গ্যাস সংকটে বাড়ছে বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি

জাগরণ চাকমা
জাগরণ চাকমা

সকাল ৮টা বাজলেই উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে জেসমিন আলমের বাসায় দিনের রান্না শুরু করেন গৃহকর্মী। কিন্তু গ্যাসের চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করেও কোনো কোনো দিন সম্ভব হয় না। দিনের বেশিরভাগ সময় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে চুলা জ্বালানো কঠিন, কখনো আবার গ্যাস থাকেই না।

পরিবারের রান্না চালিয়ে নিতে তাই বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দিকে ঝুঁকেছেন জেসমিন।

গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাত হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে একটি ইনফ্রারেড কুকার কিনেছেন তিনি। সঙ্গে কিনেছেন রাইস কুকারও। অথচ গ্যাস সংকটের আগে এসব যন্ত্র তার রান্নাঘরে খুব একটা প্রয়োজনই হতো না।

জেসমিনের মতো ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অনেক পরিবারকেই এখন একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দিনের বেলা দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকায় পাইপলাইনের গ্যাসে অভ্যস্ত পরিবারগুলোকে রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। আর তাতে বাড়ছে বাড়তি খরচও।

গত ২২ জুলাই দেশের ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের পর এই সংকট শুরু হয়। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) এলএনজি সরবরাহ কমে যায়, যা মোট সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ।

এর প্রভাব পড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায়। দিনের বেলায় বহু বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমে যায়। চলতি সপ্তাহে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও কয়েক সপ্তাহের এই সংকটে বৈদ্যুতিক রান্নার সরঞ্জামের বাজারে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাহিদা।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, দেশে বৈদ্যুতিক কুকারের বার্ষিক বাজার ২০০ কোটি টাকারও কম। তবে সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটে বিশেষ করে ইনফ্রারেড ও রাইস কুকারের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

আরএফএলের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মুর্শিদ মুনিম বলেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইনফ্রারেড কুকারের চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আর রাইস কুকারের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ।

‘মানুষ গ্যাসের চুলা থেকে বৈদ্যুতিক কুকারের দিকে যেতে শুরু করেছে,’ বলেন তিনি।

ইনফ্রারেড কুকারের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এতে বাসায় থাকা সাধারণ হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে ইনডাকশন কুকারের জন্য বিশেষ ধরনের হাঁড়ি ও প্যান প্রয়োজন হয়। ফলে ইনডাকশন কুকারের চাহিদা তুলনামূলক ধীরে বেড়েছে বলে জানান মুর্শিদ।

তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় আরএফএল তাদের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়িয়েছে। কিন্তু চাহিদা তার চেয়েও দ্রুত বাড়ায় বাজারে উল্লেখযোগ্য সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে আরএফএলের ঘোড়াশালের ডাঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কারখানার উৎপাদনেও।

মুর্শিদের দাবি, সরকার সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে অন্যান্য শিল্পকারখানা প্রয়োজনের তুলনায় কম গ্যাস পাচ্ছে।

তবে বৈদ্যুতিক কুকারের বাজারে কেবল আরএফএল নয়, রয়েছে আরও কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। ওয়ালটন ও কিয়ামও দেশে বৈদ্যুতিক কুকার তৈরি করে। এ ছাড়া অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান আমদানি করা কুকার বাজারজাত করে।

দেশের বাজারে ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো ও ফিলিপসের বৈদ্যুতিক কুকার পাওয়া যায়। নোভা ও প্রেস্টিজও এ বাজারে আছে।

সাধারণত ইনফ্রারেড কুকারের দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। তবে উন্নত বা প্রিমিয়াম মডেলের দাম আরও বেশি।

ওয়ালটন হোম অ্যাপ্লায়েন্সেসের প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ-আল-জুনায়েদ বলেন, গ্যাস সংকট ও সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তাদের বৈদ্যুতিক কুকারের চাহিদা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

‘চাহিদা স্পষ্টভাবেই বাড়ছে। ভোক্তারা বিকল্প খুঁজছেন। আর বৈদ্যুতিক কুকার সেই বিকল্প হিসেবে নির্ভরযোগ্য সমাধান দিচ্ছে,’ বলেন তিনি।

আবদুল্লাহ জানান, ওয়ালটনের ১২ থেকে ১৫ ধরনের ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকার রয়েছে। এসব কুকারের দাম ৩ হাজার ৭৯০ থেকে ৫ হাজার ৭৯০ টাকার মধ্যে।

তবে বাজারের সব প্রতিষ্ঠানের চিত্র এক নয়।

কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিয়ার রহমান হায়দার বলেন, গ্যাস সংকট তাদের বৈদ্যুতিক কুকারের বিক্রিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলেনি।

‘আমাদের বিক্রি কমবেশি আগের মতোই আছে,’ বলেন তিনি।

কিয়ামের ব্যবসার খুব সামান্য অংশ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামনির্ভর। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে প্রেসার কুকার, ফ্রাই প্যান, ক্যাসেরোল, অ্যালুমিনিয়ামের পণ্য ও হটপট।

‘এসব পণ্যের বাজারই আমাদের জন্য অনেক বড়,’ বলেন হায়দার।

বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বাজারে কিয়ামের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম হওয়ায় গ্যাস সংকটের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত এ খাতে চাহিদায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখেনি।