় এখন আর আগের মতো মাছ বা ডিম ওঠে না।
সময় গড়িয়েছে, কিন্তু রফিকের সংসারের অভাব ঘোচেনি; বরং বেড়েছে। সাগরে মাছ ধরা না পড়লে কিংবা মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চললে তাকে ধারদেনা করতে হয়। ৫২ বছর বয়সী এই জেলের প্রতিদিনের সংগ্রাম এখন শুধু তিন বেলার খাবার জোগাড় করা; আর সেই খাবার বলতে বেশির ভাগ দিনই শুধু ভাত আর সবজি।
জ্বালানি তেলের অভাবে গত কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারেনি অনেক জেলে। সামনেই মধ্য এপ্রিলে শুরু হচ্ছে মাছ ধরার নতুন নিষেধাজ্ঞা। এই সময়ে সংসার কীভাবে চলবে, তা ভেবে কূল পাচ্ছেন না রফিক। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘সবকিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু আমাদের আয় তো বাড়েনি।’
রফিকের মতো দেশের কোটি কোটি নিম্ন আয়ের মানুষ এখন চাপে আছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যে হারে বাড়ছে, তাদের আয় সে হারে বাড়ছে না। আয়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় (রিয়েল ইনকাম) কমে গেছে।
সরকারি হিসাব মতেই, টানা চার বছর ধরে দেশের মানুষের প্রকৃত আয় নেতিবাচক।
একই জেলার মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের এক আড়তের কর্মচারী কবির হোসেনের অবস্থাও রফিকের মতোই। তিনি বলেন, ‘দৈনন্দিন চাহিদাগুলোই পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।’
কবির জানালেন, তার সন্তানেরা প্রায়ই ভালো খাবারের বায়না ধরে, কিন্তু তিনি তাদের আবদার রক্ষা করতে পারেন না। উল্টো সংসার চালাতে প্রতি মাসেই তাকে কারও না কারও কাছ থেকে ধার করতে হয়। সামনে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়টা কীভাবে পার করবেন, সেটা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে মজুরি কিছুটা বাড়তে শুরু করলেও তা মূল্যস্ফীতিকে ছুঁতে পারেনি। গত মার্চ পর্যন্ত টানা ৫০ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি ছিল।
বিবিএসের ওয়েজ রেট ইনডেক্স বা মজুরি হার সূচকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে দেশে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। অন্যদিকে ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ৬২ পারসেন্টেজ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিল। এর আগের মাসে এই ব্যবধান ছিল ১ দশমিক ০৫ পারসেন্টেজ পয়েন্ট।
মহিপুরের রফিক বা কবিরের মতো সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না লালমনিরহাটের খেতমজুর প্রশান্ত কুমার রায়কে। তবে রাজপুর ইউনিয়নের ৪৫ বছর বয়সী এই কৃষিশ্রমিকের দুশ্চিন্তার কারণ ভিন্ন। কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় তার আয় কমে গেছে।
প্রশান্ত কুমার জানান, আগে কৃষিমৌসুমে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন তিনি। আর এখন মাসে ১৪ হাজার টাকা আয় করাও কঠিন।
সংসারের খরচ কমাতে হেন কোনো পথ নেই, যা প্রশান্ত করেননি। সামান্য যা জমানো টাকা ছিল, তা ভেঙে খেয়েছেন। পুষ্টিকর খাবার কেনা বাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে বা কোনো জরুরি দরকার পড়লে ঋণ করা ছাড়া উপায় থাকে না। এতে পুরোনো ঋণের বোঝাই শুধু ভারী হচ্ছে।
রফিকের ও প্রশান্তের মতো মানুষগুলো দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের (ইনফরমাল সেক্টর) সঙ্গে যুক্ত। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ৬ কোটি ৯০ লাখ কর্মজীবীর প্রায় ৮৪ শতাংশই এই খাতের কর্মী। তাদের একটি বড় অংশ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছেন কিংবা এরই মধ্যে দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়ে গেছেন।
পুষ্টিহীনতায় দীর্ঘমেয়াদি বিপদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান মনে করেন, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও ফলের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বাদ দিয়ে এখন কেবল পরের দিন কাজ করার জন্য ন্যূনতম ক্যালরিটুকু গ্রহণ করছে। পুষ্টির সঙ্গে এমন আপস দীর্ঘমেয়াদে ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ‘অপুষ্টিতে ভোগা শ্রমিক কখনোই উৎপাদনশীল থাকতে পারেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শারীরিক সক্ষমতা কমে যায়।’ তিনি আরও বলেন, নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা মানসিক ও মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই অর্থনীতিবিদের মতে, চাকরির অভাব পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নির্মাণ খাতসহ বেশ কয়েকটি খাতে প্রবৃদ্ধি খুব ধীরে হচ্ছে অথবা কমছে। এর ফলে বাজারে শ্রমিকের চাহিদাও কমে গেছে।
অধ্যাপক লুৎফর বলেন, ‘একই সময়ে নতুন অনেক মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এর ফলে মজুরি কমে যাচ্ছে।’
সরকারি ব্যয়ের ধীরগতিও এর অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তিনি।
‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন গত কয়েক দশকের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম। এতে সাধারণ শ্রমিকদের আয়ের একটি বড় পথ বন্ধ হয়ে গেছে।’
সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির কারণে মানুষের প্রকৃত আয়ের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যাতায়াত ব্যয় বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধানে বোঝা যায় মানুষের প্রকৃত আয়ের ওপর চাপ তীব্র হচ্ছে। পরিবারগুলোকে বাড়তি খরচ সামলাতে হচ্ছে, কিন্তু সে আয় বা মজুরি বাড়ছে না।
এতে আরও বলা হয়, এই পরিস্থিতিতে মজুরি স্থবির থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগছে, যাদের আয়ের সিংহভাগই চলে যায় নিত্যপণ্য কিনতে।
ফেব্রুয়ারি মাসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মজুরি যা বাড়ছে তার তুলনায় মূল্যস্ফীতির চাপ অনেক দ্রুত বাড়ছে। এতে মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাচ্ছে।
গত মার্চে কৃষিখাতে মজুরি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ১০ শতাংশ, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় শূন্য দশমিক ০১ পারসেন্টেজ পয়েন্ট বেশি। এ ছাড়া শিল্প খাতে মজুরি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ০২ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
আয়ের ওপর যুদ্ধের প্রভাব
গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, মূলত ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দেশে বাড়তি ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে আশা করা হয়েছিল, এ বছর প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে এসেছে।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দিনে ৩ ডলার আয়ের হিসাবে একই সময়ে নতুন করে আরও ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হতে পারে।
(সংক্ষেপিত অনুবাদ, মূল প্রতিবেদন পড়তে ক্লিক করুন এই লিংকে)