শরীরী ভাষায় মিথ্যাবাদী চেনা যায়?
কেউ মিথ্যা বলছে কি না, তা বোঝার জন্য অনেকেই তার চোখের দিকে তাকান, হাত-পায়ের নড়াচড়া খেয়াল করেন কিংবা মুখের অভিব্যক্তি দেখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এমন অনেক ভিডিও আছে, যেখানে দাবি করা হয়, চোখে চোখ না রাখা, বারবার নড়াচড়া করা, নাক চুলকানো বা হাত গুটিয়ে রাখার মতো আচরণ নাকি মিথ্যা বলার লক্ষণ!
কিন্তু সত্যিই কি শরীরী ভাষা দেখে একজন মিথ্যাবাদীকে শনাক্ত করা যায়?
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া-ওকানাগানের ট্রুথ অ্যান্ড ট্রাস্ট ল্যাবের পরিচালক ও মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক লিয়ান টেন ব্রিঙ্কে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মিথ্যা বলার আচরণ নিয়ে গবেষণা করছেন।
তার মতে, বহু বছর ধরে গবেষকেরা এমন আচরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন, যা দেখে নিশ্চিতভাবে মিথ্যাবাদী ও সত্যবাদীকে আলাদা করা যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য ‘মিথ্যা ধরার সংকেত’ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, মিথ্যা বললেই নাক পিনোকিওর মতো লম্বা হয়ে যাবে, বাস্তবে এমন কোনো ‘পিনোকিওর নাক’ নেই।
আসলে আমরা কেবল মুখ দিয়ে কথা বলে যোগাযোগ করি না। কথা বলার সময় হাত নাড়ি, ভ্রু কুঁচকাই, হাসি, মুখের ভঙ্গি বদলাই, চোখ ছোট করি কিংবা হাত গুটিয়ে রাখি। এসবই শরীরী ভাষার অংশ।
ইংল্যান্ডের এজ হিল ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিওফ বিটি বলেন, শরীরের কিছু নড়াচড়া আমরা ইচ্ছা করে করি, আবার কিছু ঘটে যায় একেবারে অজান্তেই।
এই অজান্তে ঘটে যাওয়া আচরণ নিয়েই গবেষকদের আগ্রহ বেশি। কারণ কথা বলার সময় একজন মানুষ তার বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও শরীরের প্রতিটি নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করা তার পক্ষে কঠিন হতে পারে।
বিটির গবেষণায় দেখা গেছে, কেউ মিথ্যা বলার সময় তার হাতের অঙ্গভঙ্গি কিছুটা কমে যেতে পারে। কখনো কখনো হাতের নড়াচড়া মুখের কথার সঙ্গে মিলতে নাও পারে।
যেমন, মুখে কেউ কোনো একটি বিষয় বলছেন, কিন্তু তার হাতের অঙ্গভঙ্গি যেন অন্য কিছু বোঝাচ্ছে। এমন অসামঞ্জস্য মিথ্যা বলার একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তবে এখানে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।
![]()
চোখে চোখ রাখছে না মানেই কি মিথ্যা বলছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো, মিথ্যা বলার সময় মানুষ নাকি চোখে চোখ রাখতে পারে না।
কিন্তু গবেষণায় এর পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই।
কেউ চোখে চোখ না রাখলেই সে মিথ্যা বলছে এমন সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়। একইভাবে অতিরিক্ত চোখে চোখ রাখাও মিথ্যার নিশ্চিত লক্ষণ নয়।
মানুষের আচরণ সংস্কৃতিভেদেও বদলে যায়। অনেক সংস্কৃতিতে কথা বলার সময় দীর্ঘক্ষণ চোখে চোখ রাখা অস্বস্তিকর বা অশোভন বলে বিবেচিত হতে পারে।
তাই কেবল চোখের দিকে তাকিয়ে কারও সত্য-মিথ্যা বিচার করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
বারবার নড়াচড়া করলেই কি মিথ্যা?
কেউ কথা বলার সময় হাত-পা নাড়াচ্ছেন, আঙুল নিয়ে খেলছেন, নাক চুলকাচ্ছেন বা নিজের কান টানছেন, এসব আচরণকেও অনেকে মিথ্যার সংকেত হিসেবে দেখেন।
কিন্তু এসবের পেছনে অন্য অনেক কারণ থাকতে পারে। একজন মানুষ নার্ভাস হতে পারেন, অস্বস্তিতে থাকতে পারেন, ক্লান্ত থাকতে পারেন কিংবা অভ্যাসবশত এমন আচরণ করতে পারেন।
তাই কোনো একটি অঙ্গভঙ্গিকে মিথ্যার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব মন্ট্রিয়ালের অধ্যাপক ভিনসেন্ট দ্যনো বলেন, দীর্ঘদিনের গবেষণায় এমন কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গি বা মুখের অভিব্যক্তি পাওয়া যায়নি, যা মিথ্যা বলার সময় সব মানুষের মধ্যে দেখা যায় এবং সত্য বলার সময় কখনো দেখা যায় না।

মুখের অভিব্যক্তিতে কি মিথ্যা ধরা পড়ে?
মুখের খুব দ্রুত ঘটে যাওয়া কিছু পরিবর্তন নিয়েও গবেষণা হয়েছে। এগুলোকে বলা হয় ‘মাইক্রো-এক্সপ্রেশন’ বা ক্ষণস্থায়ী মুখভঙ্গি।
যেমন মুহূর্তের জন্য নাক কুঁচকে যাওয়া, হালকা হাসি ফুটে ওঠা কিংবা মুখে দুঃখের ছাপ দেখা দিয়ে দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া।
গবেষকদের ধারণা, এসব ক্ষণস্থায়ী অভিব্যক্তির মাধ্যমে মানুষের প্রকৃত আবেগ কখনো কখনো প্রকাশ পেতে পারে।
মিথ্যা বলার সময়ও এমন কিছু অভিব্যক্তি দেখা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, সাধারণ মানুষের পক্ষে এত দ্রুত ঘটে যাওয়া মুখের পরিবর্তন শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।
এক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অন্য মানুষের মুখভঙ্গি দেখে কে সত্য বলছে আর কে মিথ্যা বলছে, তা শনাক্ত করতে বলা হয়েছিল। ফলাফল ছিল খুবই সাধারণ। তাদের সাফল্য সাধারণ অনুমানের চেয়ে খুব একটা ভালো ছিল না।
অর্থাৎ, মাইক্রো-এক্সপ্রেশন থাকলেও সেগুলো দেখে মিথ্যা ধরার দক্ষতা অর্জন করা সহজ নয়।

আগেই ‘স্বাভাবিক আচরণ’ বুঝে নিতে হবে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সপার্ট’ বলেন, কাউকে মিথ্যা বলার সময় ধরতে হলে আগে তার স্বাভাবিক আচরণ বা ‘বেসলাইন’ বুঝে নিতে হবে।
অর্থাৎ, স্বাভাবিক অবস্থায় তিনি কীভাবে কথা বলেন, কতটা চোখে চোখ রাখেন, কীভাবে হাত নাড়েন এসব আগে খেয়াল করতে হবে। পরে সেই আচরণে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে সেটিকে সন্দেহের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ধারণাটি শুনতে যুক্তিসংগত মনে হলেও বাস্তবে এটা প্রমাণ করা কঠিন।
কারণ একজন মানুষকে ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করা হলে তার আচরণ স্বাভাবিকভাবেই বদলাতে পারে। যেমন, নিজের নাম জিজ্ঞেস করার সময় যে আচরণ করবেন, গাড়ি চুরি করেছেন কি না এমন প্রশ্নের সময় একই আচরণ করবেন এমন কোনো যুক্তি নেই।
তাই আচরণের পরিবর্তন মানেই মিথ্যা নয়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের নিজেদের ভুল ধারণা

কেউ মিথ্যা বলছে কি না, তা বিচার করার সময় মানুষের নিজের বিশ্বাস ও পক্ষপাতও বড় ভূমিকা রাখে।
আমরা অনেক সময় কাউকে আগে থেকেই অবিশ্বাস করি। এরপর তার সামান্য অস্বাভাবিক আচরণও আমাদের কাছে মিথ্যার প্রমাণ বলে মনে হতে পারে।
গবেষকদের আশঙ্কা, এ ধরনের ভুল ধারণা গুরুতর সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে আদালতে কারও শরীরী ভাষাকে তার বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা বিপজ্জনক। একজন সাক্ষী নার্ভাস হয়ে কথা বলছেন বা একজন অভিযুক্ত প্রশ্নের সময় কাঁপছেন, এর অর্থ এই নয় যে তিনি মিথ্যা বলছেন।
বিবিসির সায়েন্স ফোকাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় অস্ট্রেলিয়ার আদালতের ৬০২টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৪৫টি মামলায় সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা বিচার করতে শরীরী ভাষার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু গবেষকদের মতে, শরীরী ভাষা মিথ্যা বা সত্যের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়।

মিথ্যা ধরতে তাহলে কী করা ভালো?
গবেষকদের মতে, শরীরী ভাষার কোনো একটি সংকেতের ওপর নির্ভর না করাই ভালো। বরং একজন মানুষ কী বলছেন, তার বক্তব্য কতটা বিস্তারিত, কতটা স্পষ্ট এবং বক্তব্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য আছে কি না এসবের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
লিয়ান টেন ব্রিঙ্কের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষকে কিছু মৌখিক সংকেত বা কথার ধরন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিলে মিথ্যা শনাক্ত করার দক্ষতা কিছুটা বাড়তে পারে।
তার পরামর্শ হলো, একসঙ্গে অনেক ধরনের সংকেত খুঁজতে যাওয়ার চেয়ে একটি বিষয় ভালোভাবে খেয়াল করা বেশি কার্যকর হতে পারে। যেমন কেউ কোনো ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় কতটা বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছেন।
তবে এখানেও শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।
শেষকথা, মিথ্যা বলার সময় মানুষের শরীরে কিছু অনিচ্ছাকৃত পরিবর্তন ঘটতে পারে। হাতের অঙ্গভঙ্গি কথার সঙ্গে না মেলা, খুব দ্রুত বদলে যাওয়া মুখের অভিব্যক্তি কিংবা আচরণের কিছু পরিবর্তন কখনো কখনো সূত্র দিতে পারে।
কিন্তু চোখে চোখ না রাখা, নাক চুলকানো, হাত গুটিয়ে রাখা বা অস্থিরভাবে নড়াচড়া করা, এসবের কোনোটিই মিথ্যা বলার প্রমাণ নয়। কারণ সংস্কৃতি, ব্যক্তিত্ব, মানসিক চাপ, ভয়, অস্বস্তি ইত্যাদি অনেক কারণেই মানুষের শরীরী ভাষা বদলে যেতে পারে। তাই কাউকে মিথ্যাবাদী বলে ধরে নেওয়ার আগে সতর্ক হওয়াই ভালো।
সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস


